বিদ্যুৎ ঘাটতি আর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পার্বত্য জেলা ও পর্যটন শহর রাঙামাটিতে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। দিন ও রাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে পাহাড়ের অধিবাসীদের।
প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং একবার গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর ফেরায় সর্বস্তরের মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। তীব্র গরমের মধ্যে অনবরত লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ ঘরোয়া কাজকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন স্তব্ধ হয়ে পড়েছে, তেমনি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীনে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা।
সবচেয়ে করুণ ও সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে। গত সোমবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীরা প্রচ- গরমে বিছানায় শায়িত অবস্থায় হাঁসফাঁস করছেন। শিশু ও বয়স্ক রোগীরা গরমে ছটফট করছেন এবং তাদের স্বজনেরা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছেন। বিদ্যুতের বারবার আসা-যাওয়ায় রোগীদের প্রয়োজনীয় ইনজেকশন, স্যালাইন পুশ কিংবা নেবুলাইজার সেবা দিতে নার্সদের তীব্র বেগ পেতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জরুরি চিকিৎসার জন্য সেখানে একটি বিকল্প জেনারেটর চালু রাখা হলেও তা দিয়ে পুরো হাসপাতালের বিপুল বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দেওয়া মোটেও সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শওকত আকবর খান বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সেবা দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ চলে গেলে অপারেশন থিয়েটারের স্পর্শকাতর কাজ, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, অক্সিজেন প্ল্যান্ট পরিচালনা এবং জরুরি ভ্যাকসিন সংরক্ষণসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে সংকটাপন্ন রোগীরা জীবনঝুঁকিতে পড়ছেন। ’ জেলা শহরের তুলনায় পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম উপজেলাগুলোর পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ। লংগদু, বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর, রাজস্থলী, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও কাউখালী উপজেলায় দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না।
লংগদু ও বাঘাইছড়িতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা সাব-স্টেশন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সেখানে চাহিদা অনুযায়ী সংযোগ না মেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে হয়। একই সঙ্গে তীব্র লো-ভোল্টেজের কারণে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রনিকস সামগ্রী বিকল হওয়ার উপক্রম হয়েছে। রাঙামাটি বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলাজুড়ে তাদের মোট গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার ৬০০।
এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা অন্তত ১৭ মেগাওয়াট। অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ থেকে ১২ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন জেলাজুড়ে ৫ থেকে ৯ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাগত সরকার জানান, চাহিদার তুলনায় উৎস থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণেই তারা বাধ্য হয়ে পুরো জেলায় দফায় দফায় এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং পরিচালনা করছেন।
অন্যদিকে, স্থানীয় উৎপাদিত বিদ্যুতের সুফল না পাওয়া নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মনে। পাহাড়ি ঢল ও কাপ্তাই হ্রদে পর্যাপ্ত পানি থাকার কারণে বর্তমানে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটই সচল রয়েছে। কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন ২০০ মেগাওয়াটের বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। তবে নিজেদের জেলায় প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও তীব্র লোডশেডিংয়ের শিকার হওয়াকে চরম বৈষম্যমূলক মনে করছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
তবে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, উৎপাদিত এই বিপুল বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়, ফলে স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।



















