3:22 am, Friday, 31 July 2026

ইউসিবি প্রযুক্তিনির্ভর, গ্রাহককেন্দ্রিক ও টেকসই হোম ফাইন্যান্সিং মডেল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:11:14 am, Friday, 31 July 2026
  • 4
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বর্তমানে আপনার ব্যাংকের হোম লোন পোর্টফোলিওর আকার কত? গত এক বছরে প্রবৃদ্ধি কেমন ছিল? উত্তর : রিটেইল ব্যাংকিং ইউসিবির অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যবসা। এর মধ্যে হোম লোন একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। বর্তমানে আমাদের হোম লোন পোর্টফোলিও প্রায় ১১৮৪ কোটি টাকা (জুন ২০২৬ পর্যন্ত), যা গত এক বছরে প্রায় ৪% প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশে আবাসন অর্থায়নের বাজার এখনো মোট ব্যাংক ঋণের তুলনায় খুবই ছোট। ফলে এই খাতে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইউসিবি সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে গ্রাহকবান্ধব ঋণ কাঠামো, দ্রুত অনুমোদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং একটি মানসম্মত, টেকসই এবং কম ঝুঁকির হোম লোন পোর্টফোলিও গড়ে তোলা। দেশে হোম লোনের চাহিদা বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে? উত্তর : বাংলাদেশে নগরায়ণের হার দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করছে, যা আগামী দশকে আরও বাড়বে। একই সঙ্গে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ নতুন করে কর্মসংস্থানের কারণে শহরে আসছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পুরো ব্যাংকিং খাতে ব্যক্তিগত খাতের ঋণের মধ্যে হাউজিং ফাইন্যান্সের অংশ এখনো তুলনামূলক কম। অর্থাৎ বাজারে প্রবৃদ্ধির বিশাল সুযোগ রয়েছে। আমরা লক্ষ করছি, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, তরুণ চাকরিজীবী, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নিজস্ব ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। তবে বর্তমানে তারা আগের তুলনায় বেশি হিসাব-নিকাশ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। উচ্চ সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির কারণে হোম লোন বাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে? উত্তর : গত দুই বছরে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করেছে। পাশাপাশি নীতিগত সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বেড়েছে। এর ফলে মাসিক কিস্তি বেড়েছে, গ্রাহকের ঋণ গ্রহণক্ষমতা কিছুটা কমেছে এবং অনেকেই বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। অন্যদিকে আবাসন নির্মাণে ব্যবহৃত রড, সিমেন্ট, কাচ, সিরামিক ও বৈদ্যুতিক সামগ্রীর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে আমরা মনে করি, আবাসন একটি মৌলিক প্রয়োজন। তাই চাহিদা স্থায়ীভাবে কমে না; বরং অর্থনৈতিক পরিবেশ উন্নত হলে বাজার দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। আবাসন খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? উত্তর : রিয়েল এস্টেট খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ মাল্টিপ্লায়ার সেক্টর। রিহ্যাবের হিসাব অনুযায়ী এই খাতের সঙ্গে দুই শতাধিক শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। যেমন রড, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিক, গ্লাস, পেইন্ট, ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, ফার্নিচার, পরিবহন এবং প্রকৌশল ও নির্মাণসেবা। অর্থাৎ একটি হোম লোন কেবল একজন গ্রাহকের জন্য বাড়ি নির্মাণের অর্থায়ন নয়; এটি পুরো অর্থনীতিতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগকে গতিশীল করে। এই কারণে ব্যাংকগুলোর আবাসন অর্থায়ন দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। মধ্যবিত্ত ও প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে আগ্রহীদের জন্য ইউসিবির উদ্যোগ কী? উত্তর : বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে আগ্রহী গ্রাহকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইউসিবি নতুন ও পুরোনো ফ্ল্যাট কেনা, বাড়ি নির্মাণ, বাড়ি সম্প্রসারণ, সংস্কার সব ক্ষেত্রেই অর্থায়নের সুযোগ দিচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করে থাকি। দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা, প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার এবং স্বচ্ছ চার্জ কাঠামো আমাদের হোম লোনকে আরও গ্রাহকবান্ধব করেছে। আমাদের নীতি হলো কোনো হিডেন চার্জ নয়, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ব্যাংকিং। নারী, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং তরুণ পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ কী? উত্তর : বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৫-৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসে এবং এই অর্থের একটি বড় অংশ আবাসন খাতে বিনিয়োগ হয়। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইউসিবি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সহজ ডকুমেন্টেশন এবং নমনীয় প্রক্রিয়ায় হোম লোন সুবিধা প্রদান করে। একইভাবে কর্মজীবী নারী এবং তরুণ পেশাজীবীদের জন্য আয়-সামর্থ্যভিত্তিক অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যাতে তারা কর্মজীবনের শুরুতেই নিজের আবাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন। বর্তমান সুদের হার কাঠামো বাজারকে কতটা প্রভাবিত করছে? উত্তর : হোম লোন মূলত দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। ফলে সুদের হারের পরিবর্তন এই বাজারে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বর্তমানে কিছু গ্রাহক অপেক্ষার কৌশল গ্রহণ করলেও আমরা মনে করি এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ এবং আবাসনের ঘাটতি বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদে হোম লোন বাজারের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। আপনার ব্যাংকের হোম লোনের খেলাপি ঋণের হার কত? উত্তর : বর্তমানে আমাদের হোম লোন পোর্টফোলিওর খেলাপি ঋণের হার ৩.৬৫%, যা শিল্পের গড়ের তুলনায় সন্তোষজনক। এর প্রধান কারণ হলো শক্তিশালী ক্রেডিট অ্যাপ্রাইজাল, সম্পত্তির যথাযথ মূল্যায়ন, গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতার বিশ্লেষণ, নিয়মিত মনিটরিং এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার। আমরা সব সময় কোয়ালি গ্রোথ-এ বিশ্বাস করি। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার কতদূর এগিয়েছে? উত্তর : ইউসিবি ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে ডিজিটাল ডকুমেন্ট সাবমিশন, দ্রুত ক্রেডিট প্রসেসিং, অনলাইন স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং ও প্রযুক্তিনির্ভর অভ্যন্তরীণ অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ অনুমোদনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। আগামী দিনে আরও এআই-সমর্থিত ক্রেডিট মূল্যায়ন এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল হোম লোন জার্নি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ইউসিবির বিশেষ সুবিধা কী? উত্তর : বর্তমানে ইউসিবির হোম লোনে রয়েছে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা, প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার, দ্রুত অনুমোদন, পুরোনো ও নতুন ফ্ল্যাট উভয়ের জন্য অর্থায়ন, বাড়ি সংস্কারের জন্য ঋণ ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ চার্জ কাঠামো। প্রসেসিং ফি ও অন্যান্য চার্জে সুবিধা? উত্তর : বিশেষ ক্যাম্পেইনের সময় ইউসিবি প্রসেসিং ফিতে ছাড় দিয়ে থাকে। আমাদের নীতি হচ্ছে, গ্রাহক যেন শুরু থেকেই ঋণের মোট ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান। তাই কোনো গোপন চার্জ রাখা হয় না। আবাসন খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কী? উত্তর : বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জমির উচ্চ মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি। এ ছাড়া নগর পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলে। তবে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসন খাতের সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। রিয়েল এস্টেট খাতের স্থবিরতা কি হোম লোন ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে? উত্তর : রিয়েল এস্টেট ও হোম লোন পরস্পর নির্ভরশীল। আবাসন বাজারে লেনদেন কমে গেলে নতুন হোম লোনের চাহিদাও কিছুটা প্রভাবিত হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণের কারণে আবাসনের চাহিদা অব্যাহত থাকবে। তাই আমরা এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। সাশ্রয়ী আবাসন সম্প্রসারণে ব্যাংকগুলো কী ভূমিকা রাখতে পারে? উত্তর : সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের অর্থায়ন, প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার, নমনীয় কিস্তি এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ হাউজিং