আজ শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২০ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩০°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

মহানায়ক উত্তম কুমারের শতবর্ষের জন্মবার্ষিকী

  • MIT ERP
  • Update Time : 09:56:23 am, Saturday, 5 September 2026
  • 9

মহানায়ক উত্তম কুমারের শতবর্ষের জন্মবার্ষিকী

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

১৯২৬ সালে শরতের প্রথমভাগে জন্মেছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের নক্ষত্র উত্তম কুমার। যদিও এই নামটি তার প্রথম পরিচয় ছিল না। জন্মের পর বাবা-মা নাম রেখেছিলেন অরুণ কুমার। পরে মাতামহ তার ভুবন ভোলানো হাসি দেখে নাম রেখেছিলেন উত্তম এবং বলেছিলেন, এই ভুবন ভোলানো হাসি একদিন পৃথিবী জয় করবে।

ঠিক তা-ই হলো। অরুণ ডুবে গেলেও উত্তম আলো সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। উত্তম কুমারÑএই নামের সঙ্গে বাঙালির কী যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, তা আসলে অক্ষরে লিখে প্রকাশ করার নয়। অসংখ্য জন ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতিতে তাকে ভালোবাসে। আজও অনেক প্রেমিক নারী তার ভুবন ভোলানো হাসির প্রেমে পড়ে। কিন্তু, কীভাবে ঘটল এমন নিখুঁত অদ্বিতীয় উত্তমের আবির্ভাব!

ভাবলে অনেকটা অলৌকিক মনে হতে পারে! আসলে উত্তম কুমার হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি। সময় নিয়ে, দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে তৈরি করেছেন। জীবনের প্রথম দিকে সিনেমায় কিংবা অভিনয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, সেই ভাবনা তার ছিল না। পরিবারের প্রয়োজনে সাধারণ ক’টাকার চাকরি দিয়ে জীবন শুরু। তবে নাটক, অভিনয়ের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ।

সময় পেলে করতেন। সুদর্শন উত্তম একসময় নাটক-সিনেমায় এক্সট্রা আর্টিস্টের ভূমিকায় সুযোগ পেয়ে নিজেকে বড় ক্যানভাসে কল্পনা করতে শুরু করেন। প্রথম দিকে তার অভিনীতি সিনেমা প্রায় সব মুখ থুবড়ে পড়ে। চলচ্চিত্র অঙ্গনে রীতিমতো তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ চলে। উত্তম দমে যাননি; বরং চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। উচ্চারণ এবং সংলাপ পরিষ্কার করতে মুখের মধ্যে শুপারি নিয়ে দিনের পর দিন প্রাকটিস করেছেন, রাতে বাড়িতে উচ্চৈঃস্বরে সংস্কৃতি পাঠ করেছেন।

এভাবেই সাধারণ উত্তমকে তিনি গড়ে তুলেছেন। সাল ১৯৫২, উত্তম কুমারের সুযোগ হয় নির্মল দে’র সিনেমা ‘বসু পরিবারে’ প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের। যদিও পরিচালক তাকে প্রধান চরিত্রে রাজি ছিলেন না। যা-ই হোক। ‘বসু পরিবার’ বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁচ্ছে গেল। উত্তর কুমারের সঙ্গে বাঙালির একটা ভাব হলো। এর পরের বছর একই পরিচালকের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এখানকার ভাষায় এই সিনেমা ছিল ব্লকবাস্টার!

