দীপ্ত রৌদ্রে ঝলমল করা দিনে, প্রসন্ন প্রকৃতির কোল ঘেঁষে ভ্রমণের যে আনন্দ, তা অনির্বচনীয়, এতে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সুদিন আর একই রকম অনুকূল আবহাওয়ার পুনরাবৃত্তিতে কোথাও যেন লুকিয়ে থাকে একঘেয়েমির ক্লান্তি; সেখানে রোমাঞ্চের বৈচিত্র্য বড় ম্লান হয়ে আসে।
মানুষের মন স্বভাবতই নিরাপদ ও স্নিগ্ধ পরিবেশের কাঙাল, তবু একনিষ্ঠ পরিব্রাজকের অন্তর প্রকৃতির রুদ্ররোষ কিংবা বিরূপতাকেও অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। এমন এক বৃষ্টিমুখর দিনের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে মনোমুগ্ধকর, হৃদয়জুড়ানো ভ্রমণের প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনা। টাপুরটুপুর বৃষ্টির সুর, মেঘাচ্ছন্ন আকাশের সেই উদাস ব্যাকুলতা, এসব পরিব্রাজকের হৃদয়ে এনে দেয় এক অপূর্ব প্রশান্তি, এক নিবিড় মাদকতা।
পথ চলার বাঁকে প্রকৃতি যদি কখনো বৈরী হয়ে ওঠে, দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসে আকাশজুড়ে, তবু প্রকৃত ভ্রমণপিপাসু তার বুকেও খুঁজে নেয় দুর্নিবার আকর্ষণ। কেননা যার অন্তর্লোকে মিশে আছে অজানাকে জানার নেশা, তার কাছে প্রকৃতির প্রসন্ন হাসি আর রুদ্র ভ্রুকুটি, দুই-ই সমান রোমাঞ্চকর, পথের এক অমোঘ আহ্বান। গত পনেরোই আগস্ট শামীম, মতিন আর আমি মিলে ঠিক করলাম, কুতুবদিয়া দ্বীপে যাবো।
ইচ্ছে ছিল সি ট্রাকে যাওয়ার, মগনামার ঘাট থেকে যা সকাল নয়টায় কুতুবদিয়ার উদ্দেশে ছাড়ে। কিন্তু রাতে শামীম জানাল, সি ট্রাক বন্ধ; যেতে হবে ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। সি ট্রাক ধরতে হলে বাড়ি থেকে বেরোতে হতো সকাল আটটায়, কিন্তু নৌকার হিসেবে শামীম বলল নয়টায় বেরোলেই চলবে। অথচ গভীর রাত থেকে সকাল অবধি অবিরাম বৃষ্টি নামায় ঠিক নয়টায় বের হওয়া গেল না।
শামীম নিজেই বলল, বৃষ্টি থামলে বের হইস। বৃষ্টি একটু ধরে এলে ষোলোই আগস্ট সকাল সাড়ে নয়টায় যখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছি, তখনই চাচাতো ভাই তানভীর জিজ্ঞেস করল, কুতুবদিয়া যাচ্ছি কি না। বললাম, হ্যাঁ। ও কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, চল তবে বেরিয়ে পড়ি। ঠিক তখনই রাস্তা থেকে শামীম ডাক দিল, ক্যামেরাটা যেন নিয়ে আসি। শোনামাত্র তানভীর নিজেই ক্যামেরার ব?
