আজ বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
১৩ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৭১%

মানচিত্রে থেকেও অদৃশ্য বাংলাদেশের এক জনগোষ্ঠী

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:29:28 pm, Wednesday, 28 October 2026
  • 22

মানচিত্রে থেকেও অদৃশ্য বাংলাদেশের এক জনগোষ্ঠী

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

তারা এই বাংলাদেশেই বাস করেন। এ দেশের মাটিতেই ঘুমান। এ দেশেরই বাতাসে শ্বাস নেন। অথচ দেশের কোনো দাপ্তরিক কাগজে তাদের নাম নেই। ভোটার তালিকা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের হোল্ডিং নম্বর— সব খানেই তারা অনুপস্থিত।

এমনকি আধুনিক প্রযুক্তির গুগল ম্যাপ বা সরকারি স্যাটেলাইট ইমেজেও সচরাচর ধরা পড়ে না তাদের এই ক্ষণস্থায়ী জনপদ। নদীভাঙন, জলবায়ুর চরম বিপর্যয় আর পাহাড় এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তীব্র বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা গড়ে তুলেছে এক ‘অদৃশ্য বসতি’। যেখানে জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে কিংবা অপরাধের কোনো প্রশাসনিক রেকর্ড থাকে না।

যেখানে রাষ্ট্র নয়; বরং প্রকৃতির নিজস্ব নির্মম নিয়ম ও আদিম সালিশি ব্যবস্থাই শেষ কথা। মানচিত্রহীন এই মানুষগুলোর আকুতি কিন্তু খুব বড় নয়, তারা কোনো বিশেষ অনুদান বা ত্রাণ চায় না, তারা চায় একটু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। একটি স্থায়ী পরিচয়, যেন অন্তত তাদের সন্তানেরা দেশের মূলধারার স্কুলে পড়তে পারে এবং বুক ফুলিয়ে বলতে পারে, ‘আমরা এই দেশেরই বৈধ নাগরিক।

’ তবে সরকারি সূত্র বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশের সর্বত্র শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অধীনে দুর্গম এলাকায় ‘মোবাইল ক্যাম্প’ বা বিশেষ দল পাঠিয়ে নিবন্ধন করানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মানচিত্রের বাইরে থাকবে না কেউই।

কয়েক সপ্তাহ ধরে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র-ধরলার বুক চিরে জেগে ওঠা নতুন ধুধু চর, সুন্দরবনের দুবলার চরসংলগ্ন গহিন খাঁড়ির সাময়িক আস্তানা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অতি দুর্গম সীমান্ত এলাকার খোঁজখবর নিয়ে পাওয়া গেছে এমন অন্তত শতাধিক অনথিভুক্ত ভাসমান জনপদের সন্ধান। সরকারি জরিপ বা ম্যাপ তৈরি হতে দীর্ঘ আইনি ও কারিগরি সময় লেগে যাওয়ার সুযোগে, কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর আড়ালে থেকে যাচ্ছে এই বিশাল জনগোষ্ঠী।

কুড়িগ্রামের চিলমারী ও রৌমারী উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের নতুন জেগে ওঠা একটি ভূখণ্ডে (যা এখনো সরকারি মৌজা ম্যাপে ওঠেনি) কথা হয় ৩৫ বছর বয়সি জোবেদা খাতুনের সঙ্গে। ভাঙা গলায় তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘নদী হামাক তিনবার ভাসাইয়া দিছে বাহে। এই চরে আছছি দুই বছর হলো। এইখানে আমার ছোট চ্যাংড়াটার জন্ম হইছে, কিন্তু কোনো কাগজ জন্মসনদ নাই।

মেম্বার-চেয়ারম্যান কয়, ম্যাপে নাকি এই চরের কোনো নামই নাই। হামরা তো তাইলে বাতাসে ভাসতাছি। ’ একই চিত্র দেশের দক্ষিণের উপকূলে। সুন্দরবনের দুবলার চরের গহিনে অস্থায়ী ‘দোনা’ বা জেলে বসতির বাসিন্দা রহমত আলী (৪৮) জানান অন্য এক অন্ধকার বাস্তবতার কথা। তিনি বলেন, ‘এখানে কেউ সাপের কামড়ে বা অসুখে মারা গেলে বনের এক কোনায় মাটি দেওয়া হয়।