আলোড়িত এই সিনেমার মধ্য দিয়ে বাঙালির সঙ্গে পরিচয় ঘটে উত্তম-সুচিত্রার। সেই থেকে স্থায়ী বাঙালির মনন এবং মগজে উত্তম কুমার। একবাক্যে বাঙালি সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। উত্তম কুমার জীবদ্দশায় ২০২টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ সিনেমা বাঙালির হৃদয়ের নিশ্চিন্তপুরে আজও চির সতেজ। ব্যক্তি জীবনে না পারলেও পেষাগত জীবনে সব সময় নিখুঁত থাকতে চেষ্টা করেছেন এবং সত্যিই নায়ক উত্তম কুমার নিখুঁত ছিলেন।

যার প্রমাণ মেলে সত্যজিৎ রায়ের বয়ানে। জীবদ্দশায় তিনি বলেছেন, মুক্তির বেশ কয়েক বছর পর ভুল ধরতে একরাতে ‘নায়ক’ দেখতে বসলেন এবং দেখলেন অভিনেতা উত্তম কুমারের অভিনয়ে কোনো ভুল নেই। এর থেকে বড় সনদ আর কী হতে পারে এবং মহানায়ক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, উত্তম কুমার হওয়া এত সহজ নয়। যেমন দিয়েছেন, তেমনি পেয়েছেনও বটে! প্রসঙ্গে একটা স্মৃতিকথা বলি, সাল ১৯৭৫।

পরিচালক শক্তি সামন্ত তার ‘অমানুষ’ দল নিয়ে সুন্দরবন এলাকায় দিন-রাত কাজ করছেন। সিনেমায় একটা গান আছে ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে…’। এই গানের শুটিং করতে করতে বনের অনেক গভীরে তাদের লঞ্চ চলে যায় এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত বেড়ে যায়। হঠাৎ পরিচালকের খেয়াল হয়, কোথায় এসেছি আমরা! এমন সময় লঞ্চের খাবার শেষ।

সিনেমার নায়ক-নায়িকার কাজের চাপে ক্ষুধা লেগেছে। অন্যদেরও একই দশা। উত্তম কুমার বলেন, শক্তিদা, কিছু একটা জোগাড় করেন। এদিকে পরিচালক নিজেও জানেন না কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তার লঞ্চ। কাউকে কিছু না বুঝতে দিয়ে এক পাড়ে লঞ্চ ভেড়ালেন এবং খাবার খুঁজতে নিজে বেরিয়ে পড়লেন। খুঁজতে খুঁজতে একজনের সঙ্গে দেখা। মানুষটাকে সব বলেন এবং সবশেষে যখন বলেন লঞ্চে ক্ষুধার্থ উত্তম কুমার অপেক্ষা করছে, তখন মানুষটার চোখ বড় হয়ে যায় এবং স্বচক্ষে নায়ককে দেখতে চায়।

লোকটাকে সঙ্গে করে লঞ্চে আসেন এবং হারিকেনের আলো বাড়িয়ে উত্তম কুমারকে দেখান। নিশ্চিত হওয়ার পর লোকটা বলে, আপনারা একটু অপেক্ষা করেন, আমি আসছি। লোকটা লঞ্চ থেকে নেমে যায়। কিছুক্ষণ পর দেখা যায় নদীর পাড়ে অসংখ্য হারিকেনের আলো। সঙ্গে শঙ্খের ধ্বনি, উলু ধ্বনি। তখন আর বুঝতে বাকি রইল না এসবই মহানায়কের প্রতি সুন্দববন উপকূলবাসীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

এর থেকে বড় কৃতজ্ঞতা বা প্রাপ্তি একজন অভিনেতার জীবনে আর কীই-বা হতে পারে। তিনি পেয়েছেন এবং সমানে দিয়েছেন। দেওয়া-নেওয়ার এই প্রাপ্তি জন্মের একশ বছর এবং মৃত্যু ছেচল্লিশ বছর পরও তিনি পেয়ে চলেছেন। আজও তিনি নক্ষত্রের মতো চির অম্লান। নিজের অভিনয় সত্তা নিয়ে উত্তম কুমার বলেছিলেন, ‘অভিনয় মানে শুধু নকল করা নয়, অভিনয় হলো নিজের সত্তাকে অন্যের চরিত্রের মধ্যে বিলীন করে দেওয়া।