্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। শামীম খানিক অবাক হয়ে বলল, তুই না গতকাল বললি যাবি না! তানভীর জবাব দিল না, শুধু সবার দিকে তাকিয়ে একগাল হাসি দিল। এরপর শামীম, হালিম, তানভীর আর আমি, চারজনে গিয়ে দাঁড়ালাম পেঠান মাতবরপাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে, মতিনের অপেক্ষায়। সে তখনও পথে। ইতোমধ্যে বৃষ্টি একটু থেমে আবার নতুন করে শুরু হলো। মগনামা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য ঠিক করা অটোর চালককে বললাম, মতিনকে একটু তুলে আনতে।
স্থানীয় হওয়ায় চালক তাকে চিনতেন, তাই আনতে অসুবিধা হলো না। দশটার দিকে মতিন এসে পৌঁছালে সবাই মিলে রওনা দিলাম, ততক্ষণে বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। দেড় কিলোমিটার যেতে না যেতেই গাড়ি একটা নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করাতে হলো, কারণ বৃষ্টির সঙ্গে হালকা বাতাসে সবাই ভিজে যাচ্ছিলাম। সেখানে আরও আধঘণ্টা অপেক্ষার পর অবশেষে আরেকটি সিএনজি ভাড়া করে মগনামায় পৌঁছালাম।
ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তখন সাধারণ মালামাল তুলছিল। সেই ফাঁকে নাস্তা সেরে নিলাম, তুলে নিলাম কিছু ছবি। নৌকায় ওঠার প্রায় চল্লিশ মিনিট পর নামলাম বড়ঘোপ ঘাটে। যাওয়ার পথে সমুদ্রে ছিল জোয়ারের টান। মাঝসমুদ্রে বৃষ্টি খানিক থেমে রুদ্র জ্বলজ্বলে সূর্য উঁকি দিচ্ছিল, কিন্তু ঘাটে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার নামল ঝুম বৃষ্টি, সঙ্গে হালকা, হৃদয় জুড়ানো শীতল হাওয়া।
সে হাওয়ায় দূষণের লেশমাত্র নেই, আছে শুধু হৃদয়ের সব জীর্ণতা ধুয়ে দেওয়ার মতো মহৌষধের ছোঁয়া। বড়ঘোপ ঘাট থেকে সবাই মিলে ঠিক করলাম, প্রথমে যাব কুতুবদিয়া বাতিঘরে, এটা এই দ্বীপের সবার চেনা ও পরিচিত সুন্দর জায়গা। একটা অটোতে গাদাগাদি করে উঠে রওনা দিলাম। বৃষ্টিতে সবাই হালকা ভিজে যাচ্ছিলাম, তবু কারো মনে বিন্দুমাত্র বিষাদ নেই, আছে শুধু ভ্রমণের আনন্দমাখা উষ্ণ, মৃদু হাসি।
গল্প করতে করতেই পৌঁছে গেলাম বাতিঘরের সামনে। তখন মসজিদের মাইকে ভেসে আসছে জোহরের আজান। লোককথা ও প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী শোনা যায়, হজরত কুতুবউদ্দিন নামের একজন ধর্মপ্রাণ পীর তার সহচর আলী আকবর, আলী ফকিরকে সঙ্গে নিয়ে এই দ্বীপে এসে মগ ও পর্তুগিজদের হটিয়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন। আরাকান আর চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপন্ন মুসলমানেরাও তখন জীবিকার সন্ধানে এসে জড়ো হন এই দ্বীপে।
ব্রিটিশ আমলে ১৮৪৬ সালে সাগরে চলাচলকারী নাবিকদের দিকনির্দেশনা দিতে এখানে নির্মিত হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী এক বাতিঘর। প্রাচীন সেই বাতিঘরটি দীর্ঘদিন সমুদ্রের নাবিকদের পথ দেখালেও ১৯৬০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরে ১৯৬৫ সালে নতুন করে আরেকটি বাতিঘর নির্মাণ করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়েও ক্ষতিগ্রস্ত হলে, পরবর্তীকালে গড়ে ওঠা বর্তমান বাতিঘরটি যেন সেই প্রাচীন নাবিক-ইতিহাসের স্মারক হয়েই দাঁড়িয়ে আছে।
গেটে তালা ঝুলছিল দেখে পাশের এক দোকানির কাছে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি জানালেন, বিকেল চারটায় খুলবে। চারটা বাজতে ঢের দেরি, তাই সবার সিদ্ধান্তে বাইরে থেকে একটু দেখে বড়ঘোপ বাজারের দিকে রওনা দিলাম। পথে অটোচালক বললেন, এ তল্লাটে বড়ঘোপ সমুদ্রসৈকতের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই; তবু একটা আক্ষেপ থেকেই গেল সবার মনে, যেখানে প্রথম গেলাম, তাকে আলিঙ্গন না করে, তার বালিতে পায়ের ছোঁয়া না লাগিয়ে, সমুদ্রের জলের স্পর্শে হৃদয় না ভিজিয়ে ফিরে আসাটা বড় কষ্টের ছিল।