থানা পুলিশ বা ইউপি চেয়ারম্যান কেউ জানেও না যে এখানে একটা মানুষ বেঁচে ছিল, আর এখন সে নাই। ’ এই মানুষদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডেথ সার্টিফিকেট বা মৃত্যুর আইনি খতিয়ান রাখার সুযোগ নেই।

প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক রেকর্ড না থাকায় এই জনপদগুলো অপরাধীদের জন্য স্বর্গরাজ্য বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে; বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের অতি দুর্গম (যেমন সাজেক বা বড়থলি ইউনিয়নের সীমান্তসংলগ্ন) ম্যাপহীন পাহাড়ি ঢালে কোনো অপরাধ বা সংঘর্ষ ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কারণ ডিজিটাল বা অ্যানালগ— কোনো মানচিত্রেই এই জায়গার সুনির্দিষ্ট জিপিএস কো-অর্ডিনেট বা যাতায়াতের রাস্তার চিহ্ন নেই। ফলে এই বসতিগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চুরি বা পারিবারিক অপরাধের মীমাংসা হয় তাদের নিজস্ব ‘মাতবর’ বা স্থানীয় প্রধানদের সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা অনেক সময় দেশের প্রচলিত আইনের চেয়েও অন্ধকার ও মানবাধিকার পরিপন্থী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শাহনেওয়াজ এই সংকটকে নাগরিকত্বের চরম অবমাননা হিসেবে দেখছেন। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি মূলত প্রশাসনিক ও জরিপ ব্যবস্থার একটি বড় কাঠামোগত ফাঁক। একটি নতুন চর বা দুর্গম সীমান্ত এলাকায় যখন মানুষ বাধ্য হয়ে বসতি স্থাপন করে, তখন তাৎক্ষণিক সেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি ও তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে তারা শোষণের শিকার হন।

পরিচয়হীন এই বিশাল জনগোষ্ঠী মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যা এই ‘অদৃশ্য’ মানচিত্রহীন জনপদগুলোর আকারকে আরও দ্রুত বড় করছে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা আছে। নদীতে নতুন চর জাগলে বা দুর্গম সীমান্ত এলাকায় নতুন কোনো সাময়িক বসতি গড়ে উঠলে তা মৌজা ম্যাপে অন্তর্ভুক্ত করতে আমাদের আইনি ও জরিপ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

দিয়ারা জরিপ সম্পন্ন করতে কিছুটা কারিগরি সময় লাগে। তবে ভূমি সেবার আধুনিকায়নে পাইলট প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। দেশের ছয় জেলার ৩৪টি উপজেলায় ইতোমধ্যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিপ ও রেকর্ড হালনাগাদের কাজ চলছে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুততম সময়ে এই নতুন ভূমি এবং সেখানে বসবাসকারী প্রান্তিক মানুষদের সরকারি ডিজিটাল রেকর্ডের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।

’ কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, চরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষদের মৌলিক অধিকার ও মানবিক সহায়তার বিষয়ে জেলা প্রশাসন অত্যন্ত সংবেদনশীল। যে সব চরের মানুষ ভৌগোলিক জটিলতার কারণে এখনো মূল ভোটার তালিকায় বা সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি, দ্রুত অস্থায়ী তালিকা তৈরি করে তাদের নাগরিক সুবিধার আওতায় আনতে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্র কোনো নাগরিককেই আইনি কাঠামোর বাইরে রাখতে চায় না। সরকারি সূত্রমতে, বাংলাদেশে ভৌগোলিক দুর্গমতা বা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন বঞ্চিত ‘অদৃশ্য’ বা নথির বাইরে থাকা মানুষের সুনির্দিষ্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সংখ্যা সরকারিভাবে নিরূপণ করা হয়নি।

তবে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংস্থা ও এনজিওর তথ্যমতে এবং তাদের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের চরাঞ্চল, অতি দুর্গম পার্বত্য এলাকা এবং প্রান্তিক সীমান্তরেখায় এখনো প্রায় দুই লাখ মানুষ নাগরিক সুবিধার বাইরে বা একপ্রকার ‘প্রশাসনিকভাবে অদৃশ্য’ অবস্থায় জীবনযাপন করছে। ২০১৫ সালে ছিটমহল বিনিময়ের পর স্থলসীমান্তের একটি বড় জটিলতা কাটলেও নদীমাতৃক ভৌগোলিক পরিবর্তন ও পাহাড়ের দুর্গমতার কারণে এই ‘ম্যাপহীনতা’ বা নাগরিকত্বহীনতার সংকট রয়েই গেছে।

