হলুদিয়া পাখি সোনার বরণ, পাখিটি ছাড়িল কে… কিংবা এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া, এত যতেœ বানাইয়াছেন সাঁই… মাটির সোঁদা গন্ধ আর আধ্যাত্মিক চেতনার এই সুরগুলো শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক কালজয়ী কণ্ঠশিল্পীর অবয়ব।
তিনি বাংলার লোকসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট আবদুল আলীম। আজ এই মরমী কণ্ঠশিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৪ সালের এই দিনে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার প্রস্থানে লোকসংগীতের আকাশে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা অর্ধশতক পেরিয়েও পূরণ হয়নি। ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল আলীম।
শৈশব থেকেই গানের প্রতি ছিল তার তীব্র অনুরাগ। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও অন্যের গান শুনে শুনেই নিজের ভেতর সুরের এক মহাসমুদ্র তৈরি করেছিলেন তিনি। কিশোর বয়সেই কলকাতায় গিয়ে পরিচিত হন কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং লোকসংগীতের মহান পুরুষ আব্বাসউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
পরবর্তীতে ঢাকা বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তার কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদি আর ইসলামি গানকে আবদুল আলীম এমন এক অনন্য ও অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার ভরাট, দরদী এবং আকাশছোঁয়া কণ্ঠস্বর শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’, ‘ও পদ্মা নদীরে’, ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’, ‘দুয়ারে আইসাছে পালকি’Ñএমন অজস্র কালজয়ী গান আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দোলা দেয়।
তিনি ৩০০টিরও বেশি গ্রামোফোন রেকর্ড করেছিলেন এবং শতাধিক চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক বা নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এবং কালজয়ী সিনেমা ‘সুজন সখী’-তে তার গাওয়া গান আজও সমান জনপ্রিয়। আবদুল আলীম তার জীবদ্দশায় পরিবারের জন্য খুব বেশি বৈষয়িক সম্পদ রেখে যেতে পারেননি, কিন্তু রেখে গেছেন কোটি মানুষের ভালোবাসা।
তার জনপ্রিয়তা নিয়ে একটি দারুণ প্রচলিত গল্প রয়েছেÑ একবার তার কমলাপুরের বাসায় চুরি হয়েছিল। চোর অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। কিন্তু দুদিন পর চোর নিজেই একটি ব্যাগে সব জিনিস ফেরত দিয়ে একটি চিরকুট লিখে যায়, যেখানে লেখা ছিলÑ ‘আমি জানতাম না এটি আমার প্রিয়শিল্পী আবদুল আলীমের বাড়ি। নিজের ভুলের জন্য আমি লজ্জিত।
’ প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মানুষ শুধু এই সুরসাধককে একনজর দেখতে তার বাড়িতে ভিড় জমাত। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালে ‘সুজন সখী’ চলচ্চিত্রের জন্য মরণোত্তর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৭৭ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৯৭ সালে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’Ñ এ ভূষিত করে।
আজ আবদুল আলীম আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া মেঠো সুরের মায়াজাল বাঙালিকে যুগ যুগ ধরে আবিষ্ট করে রাখবে। নদীমাতৃক এই বাংলার নদী-নালা, হাওর-বাঁওড় আর মাটির পরতে পরতে প্রতিধ্বনিত হবে তার সেই চিরচেনা গানÑ ‘নাইয়া রে, নায়ের বাদাম তুইলা…। ’ লোকসংগীতের এই মহানায়কের প্রয়াণ দিবসে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
















