বহুমাত্রিক প্রতিভার দ্যুতি ছড়ানো সময়ের দর্শকপ্রিয় ও ব্যস্ত উপস্থাপিকা শান্তা জাহান। নিয়মিত তিনি টেলিভিশন ও করপোরেট ইভেন্ট উপস্থাপনা করছেন। ২০১২ সালে টেলিভিশন পর্দার মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করার পর নিজের মেধা, অনবদ্য বাচনভঙ্গি এবং সদা হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি দিয়ে জয় করেছেন লাখো দর্শকের হৃদয়। মূলত উপস্থাপক হিসেবে তিনি দেশের প্রথম সারির তারকাদের একজন হলেও বিজ্ঞাপনের মডেল এবং ছোটপর্দার অভিনেত্রী হিসেবেও রেখেছেন সফলতার স্বাক্ষর। চ্যানেল নাইনের ‘সোনার বাংলা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মাইক্রোফোন হাতে টেলিভিশন উপস্থাপনায় তার অভিষেক ঘটে। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দেশের শীর্ষস্থানীয় সব চ্যানেলে নিয়মিত অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করে আসছেন তিনি। শুধু টিভির পর্দাই নয়, দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ও বড় বড় করপোরেট ইভেন্ট, এমনকি দেশের বাইরের স্টেজ শো-গুলোতেও শান্তা জাহান এখন এক নির্ভরযোগ্য নাম। বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার উপস্থাপনায় নিয়মিত বিভিন্ন টেলিভিশনে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে। সুপারস্টার গ্রুপের নতুন একটি টিভিসি নিয়ে কথা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে শুটিং শুরু হবে। এ ছাড়া করপোরেট শো করছি। এরই মধ্যে চায়না, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া শো করেছি। ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ব্যস্ততা আছে।’ দুই মাধ্যমেই উপস্থাপনা করেন শান্তা জাহান। টিভি নাকি করপোরেট ইভেন্ট কোন মাধ্যম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি চ্যানেলে অনুষ্ঠানগুলো এখন একই ঘরানার হয়ে গেছে। অনুষ্ঠানে খুব একটা পার্থক্য নেই। তবে স্টেজে স্ক্রিপ্ট ছাড়া নিজের মতো করে উপস্থাপনা করার সুযোগ থাকে এবং বৈচিত্র্য আনা যায়। এখানে সরাসরি দর্শকদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। স্টেজে আমি হাততালি দিতে বললে তালি দিবে, আবার দাঁড়াতে বললে সবাই দাঁড়িয়ে যাবে। এখানে নিজেকে প্রমাণেরও সুযোগ আছে। সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ আছে। এটা একজন উপস্থাপিকার জন্য বড় ক্যানভাস। টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অল্প সময়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করতে হয়। খুব বেশি নিজেকেও মেলা ধরা যায় না। তার মধ্যে কয়েকটি পডকাস্ট একটু ব্যতিক্রম আছে। শিল্পীরা কথা বলতে চায় কিন্তু সেই মাধ্যম বা স্বাচ্ছন্দ্যবোধের জায়গা তারা পায় না। রিলসের যুগে এখন সবাই পডকাস্ট করছে, সেই জায়গা থেকে ভিন্ন কিছু করা কিংবা দর্শকদের মন জয় করা সহজ নয়। অনুষ্ঠান খুব বেশি ব্যতিক্রম না হলে মানুষ দেখবে না। তবে খুব ভালো মানের পডকাস্ট এখনো আমাদের দেশে চালু হয়নি।’ এখন প্রতিটি চ্যানেলে ঘুরেফিরে একই শো। এ থেকে উত্তরণের উপায় জানিয়ে শান্তা বলেন, ‘প্রতিটি জায়গায় কথা বলার স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমাদের এখানে প্রশ্নের মধ্যে সবকিছু সীমাবদ্ধ। আলাদা করে কথা বলার সুযোগ নেই। তার মধ্যে এডিট করে অনেক কিছু প্রচার হয় যে কারণে মূল বার্তাও হারিয়ে যায়। প্রশ্ন তো যে কেউ বসে করতে পারে কিন্তু কে, কার সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে সেই দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সবকিছুর একটা পরিবর্তন দরকার।’ উপস্থাপনাতেই শান্তার প্রধান ধ্যানজ্ঞান হলেও গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের অন্যতম মডেল তিনি। বিশেষ করে ‘বিকাশ’-এর একটি বিজ্ঞাপনে মডেল হয়ে তিনি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পান। এরপর ক্যারিয়ারে অসংখ্য নামি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনচিত্রে তাকে দেখা গেছে। মডেলিংয়ের পাশাপাশি অভিনয়ের জগতেও রয়েছে তার সাবলীল যাতায়াত। নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহর ‘নাইন অ্যান্ড হাফ’ টেলিফিল্মের মাধ্যমে অভিনেত্রী হিসেবে তার অভিষেক হয়। এরপর আরও বেশকিছু কাজে তাকে দেখা যায়। অনেক দিন ধরে অভিনয়ে নেই শান্তা। কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উপস্থাপনাও এক প্রকার অভিনয়। চরিত্রের অভিনয়ে গ্যাপ আছে। মাঝে মাবরুর রশিদ বান্নাহ পরিচালিত একটি কাজ করেছি। খুব শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। উপস্থাপনার ব্যস্ততার কারণে সেভাবে অভিনয়ের সুযোগ মিলে না। আবার অনেক সময় গল্প ও চরিত্র পছন্দ হয় না। সামনে ব্যাটে বলে মিলে গেলে অভিনয়ে দেখা যাবে। তবে নিয়মিত হওয়ার আগ্রহ নেই। উৎসবনির্ভর কাজ করতে চাই। উপস্থাপনা ও অভিনয় একসঙ্গে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। যখন অভিনয়ের দারুণ সময় গেছে তখনো নিয়মিতভাবে কাজ করিনি, এখনো চাই না। আমি উপস্থাপনাটা নিয়মিত করে যেতে চাই। দিনশেষে উপস্থাপনা আমাকে সজীব রাখে। অনেক বেশি মানসিক প্রশান্তি দেয়।’ শান্তার মিডিয়ায় পথচলা শখে ছিল না। তবে কাজের তাগিদে শুরু হয়েছিল। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন কাজ শুরু করি তখন এটা আমার জন্য সহজ ছিল। অডিশন দিয়ে কাজ করেছি। অল্প সময়ে ভালো উপার্জন করা যায় পাশাপাশি পড়াশোনায় ক্ষতি হচ্ছে না সেই ভাবনা থেকে এই পথচলা। কিন্তু বড় স্টার হওয়ার ভাবনা থেকে কাজ শুরু করিনি। দেখতে দেখতে পথচলার ১৪ বছর হয়েছে। আমি মনে করি এখনো শিখছি।’ সবার মতো শান্তাও সিনেমায় অভিনয় করতে চান। সে কথা জানিয়ে বলেন, ‘মাঝে কিছু গল্প পেয়েছিলাম কিন্তু উপস্থাপনার ব্যস্ততার কারণে চলচ্চিত্রের জন্য সময় হয়নি। বড় পর্দায় কাজের ক্ষেত্রে নারীকেন্দ্রিক গল্প চাই। আমাকে নায়িকা হতে হবে সেই চিন্তা কখনোই নেই। চরিত্র ও গল্প আমাকে ঘিরে হলে কাজ করব। সেটা যে ঘরানার সিনেমা হোক। আত্মতৃপ্তি পাওয়ার মতো কাজ করতে চাই। যে গল্পে এর আগে কাজের প্রস্তাব পেয়েছি সেগুলো আমাকে খুব একটা টানেনি। আর এখন ভালো কাজ হলেও হাতেগোনা কিছু মানুষ কাজ করছে। নতুনরা সুযোগ পাচ্ছে না। চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুনদের নিয়েও ভাবা উচিত।’ অনেকেই আপনাকে সময়ের সেরা উপস্থাপিকা হিসেবে আখ্যা দেন। শুনতে কেমন লাগে? উত্তরে শান্তা বলেন, ‘শুনতে খুব ভালো লাগে। তবে প্রতিনিয়ত আমি শিখছি। মানুষের শেখার কোনো শেষ নেই এবং জ্ঞান অর্জনের এই যাত্রাটি আজীবন চলমান থাকে। জন্ম থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা প্রতিনিয়ত পরিবেশ, মানুষ এবং অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কিছু শিখতে থাকি। সবসময় নিজের সেরাটা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা থাকে। যারা বলেন ভালোবেসে বলেন। তারা ভালোবাসেন বলেই এখনো টিকে আছি। প্রায় দেড় দশক ধরে কাজ করছি। সবকিছু মিলিয়ে আলহামদুলিল্লাহ।’ মিডিয়াতে কাজ করতে গেলে অনেক ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে। তবে সেভাবে শান্তার তিক্ত অভিজ্ঞতা নেই। আবার তিনি এও বলেছেন যে, যেভাবে মিডিয়া নিয়ে বলা হয় ততটাও নয়। ভালো-মন্দ সব জায়গাতেই আছে। মিডিয়ারটা একটু বেশিই সামনে আসে। তবে কিছু অপ্রত্যাশিত তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। যেগুলো মনে রাখতে চান না। তবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পারিশ্রামিক নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে অনেকবার। ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকের কাছে এখনো পারিশ্রামিক পান তিনি। ছোটবেলা থেকেই শিল্পের প্রতি আগ্রহ ও সাংস্কৃতিক মানসিকতা ছিল শান্তার। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদে সংবাদ উপস্থাপনার অডিশন দিয়ে নির্বাচিত হন। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা ছিল না; বরং পারিবারিক আবহ তার কাজের অনুকূলে ছিল। সেই শুরু যা এখনো চলছে। কখনো ভাবতেও পারেননি তাকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যাবে। পরিকল্পনা ছাড়াই বহুদূর পেরিয়েছেন। বাকি দিনগুলো ভালো কাজ উপহার দিতে চান। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অনেক উপস্থাপক ইচ্ছাকৃতভাবে বা অসাবধানতাবশত অদ্ভুত, আপত্তিকর কিংবা বিতর্কিত প্রশ্ন করে দ্রুত আলোচনায় বা ‘ভাইরাল’ হওয়ার চেষ্টা করেন। টেলিভিশন টকশো, পডকাস্ট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ইন্টারভিউগুলোতে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এই বিষয়টি ভালোভাবে দেখেন না শান্তা। তার ভাষায়, ‘এগুলো খুবই বিরক্তকর বিষয়। এ কারণে আমরা প্রশ্নের মুখোমুখি হই। কিছু নতুন মুখ এগুলো শুরু করেছিল। অল্পতেই তারা হারিয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ যেমন তাদের পছন্দ করে না, তেমনই যারা তাদের নিয়ে কাজ করেছেন তারাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। দিনশেষে ভালো কাজ টিকে থাকবে। খারাপ কাজ হারিয়ে যাবেই। ভালো কাজই একজন মানুষকে টিকিয়ে এবং বাঁচিয়ে রাখে। এসব মানুষদের থেকে সবসময় দূরে থাকি। সব জায়গায় গিয়ে নিজের রুচি নষ্ট করি না। সম্মানের সঙ্গে ভালো কাজের মাধ্যমে এখনো কাজ করছি। আমাদের দেশে খারাপ জিনিসের চর্চা বেশিই হয়।’ একাকিত্বের অনুভূতি আমাদের জীবনের এমন এক সত্য, যা কম-বেশি প্রতিটি মানুষকেই কখনো না কখনো স্পর্শ করে যায়। ভিড়ের মাঝেও নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হওয়া কিংবা চেনা মানুষের মাঝেও একটুখানি আন্তরিকতার অভাব এই অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। শান্তাকেও একাকিত্ব ছুঁয়ে যায়। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা খুবই ব্যস্ত থাকে দিনশেষে বাসায় ফিরলে তারাও একাকিত্ব ফিল করে যদি তার পার্টনার না থাকে। এখন একাকিত্ব সময়ের সঙ্গী। অনেক ব্যস্ত যখন থাকি তখন একদম টের পাই না। যখন ক্লান্তি শেষে বাসায় ফিরে একজন মানুষের অভাব অনুভব করি তখন একাকিত্ব খুব ছুঁয়ে যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছি। কারণ, একটা বয়স পার করার পর কাউকে বিশ্বাস করা খুব কঠিন। কারো প্রতি আজীবনের জন্য আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। এখন সবকিছু ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছি।’ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ শান্তা জাহান এরই মধ্যে ঝুড়িতে পুরেছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু পুরস্কার এবং সম্মাননা। তবে দর্শকদের ভালোবাসাই তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন বলে জানান।
2:25 am, Saturday, 1 August 2026
শিরোনাম :