যেদিন অভিনেতা মনে করেন সে সব শিখে গেছে, সেদিনই তার শিল্পী হিসেবে মৃত্যু ঘটে। ’ এবং দর্শকের প্রতি দায়বোধ থেকে বলেছিলেন, ‘দর্শকের করতালি কোনো পুরস্কার নয়, ওটা একধরনের ঋণ। যতবার হাততালি বাড়ে, ততবার শিল্পী হিসেবে দায়বদ্ধতার ভারও বেড়ে যায়। ’ হ্যাঁ, চিন্তায় এমনই বিদগ্ধ ছিলেন বাঙালির মহানায়ক। যদিও ছিলেন বলাটা ভুল!

গত ৩ সেপ্টেম্বর ছিল এই কালপুরুষের জন্মশত বার্ষিকী। সাধারণ থেকে অসাধারণ ভালোবেসে শুভেচ্ছা জানাতে কেউই কার্পণ্য করেনি। তার সঙ্গে কাজ করা আজকের দিনের অনেক মহারথীও স্মৃতি এবং ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করেছেন। প্রসঙ্গে বর্তমান সময়ের টালিগঞ্জ বাংলা সিনেমার শেষ রাজা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দিয়ে শেষ করা যাক, ‘উত্তম কুমর নামের এক অভিনেতা ছিলেন, একসময়ে, কোনোদিন কোনো বাঙালিকে এমনটা বলতে শুনেছেন?

শুনবেনও না। কারণ উত্তম কুমার বাঙালির কাছে কোনোদিনই “অতীত” হয়ে যাননি। তিনি আমাদের বরাবরের বর্তমান। তার স্মৃতি, তার হাসি, তার তাকানো, তার হাঁটা-চলা, তার কথা বলাÑএই সবটা যেন কখন আমাদের জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি পরিবারে তিনি এক অলিখিত সদস্য। ’ সত্যিই উত্তম কুমার অতীত হয়ে যাননি, তিনি আমাদের কাছে বরাবরের বর্তমান।

শুভ জন্মদিন, মহানায়ক।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নোয়াখালীর চাটখিলে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত

মহানায়ক উত্তম কুমারের শতবর্ষের জন্মবার্ষিকী

Update Time : 09:56:23 am, Saturday, 5 September 2026

১৯২৬ সালে শরতের প্রথমভাগে জন্মেছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের নক্ষত্র উত্তম কুমার। যদিও এই নামটি তার প্রথম পরিচয় ছিল না। জন্মের পর বাবা-মা নাম রেখেছিলেন অরুণ কুমার। পরে মাতামহ তার ভুবন ভোলানো হাসি দেখে নাম রেখেছিলেন উত্তম এবং বলেছিলেন, এই ভুবন ভোলানো হাসি একদিন পৃথিবী জয় করবে।

ঠিক তা-ই হলো। অরুণ ডুবে গেলেও উত্তম আলো সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। উত্তম কুমারÑএই নামের সঙ্গে বাঙালির কী যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, তা আসলে অক্ষরে লিখে প্রকাশ করার নয়। অসংখ্য জন ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতিতে তাকে ভালোবাসে। আজও অনেক প্রেমিক নারী তার ভুবন ভোলানো হাসির প্রেমে পড়ে। কিন্তু, কীভাবে ঘটল এমন নিখুঁত অদ্বিতীয় উত্তমের আবির্ভাব!

