পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলি। চারপাশে চেনা নগরজীবনের কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, মানুষের ব্যস্ততা। সেই ব্যস্ততার মাঝেই কলেজিয়েট স্কুলের পাশে চোখে পড়ে একটি লোহার গেট। বড় করে লেখা বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজ।
গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেই যেন বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। সবুজে ঘেরা শান্ত একটা উঠান। দেয়াল বেয়ে উঠে গেছে একটি বট গাছ। কাঠগোলাপ গাছের নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ফুল। উঠানে আপনমনে ঘুরে বেড়ায় কয়েকটি বিড়াল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে সাদা ও লাল রঙের মিশেলে দোতলাসমান উঁচু একতলা ভবনটি। সেটির চূড়ায় নকশাদার ফলকে সাদা রঙে লেখাÑ ব্রাহ্ম সমাজ।
বেদান্তের একেশ্বরবাদের ওপর ভিত্তি করে ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় ‘ব্রাহ্মসভা’ গঠন করেন। পরে এটি ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে পরিচিত হয়। ব্রাহ্মরা নিরাকার ঈশ্বরের আরাধনা করেন। এই সমাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় ভেদাভেদ ও কুসংস্কার দূর করা। এর সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেনসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির নাম জড়িয়ে আছে।
পাঠ্যবই আমাদের শেখায়, তারা সমাজ বদলেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের ধুলো জমা পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই আলোকবর্তিকার পেছনে লুকিয়ে ছিল তীব্র পারিবারিক সংঘাত, আদর্শের লড়াই আর কিছু নির্মম ট্র্যাজেডি। ১৮৭২ সাল। ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেনের অক্লান্ত পরিশ্রমে ব্রিটিশ সরকার পাস করল ‘সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট’। আইন করে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স করা হলোÑ ১৪ বছর।
বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এটি ছিল ঐতিহাসিক জয়। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, এর ঠিক ছয় বছর পর, ১৮৭৮ সালে কেশবচন্দ্রের সামনে এলো এক রাজকীয় প্রস্তাব, কোচবিহারের মহারাজের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে। পাত্রী স্বয়ং কেশবচন্দ্রের মেয়ে, যার বয়স তখন মাত্র ১৩! নিজের তৈরি করা আইন ভেঙে, নাবালিকা মেয়েকে হিন্দু পৌত্তলিক আচার মেনে বিয়ে দিলেন তিনি। এই এক ঘটনা প্রকম্পিত করে তুলল গোটা সমাজকে।
প্রগতিশীল তরুণ নেতারা ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। যে নেতাকে তারা দেবতার আসনে বসিয়েছিলেন, তার এই স্ববিরোধিতা মেনে নিতে না পেরে ব্রাহ্ম সমাজ চিরতরে দুই ভাগে ভেঙে গেল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি তখন ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন বেদ ও উপনিষদ অভ্রান্ত, সেখানে কোনো ভুল থাকতে পারে না।
কিন্তু ব্রাহ্ম সমাজেরই এক যুক্তিবাদী তরুণ, অক্ষয় কুমার দত্ত, দাবি করলেন, বিজ্ঞানের যুগে কোনো কিছুই প্রশ্নাতীত নয়, বেদেও ভুল থাকতে পারে। বিতর্কের সত্যতা যাচাই করতে দেবেন্দ্রনাথ এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি চারজন তরুণকে দীর্ঘ চার বছরের জন্য কাশীতে পাঠালেন নিবিড়ভাবে বেদ অধ্যয়নের জন্য। চার বছর পর যখন তারা ফিরে এসে বেদের কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরলেন, তখন দেবেন্দ্রনাথ কোনো গোঁড়ামি দেখাননি।
তিনি উদারভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে ঘোষণা করলেন, ‘কোনো গ্রন্থই সম্পূর্ণ অভ্রান্ত নয়, মানুষের বিবেকই শেষ কথা। ’ বিশ্বাসের ওপর যুক্তিবাদের এই জয় তৎকালীন সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ব্রাহ্ম সমাজ মুখে নারী স্বাধীনতার কথা বললেও, শুরুর দিকে সমাজের ভয়ে প্রার্থনাসভায় নারীদের বসার জায়গা হতো বাঁশের বেড়া বা চিকের পর্দার আড়ালে।