রংপুরের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার বুকে প্রতি বছর নতুন নতুন চর জেগে ওঠে এবং পুরোনো চর বিলীন হয়। মৌসুমি এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে অনেক চরের প্রশাসনিক ম্যাপ বা মৌজা নম্বর সময়মতো হালনাগাদ হয় না। ফলে স্থায়ী ঠিকানার অভাবে এখানকার বাসিন্দারা জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে চরম জটিলতায় পড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অতি দুর্গম সীমান্ত রাঙামাটির বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়ন কিংবা সাজেকের সীমান্তসংলগ্ন প্রত্যন্ত পাহাড়ি ঢালগুলো ভূখণ্ডগতভাবে বাংলাদেশের অংশ হলেও মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

সড়ক যোগাযোগহীনতা, মোবাইল নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিজিটাল জরিপের বাইরে থেকে যাওয়ায় এখানকার অনেক মানুষ ম্যাপ ও সরকারি নথির বাইরে রয়ে গেছে। আইনগতভাবে তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাসিন্দা হলেও মূলত প্রশাসনিক এবং লজিস্টিক জটিলতার কারণে তারা এনআইডি ও পাসপোর্টসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পায় না। জন্মনিবন্ধন বা ভোটার তালিকায় নাম তুলতে হলে হোল্ডিং নম্বর বা জমির খতিয়ান দেখাতে হয়, যা মানচিত্রহীন চর বা নতুন পাহাড়ি বসতিতে থাকে না।

বর্তমানে জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি শতভাগ অনলাইন ও ডিজিটাল হওয়ায়, চিলমারীর ভাসমান চর কিংবা বড়থলির মতো নেটওয়ার্কহীন এলাকার মানুষ সাধারণ আবেদনটুকুও করতে পারে না। তবে নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, অতি দুর্গম, চর কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানার জটিলতা শিথিল করে বিশেষ ব্যবস্থায় জন্মনিবন্ধন ও ভোটার করার নির্দেশনা রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে পাঁচ লাখ ১০ হাজার ইয়াবাসহ দুই কারবারি আটক

মানচিত্রে থেকেও অদৃশ্য বাংলাদেশের এক জনগোষ্ঠী

Update Time : 10:29:28 pm, Wednesday, 28 October 2026

তারা এই বাংলাদেশেই বাস করেন। এ দেশের মাটিতেই ঘুমান। এ দেশেরই বাতাসে শ্বাস নেন। অথচ দেশের কোনো দাপ্তরিক কাগজে তাদের নাম নেই। ভোটার তালিকা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের হোল্ডিং নম্বর— সব খানেই তারা অনুপস্থিত।

এমনকি আধুনিক প্রযুক্তির গুগল ম্যাপ বা সরকারি স্যাটেলাইট ইমেজেও সচরাচর ধরা পড়ে না তাদের এই ক্ষণস্থায়ী জনপদ। নদীভাঙন, জলবায়ুর চরম বিপর্যয় আর পাহাড় এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তীব্র বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা গড়ে তুলেছে এক ‘অদৃশ্য বসতি’। যেখানে জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে কিংবা অপরাধের কোনো প্রশাসনিক রেকর্ড থাকে না।

যেখানে রাষ্ট্র নয়; বরং প্রকৃতির নিজস্ব নির্মম নিয়ম ও আদিম সালিশি ব্যবস্থাই শেষ কথা। মানচিত্রহীন এই মানুষগুলোর আকুতি কিন্তু খুব বড় নয়, তারা কোনো বিশেষ অনুদান বা ত্রাণ চায় না, তারা চায় একটু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। একটি স্থায়ী পরিচয়, যেন অন্তত তাদের সন্তানেরা দেশের মূলধারার স্কুলে পড়তে পারে এবং বুক ফুলিয়ে বলতে পারে, ‘আমরা এই দেশেরই বৈধ নাগরিক।

’ তবে সরকারি সূত্র বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশের সর্বত্র শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অধীনে দুর্গম এলাকায় ‘মোবাইল ক্যাম্প’ বা বিশেষ দল পাঠিয়ে নিবন্ধন করানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মানচিত্রের বাইরে থাকবে না কেউই।