ভাবলে অনেকটা অলৌকিক মনে হতে পারে! আসলে উত্তম কুমার হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি। সময় নিয়ে, দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে তৈরি করেছেন। জীবনের প্রথম দিকে সিনেমায় কিংবা অভিনয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, সেই ভাবনা তার ছিল না। পরিবারের প্রয়োজনে সাধারণ ক’টাকার চাকরি দিয়ে জীবন শুরু। তবে নাটক, অভিনয়ের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ।

সময় পেলে করতেন। সুদর্শন উত্তম একসময় নাটক-সিনেমায় এক্সট্রা আর্টিস্টের ভূমিকায় সুযোগ পেয়ে নিজেকে বড় ক্যানভাসে কল্পনা করতে শুরু করেন। প্রথম দিকে তার অভিনীতি সিনেমা প্রায় সব মুখ থুবড়ে পড়ে। চলচ্চিত্র অঙ্গনে রীতিমতো তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ চলে। উত্তম দমে যাননি; বরং চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। উচ্চারণ এবং সংলাপ পরিষ্কার করতে মুখের মধ্যে শুপারি নিয়ে দিনের পর দিন প্রাকটিস করেছেন, রাতে বাড়িতে উচ্চৈঃস্বরে সংস্কৃতি পাঠ করেছেন।

এভাবেই সাধারণ উত্তমকে তিনি গড়ে তুলেছেন। সাল ১৯৫২, উত্তম কুমারের সুযোগ হয় নির্মল দে’র সিনেমা ‘বসু পরিবারে’ প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের। যদিও পরিচালক তাকে প্রধান চরিত্রে রাজি ছিলেন না। যা-ই হোক। ‘বসু পরিবার’ বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁচ্ছে গেল। উত্তর কুমারের সঙ্গে বাঙালির একটা ভাব হলো। এর পরের বছর একই পরিচালকের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এখানকার ভাষায় এই সিনেমা ছিল ব্লকবাস্টার!

আলোড়িত এই সিনেমার মধ্য দিয়ে বাঙালির সঙ্গে পরিচয় ঘটে উত্তম-সুচিত্রার। সেই থেকে স্থায়ী বাঙালির মনন এবং মগজে উত্তম কুমার। একবাক্যে বাঙালি সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। উত্তম কুমার জীবদ্দশায় ২০২টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ সিনেমা বাঙালির হৃদয়ের নিশ্চিন্তপুরে আজও চির সতেজ। ব্যক্তি জীবনে না পারলেও পেষাগত জীবনে সব সময় নিখুঁত থাকতে চেষ্টা করেছেন এবং সত্যিই নায়ক উত্তম কুমার নিখুঁত ছিলেন।

যার প্রমাণ মেলে সত্যজিৎ রায়ের বয়ানে। জীবদ্দশায় তিনি বলেছেন, মুক্তির বেশ কয়েক বছর পর ভুল ধরতে একরাতে ‘নায়ক’ দেখতে বসলেন এবং দেখলেন অভিনেতা উত্তম কুমারের অভিনয়ে কোনো ভুল নেই। এর থেকে বড় সনদ আর কী হতে পারে এবং মহানায়ক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, উত্তম কুমার হওয়া এত সহজ নয়। যেমন দিয়েছেন, তেমনি পেয়েছেনও বটে! প্রসঙ্গে একটা স্মৃতিকথা বলি, সাল ১৯৭৫।

পরিচালক শক্তি সামন্ত তার ‘অমানুষ’ দল নিয়ে সুন্দরবন এলাকায় দিন-রাত কাজ করছেন। সিনেমায় একটা গান আছে ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে…’। এই গানের শুটিং করতে করতে বনের অনেক গভীরে তাদের লঞ্চ চলে যায় এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত বেড়ে যায়। হঠাৎ পরিচালকের খেয়াল হয়, কোথায় এসেছি আমরা! এমন সময় লঞ্চের খাবার শেষ।

সিনেমার নায়ক-নায়িকার কাজের চাপে ক্ষুধা লেগেছে। অন্যদেরও একই দশা। উত্তম কুমার বলেন, শক্তিদা, কিছু একটা জোগাড় করেন। এদিকে পরিচালক নিজেও জানেন না কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তার লঞ্চ। কাউকে কিছু না বুঝতে দিয়ে এক পাড়ে লঞ্চ ভেড়ালেন এবং খাবার খুঁজতে নিজে বেরিয়ে পড়লেন। খুঁজতে খুঁজতে একজনের সঙ্গে দেখা। মানুষটাকে সব বলেন এবং সবশেষে যখন বলেন লঞ্চে ক্ষুধার্থ উত্তম কুমার অপেক্ষা করছে, তখন মানুষটার চোখ বড় হয়ে যায় এবং স্বচক্ষে নায়ককে দেখতে চায়।