পুরুষদের চোখের আড়ালে বসেই তাদের ঈশ্বর সাধনা করতে হতো। ১৮৭০-এর দশকে এই প্রথার বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন সমাজেরই কিছু প্রগতিশীল তরুণী। তারা সাফ জানিয়ে দিলেন, ঈশ্বরের দরবারে যদি সবাই সমান হয়, তবে এই কৃত্রিম দেয়াল কেন? রক্ষণশীল প্রবীণদের তীব্র আপত্তির মুখেও তারা জেদ ধরে বসে রইলেন। অবশেষে নারীদের এই জেদের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় সমাজ কমিটি।
ছিঁড়ে ফেলা হয় পর্দার আড়াল। বাংলার ইতিহাসে এটাই ছিল ঘরের কোণ থেকে নারীদের প্রথম রাজপথে নেমে আসার প্রকাশ্য সামাজিক বিদ্রোহ। পাটুয়াটুলীতে ব্রাহ্ম সমাজের মন্দিরে প্রতি রোববার প্রার্থনা হয়। ব্রাহ্মদের মধ্যে দুটি ভাগ আছে। এ দুটি হলোÑ জন্মসূত্রে ব্রাহ্ম ও অ-আনুষ্ঠানিক ব্রাহ্ম। হিন্দুদের মধ্যে যারা ব্রাহ্মধর্ম সমর্থন করেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেননি, তারাই অ-আনুষ্ঠানিক ব্রাহ্ম।
তারা সমাজের সদস্যও হতে পারেন। এ ছাড়া দীক্ষালাভের মাধ্যমেও ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য হওয়া যায়। বর্তমানে সারা দেশে মোট ব্রাহ্মের সংখ্যা ৬২। তবে জন্মসূত্রে ব্রাহ্ম আছেন মাত্র ১৩ থেকে ১৫ জন। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজের এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মন্দির প্রতিষ্ঠায় কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক দীননাথ সেন প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন।
সেই সময় ভবনটি নির্মাণে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। তখন বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজ পরিচিত ছিল ‘ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে। এই প্রাঙ্গণ শুধু উপাসনার স্থান ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষা, পাঠচর্চা ও সামাজিক কর্মকা-ও। ১৮৭১ সালে এখানে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা একসময় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পাঠাগারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল।
ব্রাহ্ম সমাজের মন্দিরে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষ আসতে পারে। বিশেষ কিছু দিনে মন্দিরে উৎসব হয়। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসেবে বাংলা সনের ১১ মাঘ বিশেষ কর্মসূচি থাকে। তখন এখানে বেদের সঙ্গে সঙ্গে কোরআন, ত্রিপিটক, বাইবেলও পাঠ করা হয়। এ ছাড়া পয়লা বৈশাখ রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীও পালন করেন ব্রাহ্মরা। এখন অবশ্য ব্রাহ্ম সমাজের সেই রমরমা অবস্থা নেই।
এর সদস্য দিনে দিনে কমছেই। নেহাত পালা-পার্বণেই কিছুটা লোকসমাগম হয়। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনও। একসময় যে ব্রাহ্ম সমাজ বাংলার নবজাগরণ ও সমাজ সংস্কারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছিল, আজ তার পরিসর অনেকটাই ছোট। তবু পাটুয়াটুলির এই পুরোনো প্রাঙ্গণটি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে। ব্যস্ত নগরীর কোলাহলের আড়ালে এখানে এখনো টিকে আছে সেই সময়ের স্মৃতি, যে সময় মানুষ ধর্ম, সমাজ ও প্রচলিত বিশ্বাসকে নতুন করে প্রশ্ন করতে শিখেছিল।
হয়তো আজ ব্রাহ্ম সমাজের সেই জৌলুশ নেই, নেই আগের মতো মানুষের ভিড়। কিন্তু পুরোনো ভবনটি, সবুজ উঠোন আর নীরব প্রার্থনাকক্ষ এখনো বহন করে একটি পরিবর্তনশীল সময়ের গল্প। পাটুয়াটুলির ব্যস্ততার মাঝে তাই এই ছোট্ট প্রাঙ্গণটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি বাংলার সমাজসংস্কার ও নবচিন্তার ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক।
















