আজ সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
৩ কার্তিক, ১৪৩৩ | ০৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৪°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

দর্শক টানতে ব্যর্থ দুর্গাপূজার তিন সিনেমা, শোয়ে দর্শক খরা

  • MIT ERP
  • Update Time : 04:54:01 am, Monday, 19 October 2026
  • 17

দর্শক টানতে ব্যর্থ দুর্গাপূজার তিন সিনেমা, শোয়ে দর্শক খরা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গত ১৬ অক্টোবর সারা দেশে মুক্তি পেয়েছে তিনটি সিনেমা—‘স্নেহের বন্ধন’, ‘কাট-পিস’ ও ‘চিরকুট’। তবে মুক্তির প্রথম দিন থেকেই দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টানতে রীতিমতো ব্যর্থ হয়েছে সিনেমাগুলো।

উৎসবের দিনগুলোয় যেখানে সিনেমা হলে দর্শকের উপচে পড়া ভিড় থাকার কথা, সেখানে হলের টিকিট কাউন্টারগুলো পার করছে অলস সময়। আর এই তিন সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সিনেমা ‘স্নেহের বন্ধন’, যেখানে দর্শকখরা চরমে। এই সিনেমার ৩৭ টিকিটের ৩৫টিই কেনেন সিনেমার প্রযোজক-নায়ক, দর্শক দুটি মাত্র টিকিট কেনেন! পূজার আবহে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের গল্প নিয়ে হাজির হয়েছিলেন নির্মাতারা।

পোশাকশিল্পের অন্ধকার জগৎ নিয়ে ইফফাত জাহান মমর ‘কাট-পিস’, নব্বই দশকের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্য ঘটনা ও ক্যাম্পাসের নস্টালজিয়া নিয়ে মুনতাসির আকিবের ‘চিরকুট’ এবং জয় চৌধুরী ও মৌ খান জুটির পারিবারিক মেলোড্রামা ‘স্নেহের বন্ধন’ মুক্তি পায়। কিন্তু মুক্তির প্রথম তিন দিন কোনো সিনেমাই কাক্সিক্ষত দর্শকখরা কাটাতে পারেনি।

হল মালিকদের মতে, পূজার ছুটির মধ্যেও দর্শক উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কম। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা কামরুজ্জামান পরিচালিত ‘স্নেহের বন্ধন’ সিনেমার। ১৪টি হলে সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে। বাণিজ্যিক ঘরানার জয় চৌধুরী ও মৌ খানকে নিয়ে নির্মিত এই সিনেমা মুক্তির আগে রাজধানীর বুকে ছাদখোলা বাসে করে বেশ প্রচার-প্রচারণাও চালানো হয়েছিল।

কিন্তু হল খোলার পর দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে শুরু করে মাল্টিপ্লেক্সÑ সবখানেই এই সিনেমার শোগুলো ফাঁকা যাচ্ছে। দাওয়াত দিয়ে দর্শক পাচ্ছে না সিনেমাটির নায়ক! তার আগের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোও সুপারফ্লপ। মুক্তির প্রথম দিন বরিশাল অভিরুচি সিনেমা হলে দুপুরের শোতে ‘স্নেহের বন্ধন’ দেখতে গিয়েছিলেন ছয়জন দর্শক!

সন্ধ্যার শোতে দর্শক ছিল মাত্র ৯ জন। শনিবার ১২টার শোতে চারজন এবং বিকেলে শোতে দুটি টিকিট বিক্রি হয়। তবে নাইট ও স্পেশাল শো দর্শকখরায় বন্ধ ছিল বলে হলটির ম্যানেজার কবির রূপালী বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই চিত্র বলে জানায় হল কর্তৃপক্ষ। ম্যানেজার কবির বলেন, ‘এখন আসলে কেউ সিনেমা দেখতে চায় না। শুক্রবার সারা দিনে ২০ জনের মতো দর্শক হয়েছিল, কিন্তু সন্ধ্যায় দর্শক না থাকায় শো বন্ধ ছিল।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা। যদিও এখন বরিশালে খুব একটা সিনেমা চলে না। ভালো গল্প হলে একটু দর্শক পাওয়া যায়। আর এই সিনেমার মান নিয়েও অনেকেই সমালোচনা করছেন। বরিশালের সেল খারাপ। দর্শক এলে শো চলে, না হলে বন্ধ থাকে। ’ গতকাল বরিশাল অভিরুচি হলের ম্যানেজারের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন ৩টা বেজে ৪০ মিনিট। শোয়ের নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একজন দর্শকও পাওয়া যায়নি।

