স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হতে যাচ্ছে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দুর্গম চর আষাড়িয়াদহ। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা এই চরে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বাস হলেও এতদিন তাদের কাছে বিদ্যুৎ ছিল কেবল স্বপ্নের মতোই।
সন্ধ্যা নামলেই কুপি, মোমবাতি আর হারিকেনের আলোতেই চলত জীবন। অবশেষে সেই দীর্ঘ অন্ধকার কাটার আশ্বাস মিলেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে চর আষাড়িয়াদহে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নেসকো। পদ্মার বুকজুড়ে বিস্তীর্ণ চর। চারদিকে কেবল বালু আর সবুজের সমারোহ। শহর থেকে দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। অথচ আধুনিক নগর জীবনের সবচেয়ে মৌলিক সুবিধাগুলোর একটি বিদ্যুৎ এখনো পৌঁছেনি এই জনপদে।
সূর্য ডুবে গেলেই নেমে আসে অন্ধকার। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, গৃহিণীদের রান্নাবান্না কিংবা অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা—সবকিছুতেই ছিল সীমাহীন দুর্ভোগ। ২০১৫ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে সীমিত পরিসরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু লোকসানের কারণে ২০২৪ সালের জুনে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আবারও অন্ধকারে ফিরতে হয় চরবাসীকে।
এবার সেই পরিস্থিতির অবসানের আশ্বাস এসেছে নেসকোর পক্ষ থেকে। শনিবার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের কানাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসে সুধী সমাবেশ। এর আগে নেসকো ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে এলাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন নেসকোর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন। চরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সম্ভাব্য পথ নিয়েও নেন মতামত।
নেসকো চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বলেন, প্রযুক্তির এই যুগে এসেও এত বড় একটি জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে থাকবে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। চরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, চরবাসীর আরেক বড় আতঙ্ক পদ্মার ভাঙন। সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও দেন নেসকো চেয়ারম্যান।
চরবাসীর আশা, বিদ্যুতের আলো শুধু ঘর আলোকিত করবে না—আলোকিত করবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও। বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নত হবে যোগাযোগ ও চিকিৎসাসেবা। তৈরি হবে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা পেরিয়ে তাই বিদ্যুতের ঘোষণায় চর আষাড়িয়াদহের মানুষের চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এতদিন আমরা হারিকেনের আলোতে ছিলাম।
বিদ্যুৎ এলে ছেলে-মেয়েরা ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারবে, আমাদের জীবনও অনেক সহজ হবে। সমাবেশে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান, এলজিইডির প্রকৌশলী আয়াতুল্লাহ বেহেশতী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। রাজশাহী শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরের এই চরটি যেন এতদিন ছিল আধুনিকতার বাইরে।
সন্ধ্যা নামলেই যেখানে অন্ধকার গ্রাস করত পুরো জনপদ, সেখানে এবার বিদ্যুতের আলো পৌঁছানোর অপেক্ষা। নেসকোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু অন্ধকারই দূর হবে না, বদলে যেতে পারে পদ্মার এই দুর্গম জনপদের জীবনযাত্রাও।






















