দেশে চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন খাতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে, ফলে জনজীবন চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দৈনিক প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া ও পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসছে। অনেক পরিবার নির্ধারিত সময়ে রান্না করতে পারছে না, বাধ্য হয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে অটোরিকশা ও অন্যান্য সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের। এতে পরিবহন খাতে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চালকদের আয়ও কমে গেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্যমতে, রোববার সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট, বিপরীতে লোডশেডিং করতে হয়েছে ১ হাজার ৮২১ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুটে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। সুনামগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, যশোর, রাজবাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও দিনে ২০ থেকে ২৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অনেকেই মোমবাতি কিংবা চার্জলাইটের আলোয় পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যসেবাতেও। বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর না থাকায় রোগীরা গরমে কষ্ট পাচ্ছেন এবং চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চলগুলোতেও উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত করে পুনরায় চালু করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
12:31 pm, Monday, 3 August 2026
শিরোনাম :
Popular Post






