লায়ন সিনেমাসে শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে ‘কাট-পিস’ও ‘স্নেহের বন্ধন’। তবে সিনেমা দুটির মান নিয়ে বিরক্ত হলটির কর্ণধার মির্জা আব্দুল খালেক। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি আসলে এখনকার সিনেমা নিয়ে কথা বলতে চাই না। কী বলব, এগুলো কি সিনেমা? এগুলো টাকা খরচ করে মানুষ কেন দেখবে? একটি সিনেমা দেখতে গেলে কমপক্ষে ৫০০ টাকা খরচ আছে।

সিনেমা দেখে সেই টাকাই যদি উশুল না হয়, তাহলে দর্শক কেন সিনেমা দেখবে। ’ সিনেমা দুটি নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দিন “স্নেহের বন্ধন” দেখেছিল ৩৭ জন দর্শক। এর মধ্যে ৩৫টি টিকিট কিনেছেন সিনেমাটির প্রচারণায় আসা প্রযোজক, পরিচালক, নায়ক-নায়িকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা; অর্থাৎ সাধারণ দর্শক টিকিট কিনেছেন মাত্র দুজন।

অন্যদিকে, একই দিনে “কাটপিস” সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র আটটি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা। আমরা আসলে সিনেমা নামিয়ে দিই না। দর্শক না এলে শো বন্ধ থাকে। ’ গাজীপুরের উল্কা সিনেমা হলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘পূজায় যেভাবে দর্শক থাকার কথা, সে রকম নেই।

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন প্রায় ২০ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছিল। তৃতীয় দিনে দর্শকসংখ্যা কমেছে। তবুও আমরা বাংলা সিনেমা নিয়ে আশাবাদী। ’ সিনেমা হলের কর্মকর্তারা জানান, অনেক শো-তে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র দর্শক দেখছেন, যা দিয়ে সিনেমা হলের ন্যূনতম খরচ ওঠানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সনাতন ধাঁচের পারিবারিক গল্প ও দুর্বল নির্মাণশৈলীই দর্শকদের হলবিমুখ করার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা।

ঝুট ব্যবসার অপরাধ জগতের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘কাট-পিস’ মিরপুর সনি সিনেমা হলসহ ২৩টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও আশানুরূপ সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্যদিকে, শ্যামল মাওলা ও আজিজুন মিম অভিনীত ‘চিরকুট’ সিনেমাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নস্টালজিয়া নিয়ে তৈরি হওয়ায় তরুণদের মাঝে কিছুটা আগ্রহ তৈরি করলেও তা টিকিট বিক্রির অঙ্কে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, ঈদ ছাড়া অন্য উৎসবে বড় পরিসরে সিনেমা মুক্তি দেওয়ার সাহস ঢালিউডে কম দেখা যায়। এবার পূজাকে কেন্দ্র করে সেই চেষ্টা করা হলেও সিনেমার দুর্বল কনটেন্ট, আধুনিক মেকিংয়ের অভাব এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তনের কারণে সিনেমাগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। দর্শক এখন হলের পর্দায় লার্জার-দ্যান-লাইফ ভিজ্যুয়াল অথবা অত্যন্ত শক্তিশালী গল্প দেখতে চান।

সেই জায়গায় এই তিন সিনেমা প্রথাগত ফর্মুলা থেকে বের হতে না পারায় উৎসবের আমেজেও দর্শক টানতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। পূজার ছুটির বাকি দিনগুলোয় এই মন্দা কাটিয়ে সিনেমাগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখন বড়সড় সংশয় তৈরি হয়েছে। বন্ধ হচ্ছে ‘উল্কা’ সিনেমা হল সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে প্রজেক্টরের তীব্র আলো যখন সাদা পর্দায় আছড়ে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক অন্য রকম মায়াজাল।

সেই মায়াজালে বুঁদ হয়ে দশকের পর দশক মেতে থাকত সাধারণ মানুষ। কিন্তু প্রযুক্তির আগ্রাসন, মানসম্মত সিনেমার অভাব আর ক্রমাগত লোকসানের ধাক্কায় সেই জৌলুশ এখন অতীত। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে গাজীপুরের অন্যতম পরিচিত বিনোদন কেন্দ্র ‘উল্কা’ সিনেমা হল। আগামী নভেম্বর মাস থেকে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই হলের রুপালি পর্দা।

