শরতের বিকেল। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরজুড়ে দুলছে ধবধবে সাদা কাশফুল। সবুজ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে বাতাসে দোল খাচ্ছে কাশের নরম পালক। দূর থেকে দেখে মনে হয়, বিশাল চরজুড়ে কেউ যেন সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।
দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলে এখন এমনই মনকাড়া দৃশ্য। কাশফুলের এই শুভ্র সমারোহ দেখতে প্রতিদিন নদীর পাড়ে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা। বিশেষ করে পড়ন্ত বিকেলে চরাঞ্চলে বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। কেউ আসছেন প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে, কেউ বন্ধুদের নিয়ে, ক্যামেরাবন্দি করছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য।
ইসলামপুর চরে গিয়ে দেখা যায়, কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে জড়ো হয়েছেন অনেকে। এখানে সাত বন্ধু মিলে ‘কাশফুলের ঘাট’ নামে একটি ক্যাফে চালু করেছেন। তাদের মধ্যে শ্রাবণ ও গাজী জানান, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কাশফুলের বন দেখতে আসেন। চরে সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকায় দর্শনার্থীদের কথা বিবেচনা করে তারা দোকানটি দিয়েছেন। সেখানে বোতলজাত পানি, কোমল পানীয়, ফুচকাসহ বিভিন্ন খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়।
দুপুরের পর থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতা-দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকে। বিক্রিও ভালো হয়। এখানে ভূরুঙ্গামারী সদরের বাগভান্ডার গ্রাম থেকে ঘুরতে এসেছেন মো. আরিফ ও তাহমিনা দম্পতি। চরের কাশফুলের নয়নাভিরাম দৃশ্যে মোহিত তারা। আরেক পর্যটক মাছুমা খন্দকার বলেন, কাশফুলের সমারোহে বিকেলের বাতাস যেন শীতের আগমনের বার্তা দিচ্ছে। শৈশবের স্মৃতিগুলোও মনে পড়ছে।
এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতেও কাশফুলের বিস্তীর্ণ শুভ্রতা মন কেড়েছে দর্শনার্থীদের। সেখানে ঘুরতে আসা নাহিদ ও সাদিয়া জানান, ধবধবে কাশফুল দেখতেই তারা ছুটে এসেছেন। হিমেল বাতাসে কাশফুলের দোল খাওয়ার দৃশ্যে মুগ্ধ তারা। কাশফুল শুধু সৌন্দর্যই ছড়ায় না, স্থানীয়দের কাছে এটি আয়েরও একটি উৎস।
স্থানীয় বাসিন্দা কাদের জানান, তার তিন বিঘা জমিতে কাশফুল হয়েছে। কাশ ও ছন বিক্রি করে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। কাশের গোড়ার অংশ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার হয়। তার ভাষ্য, একসময় ঘরের চালা ও বেড়া, পানের বরজ এবং বাগানের বেড়া তৈরিতে কাশ ও ছনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। ছন দিয়ে ঝাড়ুও তৈরি করা হতো। প্রকৃতিপ্রেমীরা বলছেন, নদীর তীর, চরাঞ্চল ও অনাবাদি জমি সংরক্ষণ করা গেলে কাশফুলের বিস্তার আরও বাড়তে পারে।
এতে একদিকে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয়দের জন্য তৈরি হতে পারে বাড়তি আয়ের সুযোগ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. এস এম আবু বক্কর সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি সম্প্রতি এ অঞ্চলে যোগ দিয়েছেন। কাশফুল কোনো ধরনের পরিচর্যা ছাড়াই বেড়ে ওঠায় উত্তরের আট জেলার ৭৮০টি চরে কত জমিতে এটি রয়েছে, সেই তথ্য দপ্তরে সংরক্ষিত নেই।
তবে কাশফুল শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, কৃষকের বিভিন্ন কাজেও লাগে এবং এটি আয়ের উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।