স্কিম চালু করা গেলে আরও বেশি মানুষ আবাসনের সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সম্প্রসারণ করা গেলে সাশ্রয়ী আবাসনের পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব। আগামী ৩-৫ বছরে হোম লোন ব্যবসা নিয়ে আপনার ব্যাংকের পরিকল্পনা কী? উত্তর : আগামী কয়েক বছরে আমরা হোম লোন পোর্টফোলিও আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছি। ডিজিটাল আবেদন ব্যবস্থা, দ্রুত অনুমোদন, উন্নত সেবা, তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উদ্ভাবনী পণ্য চালুর মাধ্যমে আমরা বাজারে আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাই। একই সঙ্গে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উচ্চমানের সম্পদ গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। গ্রাহকদের জন্য নতুন কোনো হোম ফাইন্যান্সিং পণ্য বা উদ্ভাবনী সেবা আনার পরিকল্পনা আছে কি? উত্তর : গ্রাহকের পরিবর্তিত চাহিদা বিবেচনায় আমরা নিয়মিত নতুন পণ্য ও সেবা নিয়ে কাজ করছি। ডিজিটাল আবেদন, দ্রুত প্রি-অ্যাপ্রুভাল, গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কাস্টমাইজড হোম ফাইন্যান্সিং এবং আরও নমনীয় পরিশোধ সুবিধা চালুর বিষয়গুলো আমরা বিবেচনা করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিনির্ভর, সহজ এবং গ্রাহকবান্ধব হোম ফাইন্যান্সিং অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে হোম লোনের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের কাছে আপনার কী সুপারিশ থাকবে? উত্তর : বাংলাদেশে মর্টগেজ বা হোম লোনের পরিমাণ এখনো জিডিপির তুলনায় খুবই কম, যেখানে উন্নত অর্থনীতিতে এর অনুপাত কয়েক গুণ বেশি। অর্থাৎ আমাদের সামনে বিশাল সম্ভাবনার বাজার রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা সম্প্রসারণ, নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক করা, প্রথমবারের আবাসন ক্রেতাদের জন্য কর-প্রণোদনা এবং স্থিতিশীল সুদের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে হোম লোন বাজার কয়েকগুণ সম্প্রসারণ হতে পারে। ইউসিবি সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রযুক্তিনির্ভর, গ্রাহককেন্দ্রিক ও টেকসই হোম ফাইন্যান্সিং মডেল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

ইউসিবি প্রযুক্তিনির্ভর, গ্রাহককেন্দ্রিক ও টেকসই হোম ফাইন্যান্সিং মডেল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে

Update Time : 02:11:14 am, Friday, 31 July 2026

বর্তমানে আপনার ব্যাংকের হোম লোন পোর্টফোলিওর আকার কত? গত এক বছরে প্রবৃদ্ধি কেমন ছিল? উত্তর : রিটেইল ব্যাংকিং ইউসিবির অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যবসা। এর মধ্যে হোম লোন একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। বর্তমানে আমাদের হোম লোন পোর্টফোলিও প্রায় ১১৮৪ কোটি টাকা (জুন ২০২৬ পর্যন্ত), যা গত এক বছরে প্রায় ৪% প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশে আবাসন অর্থায়নের বাজার এখনো মোট ব্যাংক ঋণের তুলনায় খুবই ছোট। ফলে এই খাতে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইউসিবি সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে গ্রাহকবান্ধব ঋণ কাঠামো, দ্রুত অনুমোদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং একটি মানসম্মত, টেকসই এবং কম ঝুঁকির হোম লোন পোর্টফোলিও গড়ে তোলা। দেশে হোম লোনের চাহিদা বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে? উত্তর : বাংলাদেশে নগরায়ণের হার দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করছে, যা আগামী দশকে আরও বাড়বে। একই সঙ্গে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ নতুন করে কর্মসংস্থানের কারণে শহরে আসছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পুরো ব্যাংকিং খাতে ব্যক্তিগত খাতের ঋণের মধ্যে হাউজিং ফাইন্যান্সের অংশ এখনো তুলনামূলক কম। অর্থাৎ বাজারে প্রবৃদ্ধির বিশাল সুযোগ রয়েছে। আমরা লক্ষ করছি, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, তরুণ চাকরিজীবী, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নিজস্ব ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। তবে বর্তমানে তারা আগের তুলনায় বেশি হিসাব-নিকাশ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। উচ্চ সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির কারণে হোম লোন বাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে? উত্তর : গত দুই