উল্কা সিনেমা হলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ধুঁকে ধুঁকে হলটি চলছে। ক্রমেই লোকসান হচ্ছে। এখনকার সিনেমা চালিয়ে বিদ্যুৎ বিলের টাকাও উঠছে না। ভালো গল্পের সিনেমা ও পরিচিত নায়ক-নায়িকা হলে ভালো চলে। যেমন সর্বশেষ শাকিব খানের সিনেমা এবং আরিফিন শুভ ও মিম অভিনীত ‘মালিক’ চালিয়ে আমরা অভাবনীয় ব্যবসা করেছিলাম।

এরপর সারা বছর ব্যবসা নেই। দুই ঈদে সিনেমা চালিয়ে হল টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যে কারণে নভেম্বর থেকে আমরা হলটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। লোকসান তো আছেই, এর মধ্যে আবার ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। সবকিছু মিলিয়ে সহনশীল পর্যায়ে নেই। আর কত লোকসান দেব? তাই বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ’ হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান সময়ে সিনেমা হলে দর্শক সমাগম একেবারেই শূন্যের কোঠায়।

হাতেগোনা কয়েকজন দর্শক নিয়ে শো চালাতে গিয়ে হলের কর্মীদের বেতন তো দূরের কথা, দৈনিক ও মাসিক বিদ্যুৎ বিলের টাকাও উঠছে না। বর্তমান বাজারে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো দর্শক টানতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে পকেটের গাঁটের পয়সা খরচ করে আর কত দিন লোকসান গোনা সম্ভব? বাধ্য হয়েই নভেম্বর থেকে হলটি পুরোপুরি বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সিনেমা হলের আধুনিকায়ন ও দর্শক ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার উল্লেখ করে রফিক উদ্দিন বলেন, ‘এই শিল্পকে বাঁচানোর জন্য আমরা চেষ্টা করছি। এ জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সিনেমা হল বাঁচলে পুরো শিল্পই বাঁচবে। আমদানি করা সিনেমা দেশের প্রেক্ষাগৃহে নিয়মিত মুক্তি পেলে দেশের সিনেমা হলগুলো টিকে থাকতে পারবে এবং লাভবান হবে। হলগুলো চালু থাকবে।

দর্শক পুনরায় হলে আসবেন। তখন আমাদের সিনেমাগুলোও ভালো চলবে বলে মনে করছি। আমাদের সিনেমা ভালো হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। আমাদের এখানে অনেক ভালো ভালো সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। সেই সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে এবং প্রচারণায় জোর দিতে হবে। এসব বাস্তবায়ন হলে হয়তো আবারও শিল্পটা ঘুরে দাঁড়াবে। একজন পরিচালক কিংবা শিল্পী চাইলেই বড় পর্দা থেকে ছোট পর্দায় যেতে পারবে, কিন্তু হল মালিকেরা কী করবে?

শিল্পটা বাঁচাতে সবারই এগিয়ে আসতে হবে। সবার আগে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ’ উল্কা সিনেমা হলের সামনে একসময় যেখানে টিকিটের জন্য কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন থাকত, সেখানে আজ শুধুই শূন্যতা। হলের ভেতরে সারিবদ্ধ চেয়ারগুলো ধুলোবালি মেখে পড়ে আছে। হলের এক কর্মচারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আগে ঈদের সময় মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকত না।

আর এখন সিনেমা চালালে দেখা যায় পুরো হলে হাতেগোনা কয়েকজন দর্শক। যে টিকিট বিক্রি হয়, তা দিয়ে জেনারেটরের তেলের খরচও ওঠে না। এমন অবস্থায় হল টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। ’ গাজীপুর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানকার একটা বড় অংশের মানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই সিনেমা হলগুলো। তবে কালের বিবর্তনে একের পর এক হল বন্ধ হয়ে গেছে। মাত্র এক দেড় বছর আগেও গাজীপুরে হাতেগোনা চারটি সিনেমা হল সচল ছিল, যার মধ্যে উল্কা অন্যতম।

