মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় গাজীপুরের কালীগঞ্জে প্রীতিলতা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রটি ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পৌরসভার দেওপাড়া এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় নির্মাণ করা হয় ২০১৮ সলে। ছয় তলা এ ভবনে ১২৪ জন কর্মজীবী নারীর আবাসন ও ২০ জন শিশুর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অধিক হারে সম্পৃক্ত করা এবং আশপাশের শিল্পকারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপদ ও অস্থায়ী আবাসন সুবিধা দেওয়াই ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে এই প্রীতিলতা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রটি এক অর্থে রাষ্ট্রের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। কারণ চোখ ধাঁধানো ঝকঝকে ছয় তলা ভবনটিতে স্বল্পমূল্যে থাকার সুবিধা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে বিপুল অর্থব্যয়ে নির্মিত হোস্টেলটির সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ কর্মজীবী নারী। তাই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কালীগঞ্জের শিল্পকারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের আবাসন সুবিধার কথা ভেবে ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে হোস্টেলটি নির্মাণ করে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর। ভবনটিতে ১২৪ জন নারীর আবাসনের পাশাপাশি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে ২০টি শিশু থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যবস্থাপনার জন্য ভবনটিতে ১৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের কথা। চার শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে থাকতে একজনের ব্যয় ৫০০ টাকা। তিন শয্যার কক্ষে ৭০০ টাকা এবং দুই শয্যার কক্ষে ৯০০ টাকা প্রদান করতে হয়। ১২৪ জনের আসন থাকলেও বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে থাকেন ৮০-৯০ জন। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রটি পুরোপুরিই বন্ধ। সরেজমিনে দেখা যায়, কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল ভবনের গেটে নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে ভবনের চারপাশে আবর্জনার স্তূপ। ঝুলছে মাকড়সার জাল। ওপরে ওঠানামার জন্য অত্যাধুনিক দুটি লিফট থাকলেও সেগুলো বিকল। নিচতলায় মাঝের ফাঁকা জায়গায় পড়ে আছে শিশুদের জন্য বেশকিছু প্লাস্টিকের খেলনা। অযত্ন-অবহেলায় ক্যান্টিনের চেয়ার-টেবিলে ধুলাবালির আস্তর। নষ্ট হচ্ছে মেঝেতে বিছানো দামি ম্যাট্রেস। স্থানীয়ারা জানান, ভবনটির আশপাশে তেমন কোনো শিল্পকারখানা নেই। তাই কর্মজীবী নারীদের এ আবাসনের বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই। তাছাড়া হোস্টেলের দিবাযত্ন কেন্দ্রে কর্মজীবী নারীদের সন্তানদের জন্য ২০টি আসন থাকলেও সেখানে কোনো শিশুকেই সেবা দেওয়া হয় না। তারা আরও জানান, ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা না থাকায় কেউ এখানে থাকতে চান না। হোস্টেলের সহকারী সুপার ফারহানা ফরিদ চিত্রা বলেন, জনবল সংকটের কারণে নারীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রাণ-আরএফএল কোম্পানি থেকে রাতে দুজন মহিলা প্রহরী নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। বাচ্চা প্রতিপালনের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার বন্ধ থাকায় কর্মচারীও নেই। বরাদ্দ না থাকায় কর্মচারীদের চার বছরের বেতন বকেয়া রয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে বেতন না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বিষয়গুলো ওপর মহলে জানানো হলেও নানা অজুহাতে তারা এড়িয়ে যান। চলতি বছরের জুনে আবাসিকে ছিলেন ৯০ জন নারী। ফলে ভাড়া আদায় হয় ৭৩ হাজার ৯০০ টাকা। এর আগে মে মাসে প্রায় ৮৬ হাজার ৯০০ টাকা ভাড়া ওঠে। বর্তমানে ১৬ জনের বিপরীতে চারজন কর্মচারী দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চলছে। প্রতিমাসে গড়ে ৫০-৬০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। জানুয়ারি থেকে বিদ্যুৎ বিলও বকেয়া। কোনো মেহমান এলে নিজেদের পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হয়। তাছাড়া অধিদপ্তরে গেলেও নিজেদের টাকা খরচ করতে হয়। রুম ও আশপাশ পরিষ্কারের সরঞ্জামাদি কিনতে হয় নিজেদের টাকায়। ভবনটি রেললাইনের পাশে। তাই প্রায়ই দুষ্কৃতকারীরা রেললাইন থেকে পাথর নিক্ষেপ করে জানালার কাচ ভেঙে ফেলেছে। এই ভয়েই অনেকে এখানে থাকতে চান না। প্রীতিলতা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর গাজীপুরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শিরিনা আক্তার বলেন, সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। হোস্টেলের অব্যবস্থাপনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবহিত রয়েছেন। সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের হোস্টেল শাখার সহকারী পরিচালক লুৎফুন নাহারের সঙ্গে। এ সময় মোবাইল ফোনে তিনি জানান, ‘প্রকল্পটির অব্যবস্থাপনার বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না।’ একই সঙ্গে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতেও অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। লুৎফুন নাহার বলেন, ‘এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পরিচালক (উপসচিব) বলতে পারবেন।’ এরপরই প্রতিবেদকের সব প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। এদিকে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মনির হোসেনের সরকারি ল্যান্ডফোনে একাধিকবার কল করেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। কথা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। ইতোপূর্বে আমি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছি। মহিলা হোস্টেলের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সভা করে একটি রেজুলেশন করেছি। স্থানীয় সংসদ সদস্যের আধাসরকারি পত্রের (ডিও) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হোস্টেলের অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানানো হবে।’
5:15 am, Thursday, 30 July 2026
শিরোনাম :
১৭ কোটি টাকার প্রীতিলতা মুখ থুবড়ে পড়েছে
-
MIT ERP
- Update Time : 04:06:39 am, Thursday, 30 July 2026
- 4
Tag :