বড়ঘোপ বাজারে পৌঁছে প্রথমেই মাছ, সবজি, ডিম আর ডাল দিয়ে তৃপ্তিসহকারে দুপুরের খাবার সারলাম। শামীম, মতিন আর আমি একই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছি, আমাদের তিনজনের শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, দুপুরে বসে একসঙ্গে খাওয়া, মাঝেমধ্যে আমি আর শামীম দৌড়ে বাড়ি এসে ভাত খেয়ে আবার দৌড়ে ক্লাসে ফেরা, দুষ্টুমি, রাগারাগি, সবকিছুই আজও চোখে ভাসে।
মাঠের খেলাধুলা কিংবা ক্লাসের দুষ্টুমির দায়ে পশ্চিমমুখী হয়ে সিজদার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা, তারপর শাহাদাত স্যারের হাতে গোটা ক্লাসশুদ্ধ মার খাওয়া, মনে হয় যেন গতকালেরই ঘটনা। তানভীর ছোটবেলায় আমারই ক্লাসে পড়ত; বাড়ির উঠোনে আমরা একসঙ্গে ক্রিকেট খেলতাম, সে স্মৃতি ভোলার নয়। হালিম আমাদের সমবয়সি, আমাদেরই খেলার সাথী। জীবনের বাস্তবতার টানে আজ আমরা পাঁচজন পাঁচ দিকে ছড়িয়ে পড়েছি, তবু এমন একসঙ্গে ভ্রমণ যেন মুহূর্তেই ফিরিয়ে আনে সেই শৈশবের দিনগুলো।
খাওয়া শেষে চা খেলাম। বাজারের পাশেই সমুদ্র, তার ঢেউয়ের কলতান শোনা যায় বাজারের ভেতর থেকেও। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমেছে, সূর্যের কিরণে ঝিকমিক করছে সমুদ্রের জল। নেমে পড়লাম সৈকতে, নিজেদের মতো করে তুললাম কিছু ছবি। শৈশবের মতোই নিজেকে ছেড়ে দিয়ে উপভোগ করলাম সমুদ্রের মৃদু সুর আর শীতল হাওয়া। সৈকতের ধার ঘেঁষে কক্সবাজারের মতোই সারি সারি ঝাউগাছ, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা সমুদ্রদর্শনের পর ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিয়ে খানিক প্রশান্তি খুঁজে নিতে পারেন।
কুতুবদিয়া দ্বীপের সৌন্দর্য আমরা এর আগেও বহুবার উপভোগ করেছি, কোথায় কী আছে, তা আমাদের নখদর্পণে। তাই পরিকল্পনায় থাকা সত্ত্বেও এবার আর বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যাওয়া হলো না; আগেই তার সৌন্দর্য আস্বাদন করা হয়ে গেছে। বাংলাদেশে বায়ুবিদ্যুতের প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিকাশের ইতিহাসে কুতুবদিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এখানে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং ২০০৭ সালের দিকে দক্ষিণ ধুরং এলাকার তাবলারচরে ৫০টি বায়ুকল নিয়ে এক মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। যার হাত ধরে দ্বীপের ঘরে ঘরে আলো পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা হয়েছিল। প্রকল্পটি বহুবার বন্ধ হয়েছে, বহুবার নতুন উদ্যমে চালু হয়েছে, আবার থমকে গেছে দুর্ঘটনা আর অযতেœ। আজ পাখাগুলো আর ঘোরে না ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রথম স্বপ্নযাত্রার সাক্ষী হয়ে সেই ইতিহাস এখনো জীবন্ত।
এখানে গেলে চোখে পড়ে, কীভাবে সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয় লবণ, লবণচাষিরা কেমন জীবন কাটান তার জীবন্ত চিত্র। এর আগে যখন এসেছিলাম, সঙ্গে ছিল ছেলেবেলার দুই বন্ধু, আসিফ আর কাফি। সেদিন প্রচ- গরমে বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে এক আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে আইসক্রিম কিনে খেয়েছিলাম। তাতেও তেষ্টা না মেটায়, পাশের এক বাড়ির টিউবওয়েল থেকে পানি খেয়েছিলাম এক ভাইয়ের সহায়তায়।
যে ভাই সাহায্য করেছিলেন, তিনি পেশায় লবণচাষি; বয়সে কাছাকাছি হওয়ায় তার সঙ্গে লবণ নিয়ে অনেক কথা হলো। তিনি বললেন, তারা লবণের ন্যায্য দাম পান না। কথাটা মিথ্যে বলেননি সেই ভাই। বাংলাদেশের অধিকাংশ লবণ উৎপন্ন হয় কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে। হাজার হাজার প্রান্তিক লবণচাষির নিরলস শ্রমে গড়ে ওঠা এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ন্যায্যমূল্য নিয়ে চাষিদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