এবার উল্কা বন্ধ হয়ে গেলে জেলাটিতে সাধারণ মানুষের সস্তা বিনোদনের পথ আরও কমে আসবে। এর আগে কাপাসিয়ার একমাত্র হল ‘মনোরম’ রূপান্তরিত হয়েছে রেস্তোরাঁয়। উল্কা বন্ধ হলে গাজীপুর শুধু বর্ষা ও ঝুমুর সিনেমা হল দুটি চালু থাকবে। এই হল দুটিও বর্তমানে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। উল্কা সিনেমা হলের এই পরিণতি দেশের সামগ্রিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন শিল্পের এক নির্মম বাস্তবতারই প্রতিফলন।

চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দাপট এবং আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের অভাবের কারণে সাধারণ মানুষ এখন আর সিঙ্গেল স্ক্রিন হলে আসতে চান না। সরকার সিনেমা হল বাঁচাতে নানা উদ্যোগ ও ফান্ডের কথা বললেও তৃণমূলের হল মালিকদের ভাগ্যবদল হচ্ছে না। নভেম্বর থেকে হয়তো আর খুলবে না উল্কা সিনেমা হলের প্রধান ফটক।

প্রজেক্টরের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাজীপুরের বিনোদন ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের চিরসমাপ্তি ঘটবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

ফেসবুকে ফ্রি ভেরিফায়েড ব্যাজ চালুর ঘোষণা মেটার

দর্শক টানতে ব্যর্থ দুর্গাপূজার তিন সিনেমা, শোয়ে দর্শক খরা

Update Time : 04:54:01 am, Monday, 19 October 2026

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গত ১৬ অক্টোবর সারা দেশে মুক্তি পেয়েছে তিনটি সিনেমা—‘স্নেহের বন্ধন’, ‘কাট-পিস’ ও ‘চিরকুট’। তবে মুক্তির প্রথম দিন থেকেই দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টানতে রীতিমতো ব্যর্থ হয়েছে সিনেমাগুলো।

উৎসবের দিনগুলোয় যেখানে সিনেমা হলে দর্শকের উপচে পড়া ভিড় থাকার কথা, সেখানে হলের টিকিট কাউন্টারগুলো পার করছে অলস সময়। আর এই তিন সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সিনেমা ‘স্নেহের বন্ধন’, যেখানে দর্শকখরা চরমে। এই সিনেমার ৩৭ টিকিটের ৩৫টিই কেনেন সিনেমার প্রযোজক-নায়ক, দর্শক দুটি মাত্র টিকিট কেনেন! পূজার আবহে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের গল্প নিয়ে হাজির হয়েছিলেন নির্মাতারা।

পোশাকশিল্পের অন্ধকার জগৎ নিয়ে ইফফাত জাহান মমর ‘কাট-পিস’, নব্বই দশকের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্য ঘটনা ও ক্যাম্পাসের নস্টালজিয়া নিয়ে মুনতাসির আকিবের ‘চিরকুট’ এবং জয় চৌধুরী ও মৌ খান জুটির পারিবারিক মেলোড্রামা ‘স্নেহের বন্ধন’ মুক্তি পায়। কিন্তু মুক্তির প্রথম তিন দিন কোনো সিনেমাই কাক্সিক্ষত দর্শকখরা কাটাতে পারেনি।

হল মালিকদের মতে, পূজার ছুটির মধ্যেও দর্শক উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কম। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা কামরুজ্জামান পরিচালিত ‘স্নেহের বন্ধন’ সিনেমার। ১৪টি হলে সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে। বাণিজ্যিক ঘরানার জয় চৌধুরী ও মৌ খানকে নিয়ে নির্মিত এই সিনেমা মুক্তির আগে রাজধানীর বুকে ছাদখোলা বাসে করে বেশ প্রচার-প্রচারণাও চালানো হয়েছিল।

কিন্তু হল খোলার পর দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে শুরু করে মাল্টিপ্লেক্সÑ সবখানেই এই সিনেমার শোগুলো ফাঁকা যাচ্ছে। দাওয়াত দিয়ে দর্শক পাচ্ছে না সিনেমাটির নায়ক! তার আগের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোও সুপারফ্লপ। মুক্তির প্রথম দিন বরিশাল অভিরুচি সিনেমা হলে দুপুরের শোতে ‘স্নেহের বন্ধন’ দেখতে গিয়েছিলেন ছয়জন দর্শক!