বছরে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করেছে। পাশাপাশি নীতিগত সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বেড়েছে। এর ফলে মাসিক কিস্তি বেড়েছে, গ্রাহকের ঋণ গ্রহণক্ষমতা কিছুটা কমেছে এবং অনেকেই বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। অন্যদিকে আবাসন নির্মাণে ব্যবহৃত রড, সিমেন্ট, কাচ, সিরামিক ও বৈদ্যুতিক সামগ্রীর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে আমরা মনে করি, আবাসন একটি মৌলিক প্রয়োজন। তাই চাহিদা স্থায়ীভাবে কমে না; বরং অর্থনৈতিক পরিবেশ উন্নত হলে বাজার দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। আবাসন খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? উত্তর : রিয়েল এস্টেট খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ মাল্টিপ্লায়ার সেক্টর। রিহ্যাবের হিসাব অনুযায়ী এই খাতের সঙ্গে দুই শতাধিক শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। যেমন রড, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিক, গ্লাস, পেইন্ট, ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, ফার্নিচার, পরিবহন এবং প্রকৌশল ও নির্মাণসেবা। অর্থাৎ একটি হোম লোন কেবল একজন গ্রাহকের জন্য বাড়ি নির্মাণের অর্থায়ন নয়; এটি পুরো অর্থনীতিতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগকে গতিশীল করে। এই কারণে ব্যাংকগুলোর আবাসন অর্থায়ন দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। মধ্যবিত্ত ও প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে আগ্রহীদের জন্য ইউসিবির উদ্যোগ কী? উত্তর : বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে আগ্রহী গ্রাহকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইউসিবি নতুন ও পুরোনো ফ্ল্যাট কেনা, বাড়ি নির্মাণ, বাড়ি সম্প্রসারণ, সংস্কার সব ক্ষেত্রেই অর্থায়নের সুযোগ দিচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করে থাকি। দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা, প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার এবং স্বচ্ছ চার্জ কাঠামো আমাদের হোম লোনকে আরও গ্রাহকবান্ধব করেছে। আমাদের নীতি হলো কোনো হিডেন চার্জ নয়, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ব্যাংকিং। নারী, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং তরুণ পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ কী? উত্তর : বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৫-৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসে এবং এই অর্থের একটি বড় অংশ আবাসন খাতে বিনিয়োগ হয়। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইউসিবি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সহজ ডকুমেন্টেশন এবং নমনীয় প্রক্রিয়ায় হোম লোন সুবিধা প্রদান করে। একইভাবে কর্মজীবী নারী এবং তরুণ পেশাজীবীদের জন্য আয়-সামর্থ্যভিত্তিক অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যাতে তারা কর্মজীবনের শুরুতেই নিজের আবাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন। বর্তমান সুদের হার কাঠামো বাজারকে কতটা প্রভাবিত করছে? উত্তর : হোম লোন মূলত দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। ফলে সুদের হারের পরিবর্তন এই বাজারে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বর্তমানে কিছু গ্রাহক অপেক্ষার কৌশল গ্রহণ করলেও আমরা মনে করি এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ এবং আবাসনের ঘাটতি বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদে হোম লোন বাজারের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। আপনার ব্যাংকের হোম লোনের খেলাপি ঋণের হার কত? উত্তর : বর্তমানে আমাদের হোম লোন পোর্টফোলিওর খেলাপি ঋণের হার ৩.৬৫%, যা শিল্পের গড়ের তুলনায় সন্তোষজনক। এর প্রধান কারণ হলো শক্তিশালী ক্রেডিট অ্যাপ্রাইজাল, সম্পত্তির যথাযথ মূল্যায়ন, গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতার বিশ্লেষণ, নিয়মিত মনিটরিং এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার। আমরা সব সময় কোয়ালি গ্রোথ-এ বিশ্বাস করি। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার কতদূর এগিয়েছে? উত্তর : ইউসিবি ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে ডিজিটাল ডকুমেন্ট সাবমিশন, দ্রুত ক্রেডিট প্রসেসিং, অনলাইন স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং ও প্রযুক্তিনির্ভর অভ্যন্তরীণ অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ অনুমোদনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। আগামী দিনে আরও এআই-সমর্থিত ক্রেডিট মূল্যায়ন এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল হোম লোন জার্নি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ইউসিবির বিশেষ সুবিধা কী? উত্তর : বর্তমানে ইউসিবির হোম লোনে রয়েছে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা, প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার, দ্রুত অনুমোদন, পুরোনো ও নতুন ফ্ল্যাট উভয়ের জন্য অর্থায়ন, বাড়ি সংস্কারের জন্য ঋণ ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ চার্জ কাঠামো। প্রসেসিং ফি ও অন্যান্য চার্জে সুবিধা? উত্তর : বিশেষ ক্যাম্পেইনের সময় ইউসিবি প্রসেসিং ফিতে ছাড় দিয়ে থাকে। আমাদের নীতি হচ্ছে, গ্রাহক যেন শুরু থেকেই ঋণের মোট ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান। তাই কোনো গোপন চার্জ রাখা হয় না। আবাসন খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কী? উত্তর : বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জমির উচ্চ মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি। এ ছাড়া নগর পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলে। তবে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসন খাতের সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। রিয়েল এস্টেট খাতের স্থবিরতা কি হোম লোন ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে? উত্তর : রিয়েল এস্টেট ও হোম লোন পরস্পর নির্ভরশীল। আবাসন বাজারে লেনদেন কমে গেলে নতুন হোম লোনের চাহিদাও কিছুটা প্রভাবিত হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণের কারণে আবাসনের চাহিদা অব্যাহত থাকবে। তাই আমরা এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। সাশ্রয়ী আবাসন সম্প্রসারণে ব্যাংকগুলো কী ভূমিকা রাখতে পারে? উত্তর : সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের অর্থায়ন, প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার, নমনীয় কিস্তি এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ হাউজিং স্কিম চালু করা গেলে আরও বেশি মানুষ আবাসনের সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সম্প্রসারণ করা গেলে সাশ্রয়ী আবাসনের পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব। আগামী ৩-৫ বছরে হোম লোন ব্যবসা নিয়ে আপনার ব্যাংকের পরিকল্পনা কী? উত্তর : আগামী কয়েক বছরে আমরা হোম লোন পোর্টফোলিও আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছি। ডিজিটাল আবেদন ব্যবস্থা, দ্রুত অনুমোদন, উন্নত সেবা, তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উদ্ভাবনী পণ্য চালুর মাধ্যমে আমরা বাজারে আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাই। একই সঙ্গে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উচ্চমানের সম্পদ গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। গ্রাহকদের জন্য নতুন কোনো হোম ফাইন্যান্সিং পণ্য বা উদ্ভাবনী সেবা আনার পরিকল্পনা আছে কি? উত্তর : গ্রাহকের পরিবর্তিত চাহিদা বিবেচনায় আমরা নিয়মিত নতুন পণ্য ও সেবা নিয়ে কাজ করছি। ডিজিটাল আবেদন, দ্রুত প্রি-অ্যাপ্রুভাল, গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কাস্টমাইজড হোম ফাইন্যান্সিং এবং আরও নমনীয় পরিশোধ সুবিধা চালুর বিষয়গুলো আমরা বিবেচনা করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিনির্ভর, সহজ এবং গ্রাহকবান্ধব হোম ফাইন্যান্সিং অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে হোম লোনের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের কাছে আপনার কী সুপারিশ থাকবে? উত্তর : বাংলাদেশে মর্টগেজ বা হোম লোনের পরিমাণ এখনো জিডিপির তুলনায় খুবই কম, যেখানে উন্নত অর্থনীতিতে এর অনুপাত কয়েক গুণ বেশি। অর্থাৎ আমাদের সামনে বিশাল সম্ভাবনার বাজার রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা সম্প্রসারণ, নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক করা, প্রথমবারের আবাসন ক্রেতাদের জন্য কর-প্রণোদনা এবং স্থিতিশীল সুদের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে হোম লোন বাজার কয়েকগুণ সম্প্রসারণ হতে পারে। ইউসিবি সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রযুক্তিনির্ভর, গ্রাহককেন্দ্রিক ও টেকসই হোম ফাইন্যান্সিং মডেল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)