পাহাড়ের নিস্তব্ধতা মানেই সবসময় শান্তি নয়; কখনো কখনো তা আসন্ন কোনো ভয়াবহ ঝড়ের নীরব প্রস্তুতি। দূর থেকে পর্যটকের চোখে যে পাহাড় সবুজের স্নিগ্ধ চাদরে মোড়ানো এক নৈসর্গিক ক্যানভাস, তার ভাঁজে ভাঁজেই লুকিয়ে আছে দশকের পর দশক ধরে বয়ে চলা বঞ্চনা আর অধিকারহীনতার এক না-বলা ইতিহাস।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ বা কেএনএফের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর যে উত্থান আমরা দেখছি, তা শূন্য থেকে গজিয়ে ওঠা কোনো বিভীষিকা নয়। দিনের পর দিন প্রান্তিককরণের শিকার হওয়া কোনো জনগোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রকাঠামোর কাছে নিজেদের অস্তিত্বকে চরমভাবে উপেক্ষিত ভাবতে শুরু করে, ঠিক তখনই সেখানে জমতে থাকে ক্ষোভের বারুদ।
বর্তমান সংঘাতের খোলস সরিয়ে নির্মোহভাবে পেছনের ইতিহাস খুঁজলে স্পষ্ট হয়। পাহাড়ের আজকের এই অশান্ত রূপ মূলত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবহেলা, ক্ষমতার অসম বণ্টন আর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতেরই করুণ পরিণতি। ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেএনএফের সশস্ত্র রূপ ধারণের পেছনে রয়েছে প্রায় দেড় দশকের এক ধারাবাহিক বিবর্তন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক ছাত্র নাথান বমের হাত ধরে ২০০৮ সালে ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (কেএনডিও) নামের একটি সাধারণ এনজিও হিসেবে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু ২০১৭ সালে এসে খোলস পাল্টে এটি ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (কেএনএফ) নামে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়; জন্ম নেয় এর সামরিক শাখা ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি’ (কেএনএ)।
পাহাড়ের তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীÑ বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, ম্রো ও খুমি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের দাবি নিয়ে তাদের এই যাত্রা শুরু। রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার নয়টি উপজেলা নিয়ে একটি পৃথক ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যে রাজনৈতিক দাবি তারা তুলেছে, তা পাহাড়ের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ইতিহাসে এক নতুন মোড় তৈরি করেছে।
একটি সাধারণ সামাজিক সংগঠনের এমন সশস্ত্র রূপ নেওয়ার নেপথ্য কারণ খুঁজতে গেলে পাহাড়ের আদি সংঘাতের ইতিহাস সামনে চলে আসে। আশির ও নব্বইয়ের দশকে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামের পটভূমিতে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির সুফল মূলত বড় নৃগোষ্ঠীগুলো (বিশেষ করে চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়) ভোগ করেছে।
ফলে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছালেও বম, খুমি বা ম্রোদের মতো ক্ষুদ্রতর গোষ্ঠীগুলো উন্নয়নের মূলধারা থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়ে। কেএনএফ প্রধান নাথান বম মূলত এই ঐতিহাসিক ‘বঞ্চনার মনস্তত্ত্ব’ বা ‘ডেপ্রাইভেশন থিওরি’-কে অত্যন্ত নিপুণভাবে কাজে লাগিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের তরুণদের প্রভাবিত করেছেন।
কাঠামোগত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভই পাহাড়ে নতুন করে সশস্ত্র বিদ্রোহের বীজ বপনে উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পাহাড়ে বারবার কেন এমন সশস্ত্র গোষ্ঠীর শিকড় গজিয়ে ওঠে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে এর দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্ত বরাবরই আঞ্চলিক অস্থিরতার এক নীরব ইন্ধনদাতা হিসেবে কাজ করেছে।
কেএনএফ তাদের সামরিক শাখা শক্তিশালী করতে পার্শ্ববর্তী দেশের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। এ ছাড়া, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে অতীতে হওয়া বিভিন্ন চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাও এ ধরনের নতুন গোষ্ঠীর উত্থানের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
ইতিহাস সাক্ষীÑ রাষ্ট্রের কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যখন নিজেদের মৌলিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় দীর্ঘকাল উপেক্ষিত বোধ করে, তখন সেখানে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
















