কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার, মেধার সঠিক মূল্যায়ন, উন্নত জীবনমান ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং খুঁজে নিচ্ছেন নতুন সম্ভাবনার ঠিকানা।
কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য, কেউ বা পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি উচ্চশিক্ষার জনপ্রিয় গন্তব্য। তবে ভিসা প্রক্রিয়ার নানা জটিলতা, উচ্চ ব্যয় এবং কঠোর যোগ্যতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এখন তুলনামূলক বিকল্প গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছেন।
সেই তালিকায় সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে ভূমধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস। তবে সাইপ্রাসকে শুধু সহজ ভিসার গন্তব্য হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি এখানে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, কাজের সীমাবদ্ধতা, আবাসন, বার্ষিক পারমিট নবায়নসহ নানা বিষয়। ফলে দেশটিতে যাওয়ার আগে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জÑদুই দিকই জানা জরুরি।
সাইপ্রাসে রেস্টুরেন্টে কর্মরত বাংলাদেশের রিসা হায়দার জানাচ্ছেন সাইপ্রাসের কাজের সম্ভবনার বিস্তারিত ভূমধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সাইপ্রাস ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপটি গ্রিক ও তুর্কি সাইপ্রিয়টদের মধ্যে বিভক্ত। দক্ষিণ অংশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রিপাবলিক অব সাইপ্রাস, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।
অন্যদিকে উত্তরে রয়েছে তুর্কি সাইপ্রিয়ট প্রশাসন। জাতিসংঘের একটি বাফার জোন দুই অংশকে আলাদা করে রেখেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ রিপাবলিক অব সাইপ্রাসের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। উচ্চশিক্ষায় ও সঙ্গে কাজও রিসা জানান, ইউরোপে উচ্চশিক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে সাইপ্রাস ধীরে ধীরে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
তুলনামূলক বৈচিত্র্যময় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা, ইংরেজি মাধ্যমে বিভিন্ন কোর্স এবং পড়াশোনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে কাজের সুযোগ দেশটিকে শিক্ষার্থীদের কাছে আগ্রহের জায়গায় নিয়ে এসেছে। সাইপ্রাসের সরকারি ‘স্টাডি ইন সাইপ্রাস’ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে তিনটি পাবলিক ও নয়টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৪০টির বেশি উচ্চ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ব্যবসা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, পর্যটন, হসপিটালিটি, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ সাইপ্রাসে একজন শিক্ষার্থীর যাওয়ার প্রাথমিক ব্যয় সাধারণত টিউশন ফি, ভিসা প্রক্রিয়া, বিমানভাড়া, আবাসন, জীবনযাত্রা ও অন্যান্য খরচের ওপর নির্ভর করে। অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা বা তারও বেশি ব্যয় হতে পারে।
তবে এটিকে নির্দিষ্ট বা সবার জন্য একই খরচ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্স, টিউশন ফি ও জীবনযাপনের ধরন অনুযায়ী মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবেশি হতে পারে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে সাইপ্রাসের অন্যতম আকর্ষণ হলোÑ পড়াশোনার পাশাপাশি বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত ও অনুমোদিত কাজের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা ক্লাস চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা এবং ক্লাসের বিরতির সময়ে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকারÑশিক্ষার্থী ভিসা কোনোভাবেই পূর্ণকালীন চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। কাজের ধরন, নিয়োগকর্তা, কর্মঘণ্টা এবং অন্যান্য আইনগত শর্তের ওপর কর্মসংস্থানের সুযোগ নির্ভর করে। তাই ‘পার্টটাইম কাজ করেই পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার পুরো খরচ উঠে যাবে’Ñএমন ধারণা নিয়ে সাইপ্রাসে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাবও জরুরি রিসার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, পার্টটাইম কাজ থেকে মাসে কয়েকশ ইউরো আয় করা সম্ভব হলেও সেই অর্থ দিয়ে টিউশন ফি, বাসাভাড়া, খাবার ও অন্যান্য খরচ একসঙ্গে সামলানো কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে টিউশন ফি বেশি হলে বছর শেষে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু সম্ভাব্য আয় নয়, পুরো বছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব করাও জরুরি।
কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেশি ঘণ্টা কাজের সুযোগ পেলে মাসিক আয় বাড়াতে পারেন। তবে কাজের সুযোগ ও বেতন নির্দিষ্ট নয় এবং সবার জন্য একই রকম হবেÑ এমন নিশ্চয়তাও নেই। ‘পিংক কার্ড’ নিয়ে যে বিষয়টি জানা জরুরি সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অবস্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো শিক্ষার্থী হিসেবে বৈধ অবস্থানের অনুমতি বা পারমিট।
প্রচলিতভাবে অনেকেই এটিকে ‘পিংক কার্ড’ নামে উল্লেখ করেন। এই পারমিট নির্দিষ্ট সময় পর নবায়নের প্রয়োজন হতে পারে। তাই দেশটিতে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের সময়মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। কাজের বাজারে কী সুযোগ রয়েছে? সাইপ্রাস একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র হলেও পর্যটননির্ভর অর্থনীতির কারণে হসপিটালিটি ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে রেস্টুরেন্ট, হোটেল, ক্যাফে ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত কর্মীর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন খাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক নানা ঘটনার প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে। ফলে আগের মতো সহজেই কাজ পাওয়া যাবেÑ এমন নিশ্চয়তা নেই। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ায় কাজের প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
এ কারণে সাইপ্রাসে যাওয়ার আগে চাকরির বাজারের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি। কোন দক্ষতা থাকলে এগিয়ে থাকা যায়? শুধু একটি ডিগ্রি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিলেই কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয় না। বাস্তব দক্ষতা থাকলে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারেন। সাইপ্রাসে যাওয়ার আগে কয়েকটি কারিগরি ও ব্যবহারিক নিয়ে গেলে ভালো।



