কয়েক সপ্তাহ ধরে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র-ধরলার বুক চিরে জেগে ওঠা নতুন ধুধু চর, সুন্দরবনের দুবলার চরসংলগ্ন গহিন খাঁড়ির সাময়িক আস্তানা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অতি দুর্গম সীমান্ত এলাকার খোঁজখবর নিয়ে পাওয়া গেছে এমন অন্তত শতাধিক অনথিভুক্ত ভাসমান জনপদের সন্ধান। সরকারি জরিপ বা ম্যাপ তৈরি হতে দীর্ঘ আইনি ও কারিগরি সময় লেগে যাওয়ার সুযোগে, কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর আড়ালে থেকে যাচ্ছে এই বিশাল জনগোষ্ঠী।

কুড়িগ্রামের চিলমারী ও রৌমারী উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের নতুন জেগে ওঠা একটি ভূখণ্ডে (যা এখনো সরকারি মৌজা ম্যাপে ওঠেনি) কথা হয় ৩৫ বছর বয়সি জোবেদা খাতুনের সঙ্গে। ভাঙা গলায় তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘নদী হামাক তিনবার ভাসাইয়া দিছে বাহে। এই চরে আছছি দুই বছর হলো। এইখানে আমার ছোট চ্যাংড়াটার জন্ম হইছে, কিন্তু কোনো কাগজ জন্মসনদ নাই।

মেম্বার-চেয়ারম্যান কয়, ম্যাপে নাকি এই চরের কোনো নামই নাই। হামরা তো তাইলে বাতাসে ভাসতাছি। ’ একই চিত্র দেশের দক্ষিণের উপকূলে। সুন্দরবনের দুবলার চরের গহিনে অস্থায়ী ‘দোনা’ বা জেলে বসতির বাসিন্দা রহমত আলী (৪৮) জানান অন্য এক অন্ধকার বাস্তবতার কথা। তিনি বলেন, ‘এখানে কেউ সাপের কামড়ে বা অসুখে মারা গেলে বনের এক কোনায় মাটি দেওয়া হয়।

থানা পুলিশ বা ইউপি চেয়ারম্যান কেউ জানেও না যে এখানে একটা মানুষ বেঁচে ছিল, আর এখন সে নাই। ’ এই মানুষদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডেথ সার্টিফিকেট বা মৃত্যুর আইনি খতিয়ান রাখার সুযোগ নেই।

প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক রেকর্ড না থাকায় এই জনপদগুলো অপরাধীদের জন্য স্বর্গরাজ্য বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে; বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের অতি দুর্গম (যেমন সাজেক বা বড়থলি ইউনিয়নের সীমান্তসংলগ্ন) ম্যাপহীন পাহাড়ি ঢালে কোনো অপরাধ বা সংঘর্ষ ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কারণ ডিজিটাল বা অ্যানালগ— কোনো মানচিত্রেই এই জায়গার সুনির্দিষ্ট জিপিএস কো-অর্ডিনেট বা যাতায়াতের রাস্তার চিহ্ন নেই। ফলে এই বসতিগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চুরি বা পারিবারিক অপরাধের মীমাংসা হয় তাদের নিজস্ব ‘মাতবর’ বা স্থানীয় প্রধানদের সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা অনেক সময় দেশের প্রচলিত আইনের চেয়েও অন্ধকার ও মানবাধিকার পরিপন্থী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শাহনেওয়াজ এই সংকটকে নাগরিকত্বের চরম অবমাননা হিসেবে দেখছেন। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি মূলত প্রশাসনিক ও জরিপ ব্যবস্থার একটি বড় কাঠামোগত ফাঁক। একটি নতুন চর বা দুর্গম সীমান্ত এলাকায় যখন মানুষ বাধ্য হয়ে বসতি স্থাপন করে, তখন তাৎক্ষণিক সেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি ও তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে তারা শোষণের শিকার হন।

পরিচয়হীন এই বিশাল জনগোষ্ঠী মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যা এই ‘অদৃশ্য’ মানচিত্রহীন জনপদগুলোর আকারকে আরও দ্রুত বড় করছে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা আছে। নদীতে নতুন চর জাগলে বা দুর্গম সীমান্ত এলাকায় নতুন কোনো সাময়িক বসতি গড়ে উঠলে তা মৌজা ম্যাপে অন্তর্ভুক্ত করতে আমাদের আইনি ও জরিপ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