দেশে লবণ আমদানি, বাজারব্যবস্থাপনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে দেশীয় লবণচাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পানি খাওয়ার পর পাশেই দেখা সমুদ্রতীরে পৌঁছাতে লবণের মাঠ পেরোতে হলো। প্রচ- গরমের মধ্যেও তীরে ছিল শীতল হাওয়া। শার্ট খুলে তিন বন্ধু মিলে কিছুক্ষণ সে হাওয়া গায়ে মাখলাম।
আসিফ জিজ্ঞেস করল, কেমন লাগছে? বললাম, এক অসাধারণ অনুভূতি, শত কোটি টাকা দিয়েও যা কেনা ও অনুভব করা সম্ভব নয়। তবে সেখানে একটা বিষয় চোখে পড়ল, সমুদ্রতীরের একপাশে যেখানে পাথরের ব্লক দিয়ে মজবুত বাঁধ দেওয়া হয়েছে, তা বেশ টেকসই; অন্যপাশে বালির বস্তার বাঁধ প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে সমুদ্রেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা নেহাত ছোট নয়। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক ভাঙনে কুতুবদিয়া দ্বীপ তার বিস্তীর্ণ ভূখ- হারিয়েছে; বহু জনপদ ও বসতভিটা চলে গেছে সমুদ্রগর্ভে।
বহু পরিবার হারিয়েছে বসতভিটা ও জীবিকা; গত কয়েক দশকে ভাঙন ও দুর্যোগের কারণে হাজার হাজার মানুষ দ্বীপ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। তার জন্য সর্বত্র টেকসই বাঁধ দেওয়া জরুরি। যেহেতু বাকিরা শুধু বড়ঘোপ সৈকতের সৌন্দর্যই উপভোগ করতে চাইছিল, আমিও আর দ্বিমত করলাম না, আগের ভ্রমণের স্মৃতি তো হৃদয়ে এখনো অমলিন। এই বড়ঘোপ সমুদ্রসৈকতই যেন গোটা কুতুবদিয়ার প্রতিচ্ছবি।
আসরের সময় ঘনিয়ে আসতেই আশপাশ আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা কিশোর-তরুণের ভিড় বাড়তে লাগল সৈকতে, দেখা মিলল কিছু পর্যটকেরও। আমাদের ক্যামেরায় ছবি তুলতে দেখে কয়েকজন পর্যটক নিজেদেরও কিছু ছবি তুলে দিতে অনুরোধ করলেন। চাচাতো ভাই সাগ্রহে তুলে দিলেন তাদের ছবি; বকশিশ দিতে চাইলেও তানভীর বিনয়ের সঙ্গে তা ফিরিয়ে দিল। স্থানীয় কিশোররা নিজেদের মধ্যে দল বেঁধে, তরুণেরা তরুণদের সঙ্গে দল বেঁধে ফুটবল খেলছিল।
কিছু কিশোর-বালকও খেলতে এসেছে, তারাও নিজেদের মতো করে মেতে উঠেছে খেলায়। তারাও তাদের মতো দল বেঁধে খেলছে। তাদের খেলার শৈলী অসাধারণ; বোঝা গেল, খেলার মাঠের অভাব নেই বলেই নিয়মিত অনুশীলনে এমন দক্ষতা অর্জন করেছে তারা। এমন সময় শামীমের পরিচিত এক ভাই এসে হাজির হলেন। তার সঙ্গে দুজন বন্ধুও ছিল। আমাদের নিয়ে খানিকটা হাঁটাহাঁটি করলেন, খেলাধুলা আর জীবনের নানা বাস্তবতা নিয়ে গল্প করতে করতে কখন যে মাগরিবের সময় হয়ে গেল, টেরই পেলাম না।
আমরা বারণ করা সত্ত্বেও ভাইয়েরা জোর করেই নাস্তা করালেন। তাদের এই আন্তরিকতায় মুগ্ধ হলাম সবাই। খানিক পরই অন্ধকার নামবে, বাড়ি ফেরার নৌকা ধরতে হবে বলে তাড়াহুড়ো করে ফিরলাম বড়ঘোপ ঘাটে। একটু পরই একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকা ছেড়ে যাচ্ছিল, তাতেই উঠে পড়লাম। ফেরার পথে আবহাওয়া হঠাৎ বদলে গেল। সময়ের অনেক আগেই মেঘে ঢেকে অন্ধকার হয়ে গেল গোটা আকাশ।
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে তারই বিপরীত রূপ দেখতে হবে, এমনটা ভাবিনি। অথচ সেই বিরূপ পরিবেশও যেন হয়ে উঠল আরও বেশি সুন্দর। প্রকৃতি যেন জীবনেরই মতো উত্থানপতনে ব্যস্ত, তার রুক্ষ রূপ দেখাতেও দ্বিধা করে না। তবু সেই রুক্ষতাই আমাদের চোখে সুন্দর হয়ে ধরা দিল, কারণ তা আমাদের কোনো ক্ষতি করেনি। খানিক বৃষ্টি নেমে সব ধুলোময়লা ধুয়ে দিয়ে, হৃদয়ে প্রশান্তি ফিরিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেল।
বুঝলাম, ভয়ংকর প্রকৃতি, ভয়ংকর মানুষ কিংবা প্রাণী সবই সুন্দর, যদি তারা ক্ষতি না করে। আরও বুঝলাম, প্রকৃতির রুদ্ররূপ কিংবা তার বিরূপ আবহাওয়ার বিপুল শক্তিও কতটা মোহনীয় ও সুন্দর হতে পারে, যদি তা ধ্বংসাত্মক রূপ না নেয়। যৌবনে এসে শৈশবের বন্ধুদের নিয়ে এই ভ্রমণ রয়ে গেল স্মৃতি হয়ে। এশার আজানের আগে শেষ পর্যন্ত নিরাপদে সবাই বাড়িতে ফিরে আসলাম।



















