বিশ্ব যেন এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোথাও অবিরাম বৃষ্টিতে নদী উপচে জনপদ ডুবে যাচ্ছে, আবার পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বনভূমি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। একদিকে বন্যার তাণ্ডব, অন্যদিকে দাবানলের লেলিহান শিখা। প্রকৃতির এ দুই বিপরীত রূপ একই সময়ে বিশ্ববাসীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে অন্যতম কারণ দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে, আগামী মাসগুলোতে এই জলবায়ুগত পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দোরগোড়া পেরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে সংকট : জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেছেন, এল নিনো আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি ইতোমধ্যে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তার ভাষায়, পৃথিবী কেবল একটি নতুন উষ্ণ সময়ের সূচনা দেখছে। সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সঙ্গে এল নিনোর সাময়িক কিন্তু শক্তিশালী প্রভাব মিলিত হয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করছে, যা বিশ্বের বহু অঞ্চলে দুর্যোগকে আরও ঘনঘন এবং আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
কেন এত আলোচনায় এল নিনো : এল নিনো এমন একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যার সময় মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। সমুদ্রের এই পরিবর্তন শুধু একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, মেঘের গঠন, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক চক্রকে বদলে দিতে শুরু করে। ফলে কোথাও বৃষ্টি কমে দীর্ঘ খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টিতে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ বন্যা। অনেক অঞ্চলে দীর্ঘ তাপপ্রবাহ বনাঞ্চলকে এতটাই শুষ্ক করে তোলে যে সামান্য একটি আগুন মুহূর্তেই দাবানলে পরিণত হয়।
তাপমাত্রা বাড়ার নতুন আশঙ্কা : বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে বৈশ্বিক আবহাওয়াব্যবস্থায়। পৃথিবীর অধিকাংশ স্থলভাগেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে। বিশেষ করে আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারে।
একদিকে দাবানল, অন্যদিকে বন্যা : পৃথিবীর নানা দেশে এখন প্রকৃতির দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা দেখা যাচ্ছে। আফ্রিকা ও ইউরোপের বহু অঞ্চলে দাবানল দিনে দিনে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ মৌসুমি বৃষ্টির কারণে বন্যায় বিপর্যস্ত। একই সময়ে একই পৃথিবীতে এমন বিপরীতধর্মী দুর্যোগ জলবায়ুর পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো এই বৈপরীত্যকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে।
আগুনে পুড়ছে ইউরোপের বনভূমি : দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্স ও স্পেনের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল কয়েক সপ্তাহ ধরে আগুনে জ্বলছে। হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। আগুন নেভাতে হাজারো দমকলকর্মী দিনরাত কাজ করছেন। বিভিন্ন দেশ থেকেও সহায়তা পৌঁছেছে। আকাশপথে বিশেষ উড়োজাহাজ ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবু অনেক এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
দাবানল কেন এত সহজে ছড়িয়ে পড়ে : বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর অসংখ্য দাবানলের ঘটনা ঘটে। বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক কারণ থাকলেও অধিকাংশ দাবানলের পেছনে রয়েছে মানুষের অসতর্কতা। বনভূমিতে আগুন জ্বালিয়ে পুরোপুরি না নেভানো, জ্বলন্ত সিগারেট ফেলে দেওয়া, কৃষিজমির আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে বন পোড়ানো— এসব কারণেই অধিকাংশ দাবানলের সূত্রপাত ঘটে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী খরা, উচ্চ তাপমাত্রা, কম আর্দ্রতা এবং প্রবল বাতাস বনকে আরও দাহ্য করে তোলে। ফলে ছোট একটি আগুনও দ্রুত বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক স্বার্থে বন পুড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিজমি বা চারণভূমি তৈরির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বনভূমিতে আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে জমি পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে আগুন ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় সেই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ভয়াবহ দাবানলে রূপ নেয়। এতে শুধু বনভূমিই নয়, আশপাশের জনপদ, বন্যপ্রাণী এবং পরিবেশও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।
সব দাবানল একই রকম নয় : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব দাবানল পরিবেশের জন্য সমান ক্ষতিকর নয়। প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত কিছু দাবানল বনভূমির স্বাভাবিক পুনর্জন্মে সহায়তা করে। আগুনে পুড়ে যাওয়া গাছপালা ছাই হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে উর্বরতা বাড়ায়। ঘন বন পরিষ্কার হওয়ায় নতুন উদ্ভিদ জন্মের সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি কিছু উদ্ভিদের বীজ আগুনের তাপ ছাড়া অঙ্কুরিতই হতে পারে না। কিন্তু বর্তমান সময়ের দীর্ঘস্থায়ী, অস্বাভাবিক তীব্র এবং বারবার সংঘটিত দাবানল সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ আঘাত : দাবানলের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছে বন্যপ্রাণী। বনভূমি পুড়ে গেলে অসংখ্য প্রাণী মারা যায়, অনেকেই আবাসস্থল হারিয়ে অন্যত্র ছুটে যায়। বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে। একসময়ের সবুজ বনভূমি পরিণত হয় ধূসর ছাইয়ের স্তূপে। বন ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় কার্বন শোষণের ক্ষমতা, ফলে বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি কার্বন জমা হয় এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও ত্বরান্বিত হয়।




