দিয়ারা জরিপ সম্পন্ন করতে কিছুটা কারিগরি সময় লাগে। তবে ভূমি সেবার আধুনিকায়নে পাইলট প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। দেশের ছয় জেলার ৩৪টি উপজেলায় ইতোমধ্যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিপ ও রেকর্ড হালনাগাদের কাজ চলছে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুততম সময়ে এই নতুন ভূমি এবং সেখানে বসবাসকারী প্রান্তিক মানুষদের সরকারি ডিজিটাল রেকর্ডের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।

’ কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, চরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষদের মৌলিক অধিকার ও মানবিক সহায়তার বিষয়ে জেলা প্রশাসন অত্যন্ত সংবেদনশীল। যে সব চরের মানুষ ভৌগোলিক জটিলতার কারণে এখনো মূল ভোটার তালিকায় বা সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি, দ্রুত অস্থায়ী তালিকা তৈরি করে তাদের নাগরিক সুবিধার আওতায় আনতে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্র কোনো নাগরিককেই আইনি কাঠামোর বাইরে রাখতে চায় না। সরকারি সূত্রমতে, বাংলাদেশে ভৌগোলিক দুর্গমতা বা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন বঞ্চিত ‘অদৃশ্য’ বা নথির বাইরে থাকা মানুষের সুনির্দিষ্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সংখ্যা সরকারিভাবে নিরূপণ করা হয়নি।

তবে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংস্থা ও এনজিওর তথ্যমতে এবং তাদের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের চরাঞ্চল, অতি দুর্গম পার্বত্য এলাকা এবং প্রান্তিক সীমান্তরেখায় এখনো প্রায় দুই লাখ মানুষ নাগরিক সুবিধার বাইরে বা একপ্রকার ‘প্রশাসনিকভাবে অদৃশ্য’ অবস্থায় জীবনযাপন করছে। ২০১৫ সালে ছিটমহল বিনিময়ের পর স্থলসীমান্তের একটি বড় জটিলতা কাটলেও নদীমাতৃক ভৌগোলিক পরিবর্তন ও পাহাড়ের দুর্গমতার কারণে এই ‘ম্যাপহীনতা’ বা নাগরিকত্বহীনতার সংকট রয়েই গেছে।

রংপুরের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার বুকে প্রতি বছর নতুন নতুন চর জেগে ওঠে এবং পুরোনো চর বিলীন হয়। মৌসুমি এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে অনেক চরের প্রশাসনিক ম্যাপ বা মৌজা নম্বর সময়মতো হালনাগাদ হয় না। ফলে স্থায়ী ঠিকানার অভাবে এখানকার বাসিন্দারা জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে চরম জটিলতায় পড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অতি দুর্গম সীমান্ত রাঙামাটির বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়ন কিংবা সাজেকের সীমান্তসংলগ্ন প্রত্যন্ত পাহাড়ি ঢালগুলো ভূখণ্ডগতভাবে বাংলাদেশের অংশ হলেও মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

সড়ক যোগাযোগহীনতা, মোবাইল নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিজিটাল জরিপের বাইরে থেকে যাওয়ায় এখানকার অনেক মানুষ ম্যাপ ও সরকারি নথির বাইরে রয়ে গেছে। আইনগতভাবে তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাসিন্দা হলেও মূলত প্রশাসনিক এবং লজিস্টিক জটিলতার কারণে তারা এনআইডি ও পাসপোর্টসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পায় না। জন্মনিবন্ধন বা ভোটার তালিকায় নাম তুলতে হলে হোল্ডিং নম্বর বা জমির খতিয়ান দেখাতে হয়, যা মানচিত্রহীন চর বা নতুন পাহাড়ি বসতিতে থাকে না।

বর্তমানে জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি শতভাগ অনলাইন ও ডিজিটাল হওয়ায়, চিলমারীর ভাসমান চর কিংবা বড়থলির মতো নেটওয়ার্কহীন এলাকার মানুষ সাধারণ আবেদনটুকুও করতে পারে না। তবে নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, অতি দুর্গম, চর কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানার জটিলতা শিথিল করে বিশেষ ব্যবস্থায় জন্মনিবন্ধন ও ভোটার করার নির্দেশনা রয়েছে।