যশোরের চৌগাছায় সারের ডিলারশিপ বাগাতে অন্যের স্বাক্ষর জাল করে ভাড়া চুক্তিপত্র জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলুর বিরুদ্ধে। কাগজপত্র অনুযায়ী ‘আমেনা ট্রেডার্স’ নামে যে প্রতিষ্ঠানকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, তার স্বত্বাধিকারী আমেনা খাতুন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির নেপথ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ডাবলু। ডিলারশিপের আবেদনে গুদাম হিসেবে দেখানো দোকানঘরটি প্রায় আট বছর ধরে ‘চাঁদের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি’ নামে একটি এনজিওর ভাড়ায় রয়েছে। ভবনমালিকের দাবি, ডাবলুর সঙ্গে তাঁর কোনো ভাড়া চুক্তি হয়নি। অথচ আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া চুক্তিপত্রে তাঁর স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে।
এ ঘটনায় ডিলারশিপের যোগ্যতা যাচাই ও সুপারিশ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, নারায়ণপুর ইউনিয়নের ফাঁসতলা বাজারে জহুরুল ইসলামের দোতলা ভবনের নিচতলায় ছোট-বড় সাতটি দোকানঘর রয়েছে। সবকটি দোকান ভাড়া দেওয়া। ভবনের দোতলায় সপরিবারে থাকেন জহুরুল। পেছনে রয়েছে ১০ কাঠা জমিতে ড্রাগন ফলের বাগান।
ডিলারশিপের আবেদনে গুদাম হিসেবে দেখানো দোকানটিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালাচ্ছে চাঁদের আলো এনজিও। ভবনমালিক জহুরুল ইসলামের দাবি, তিনি ডাবলুর কাছে কোনো দোকান ভাড়া দেননি এবং তাঁর সঙ্গে কোনো চুক্তিও করেননি। ডিলারশিপের আবেদনে তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত যে ভাড়া চুক্তিপত্র দেখানো হয়েছে, সেটির স্বাক্ষরও তাঁর নয়। জহুরুল বলেন, ‘তিনি আমার যে স্বাক্ষর দেখিয়েছেন, সেটি ঠিক না।
’ অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে করা চুক্তিপত্র দেখিয়ে জহুরুল দাবি করেন, ডিলারশিপের কাগজে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে তাঁর প্রকৃত স্বাক্ষরের মিল নেই। তাঁর আরও অভিযোগ, তাঁকে না জানিয়েই একবার একটি নাশকতা মামলায় ডাবলু তাঁকে এক নম্বর সাক্ষী করেছিলেন। চাঁদের আলো এনজিওর সম্পাদক সাবিনা খাতুন জানান, জহুরুলের বাবার সঙ্গে তাঁদের দোকান ভাড়ার চুক্তি হয়েছিল।
প্রায় আট বছর ধরে সেখানে এনজিওর কার্যক্রম চলছে। এখনো দোকানঘরটি তাঁদের ভাড়ায় রয়েছে। ফাঁসতলা বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক তৈয়ব আলী বলেন, বাজারে কোনো দোকান ভাড়ার চুক্তি হলে মালিক তাঁকে বিষয়টি জানান। কিন্তু ডাবলুর সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে জহুরুল তাঁকে কিছু বলেননি। ডিলারশিপের আবেদনে জমা দেওয়া কাগজের স্বাক্ষরের সঙ্গেও জহুরুলের স্বাক্ষরের মিল নেই বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, বাজারে ডাবলুর কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নারায়ণপুর ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছিলেন ১৯ জন। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন এবং নিজস্ব কিংবা ভাড়া নেওয়া গুদাম রয়েছে। এরপরও দোকান বা ব্যাবসায়িক অভিজ্ঞতা নেই—এমন ব্যক্তির নামে থাকা প্রতিষ্ঠান কীভাবে ডিলারশিপ পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, বাজারের দুটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ডিলারশিপ পাওয়ার শর্ত পূরণ করলেও তারা তা পায়নি। অভিযোগ অস্বীকার করে তরিকুল ইসলাম ডাবলু বলেন, জহুরুল একসময় তাঁর সঙ্গে রাজনীতি করতেন। পরে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। জহুরুল সুদের কারবার করেন এবং তাঁর কারণে অনেকে নিঃস্ব হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন ডাবলু।
তাঁর দাবি, জহুরুল প্রথমে এক লাখ টাকা জামানত চেয়েছিলেন। পরে তিন লাখ টাকা দাবি করায় তিনি দোকানটি নেননি। অন্যদিকে, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা উৎকোচ নিয়ে বাজারে দোকান বা গুদাম না থাকা সত্ত্বেও আমেনা ট্রেডার্সকে ডিলারশিপ দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। এ ঘটনায় নারায়ণপুর ইউনিয়নের ব্লক সুপারভাইজার আবু সাঈদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।
আবু সাঈদ বলেন, তথ্য যাচাইয়ের সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাসহ কয়েকজন গিয়েছিলেন। স্থানীয় ব্লক সুপারভাইজর হিসেবে তাঁকে ডাকা হয়েছিল। এ বিষয়ে তাঁর কিছু বলার নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাব্বির হোসাইন বলেন, যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ডিলারশিপ দেওয়ার এখতিয়ার তাঁদের নেই। কমিটির প্রধান ছিলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহা. আনোয়ারুল করিম বলেন, শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক পাওয়া গেছে। তদন্তের সময় কেউ অভিযোগ করেননি। তবে জাল স্বাক্ষর ও গুদাম না থাকার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ‘আচ্ছা’ বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। চৌগাছার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, আবেদনকারীদের তথ্য দুই দফায় যাচাই করা হয়েছে।
কমিটির সদস্যরা বাজারে গিয়ে দোকানঘরের মাপ নেওয়ার সময় দোকানমালিক অভিযোগ করেননি। চাহিদা অনুযায়ী কাগজপত্র ঠিক আছে কি না, তা দেখা হয়েছে। যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।






