সন্ধ্যার শোতে দর্শক ছিল মাত্র ৯ জন। শনিবার ১২টার শোতে চারজন এবং বিকেলে শোতে দুটি টিকিট বিক্রি হয়। তবে নাইট ও স্পেশাল শো দর্শকখরায় বন্ধ ছিল বলে হলটির ম্যানেজার কবির রূপালী বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই চিত্র বলে জানায় হল কর্তৃপক্ষ। ম্যানেজার কবির বলেন, ‘এখন আসলে কেউ সিনেমা দেখতে চায় না। শুক্রবার সারা দিনে ২০ জনের মতো দর্শক হয়েছিল, কিন্তু সন্ধ্যায় দর্শক না থাকায় শো বন্ধ ছিল।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা। যদিও এখন বরিশালে খুব একটা সিনেমা চলে না। ভালো গল্প হলে একটু দর্শক পাওয়া যায়। আর এই সিনেমার মান নিয়েও অনেকেই সমালোচনা করছেন। বরিশালের সেল খারাপ। দর্শক এলে শো চলে, না হলে বন্ধ থাকে। ’ গতকাল বরিশাল অভিরুচি হলের ম্যানেজারের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন ৩টা বেজে ৪০ মিনিট। শোয়ের নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একজন দর্শকও পাওয়া যায়নি।

লায়ন সিনেমাসে শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে ‘কাট-পিস’ও ‘স্নেহের বন্ধন’। তবে সিনেমা দুটির মান নিয়ে বিরক্ত হলটির কর্ণধার মির্জা আব্দুল খালেক। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি আসলে এখনকার সিনেমা নিয়ে কথা বলতে চাই না। কী বলব, এগুলো কি সিনেমা? এগুলো টাকা খরচ করে মানুষ কেন দেখবে? একটি সিনেমা দেখতে গেলে কমপক্ষে ৫০০ টাকা খরচ আছে।

সিনেমা দেখে সেই টাকাই যদি উশুল না হয়, তাহলে দর্শক কেন সিনেমা দেখবে। ’ সিনেমা দুটি নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দিন “স্নেহের বন্ধন” দেখেছিল ৩৭ জন দর্শক। এর মধ্যে ৩৫টি টিকিট কিনেছেন সিনেমাটির প্রচারণায় আসা প্রযোজক, পরিচালক, নায়ক-নায়িকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা; অর্থাৎ সাধারণ দর্শক টিকিট কিনেছেন মাত্র দুজন।

অন্যদিকে, একই দিনে “কাটপিস” সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র আটটি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা। আমরা আসলে সিনেমা নামিয়ে দিই না। দর্শক না এলে শো বন্ধ থাকে। ’ গাজীপুরের উল্কা সিনেমা হলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘পূজায় যেভাবে দর্শক থাকার কথা, সে রকম নেই।

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন প্রায় ২০ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছিল। তৃতীয় দিনে দর্শকসংখ্যা কমেছে। তবুও আমরা বাংলা সিনেমা নিয়ে আশাবাদী। ’ সিনেমা হলের কর্মকর্তারা জানান, অনেক শো-তে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র দর্শক দেখছেন, যা দিয়ে সিনেমা হলের ন্যূনতম খরচ ওঠানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সনাতন ধাঁচের পারিবারিক গল্প ও দুর্বল নির্মাণশৈলীই দর্শকদের হলবিমুখ করার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা।

ঝুট ব্যবসার অপরাধ জগতের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘কাট-পিস’ মিরপুর সনি সিনেমা হলসহ ২৩টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও আশানুরূপ সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্যদিকে, শ্যামল মাওলা ও আজিজুন মিম অভিনীত ‘চিরকুট’ সিনেমাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নস্টালজিয়া নিয়ে তৈরি হওয়ায় তরুণদের মাঝে কিছুটা আগ্রহ তৈরি করলেও তা টিকিট বিক্রির অঙ্কে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, ঈদ ছাড়া অন্য উৎসবে বড় পরিসরে সিনেমা মুক্তি দেওয়ার সাহস ঢালিউডে কম দেখা যায়। এবার পূজাকে কেন্দ্র করে সেই চেষ্টা করা হলেও সিনেমার দুর্বল কনটেন্ট, আধুনিক মেকিংয়ের অভাব এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তনের কারণে সিনেমাগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। দর্শক এখন হলের পর্দায় লার্জার-দ্যান-লাইফ ভিজ্যুয়াল অথবা অত্যন্ত শক্তিশালী গল্প দেখতে চান।