লোকটাকে সঙ্গে করে লঞ্চে আসেন এবং হারিকেনের আলো বাড়িয়ে উত্তম কুমারকে দেখান। নিশ্চিত হওয়ার পর লোকটা বলে, আপনারা একটু অপেক্ষা করেন, আমি আসছি। লোকটা লঞ্চ থেকে নেমে যায়। কিছুক্ষণ পর দেখা যায় নদীর পাড়ে অসংখ্য হারিকেনের আলো। সঙ্গে শঙ্খের ধ্বনি, উলু ধ্বনি। তখন আর বুঝতে বাকি রইল না এসবই মহানায়কের প্রতি সুন্দববন উপকূলবাসীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

এর থেকে বড় কৃতজ্ঞতা বা প্রাপ্তি একজন অভিনেতার জীবনে আর কীই-বা হতে পারে। তিনি পেয়েছেন এবং সমানে দিয়েছেন। দেওয়া-নেওয়ার এই প্রাপ্তি জন্মের একশ বছর এবং মৃত্যু ছেচল্লিশ বছর পরও তিনি পেয়ে চলেছেন। আজও তিনি নক্ষত্রের মতো চির অম্লান। নিজের অভিনয় সত্তা নিয়ে উত্তম কুমার বলেছিলেন, ‘অভিনয় মানে শুধু নকল করা নয়, অভিনয় হলো নিজের সত্তাকে অন্যের চরিত্রের মধ্যে বিলীন করে দেওয়া।

যেদিন অভিনেতা মনে করেন সে সব শিখে গেছে, সেদিনই তার শিল্পী হিসেবে মৃত্যু ঘটে। ’ এবং দর্শকের প্রতি দায়বোধ থেকে বলেছিলেন, ‘দর্শকের করতালি কোনো পুরস্কার নয়, ওটা একধরনের ঋণ। যতবার হাততালি বাড়ে, ততবার শিল্পী হিসেবে দায়বদ্ধতার ভারও বেড়ে যায়। ’ হ্যাঁ, চিন্তায় এমনই বিদগ্ধ ছিলেন বাঙালির মহানায়ক। যদিও ছিলেন বলাটা ভুল!

গত ৩ সেপ্টেম্বর ছিল এই কালপুরুষের জন্মশত বার্ষিকী। সাধারণ থেকে অসাধারণ ভালোবেসে শুভেচ্ছা জানাতে কেউই কার্পণ্য করেনি। তার সঙ্গে কাজ করা আজকের দিনের অনেক মহারথীও স্মৃতি এবং ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করেছেন। প্রসঙ্গে বর্তমান সময়ের টালিগঞ্জ বাংলা সিনেমার শেষ রাজা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দিয়ে শেষ করা যাক, ‘উত্তম কুমর নামের এক অভিনেতা ছিলেন, একসময়ে, কোনোদিন কোনো বাঙালিকে এমনটা বলতে শুনেছেন?

শুনবেনও না। কারণ উত্তম কুমার বাঙালির কাছে কোনোদিনই “অতীত” হয়ে যাননি। তিনি আমাদের বরাবরের বর্তমান। তার স্মৃতি, তার হাসি, তার তাকানো, তার হাঁটা-চলা, তার কথা বলাÑএই সবটা যেন কখন আমাদের জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি পরিবারে তিনি এক অলিখিত সদস্য। ’ সত্যিই উত্তম কুমার অতীত হয়ে যাননি, তিনি আমাদের কাছে বরাবরের বর্তমান।

শুভ জন্মদিন, মহানায়ক।