সেই জায়গায় এই তিন সিনেমা প্রথাগত ফর্মুলা থেকে বের হতে না পারায় উৎসবের আমেজেও দর্শক টানতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। পূজার ছুটির বাকি দিনগুলোয় এই মন্দা কাটিয়ে সিনেমাগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখন বড়সড় সংশয় তৈরি হয়েছে। বন্ধ হচ্ছে ‘উল্কা’ সিনেমা হল সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে প্রজেক্টরের তীব্র আলো যখন সাদা পর্দায় আছড়ে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক অন্য রকম মায়াজাল।

সেই মায়াজালে বুঁদ হয়ে দশকের পর দশক মেতে থাকত সাধারণ মানুষ। কিন্তু প্রযুক্তির আগ্রাসন, মানসম্মত সিনেমার অভাব আর ক্রমাগত লোকসানের ধাক্কায় সেই জৌলুশ এখন অতীত। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে গাজীপুরের অন্যতম পরিচিত বিনোদন কেন্দ্র ‘উল্কা’ সিনেমা হল। আগামী নভেম্বর মাস থেকে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই হলের রুপালি পর্দা।

উল্কা সিনেমা হলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ধুঁকে ধুঁকে হলটি চলছে। ক্রমেই লোকসান হচ্ছে। এখনকার সিনেমা চালিয়ে বিদ্যুৎ বিলের টাকাও উঠছে না। ভালো গল্পের সিনেমা ও পরিচিত নায়ক-নায়িকা হলে ভালো চলে। যেমন সর্বশেষ শাকিব খানের সিনেমা এবং আরিফিন শুভ ও মিম অভিনীত ‘মালিক’ চালিয়ে আমরা অভাবনীয় ব্যবসা করেছিলাম।

এরপর সারা বছর ব্যবসা নেই। দুই ঈদে সিনেমা চালিয়ে হল টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যে কারণে নভেম্বর থেকে আমরা হলটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। লোকসান তো আছেই, এর মধ্যে আবার ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। সবকিছু মিলিয়ে সহনশীল পর্যায়ে নেই। আর কত লোকসান দেব? তাই বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ’ হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান সময়ে সিনেমা হলে দর্শক সমাগম একেবারেই শূন্যের কোঠায়।

হাতেগোনা কয়েকজন দর্শক নিয়ে শো চালাতে গিয়ে হলের কর্মীদের বেতন তো দূরের কথা, দৈনিক ও মাসিক বিদ্যুৎ বিলের টাকাও উঠছে না। বর্তমান বাজারে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো দর্শক টানতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে পকেটের গাঁটের পয়সা খরচ করে আর কত দিন লোকসান গোনা সম্ভব? বাধ্য হয়েই নভেম্বর থেকে হলটি পুরোপুরি বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সিনেমা হলের আধুনিকায়ন ও দর্শক ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার উল্লেখ করে রফিক উদ্দিন বলেন, ‘এই শিল্পকে বাঁচানোর জন্য আমরা চেষ্টা করছি। এ জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সিনেমা হল বাঁচলে পুরো শিল্পই বাঁচবে। আমদানি করা সিনেমা দেশের প্রেক্ষাগৃহে নিয়মিত মুক্তি পেলে দেশের সিনেমা হলগুলো টিকে থাকতে পারবে এবং লাভবান হবে। হলগুলো চালু থাকবে।

দর্শক পুনরায় হলে আসবেন। তখন আমাদের সিনেমাগুলোও ভালো চলবে বলে মনে করছি। আমাদের সিনেমা ভালো হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। আমাদের এখানে অনেক ভালো ভালো সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। সেই সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে এবং প্রচারণায় জোর দিতে হবে। এসব বাস্তবায়ন হলে হয়তো আবারও শিল্পটা ঘুরে দাঁড়াবে। একজন পরিচালক কিংবা শিল্পী চাইলেই বড় পর্দা থেকে ছোট পর্দায় যেতে পারবে, কিন্তু হল মালিকেরা কী করবে?

শিল্পটা বাঁচাতে সবারই এগিয়ে আসতে হবে। সবার আগে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ’ উল্কা সিনেমা হলের সামনে একসময় যেখানে টিকিটের জন্য কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন থাকত, সেখানে আজ শুধুই শূন্যতা। হলের ভেতরে সারিবদ্ধ চেয়ারগুলো ধুলোবালি মেখে পড়ে আছে। হলের এক কর্মচারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আগে ঈদের সময় মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকত না।

আর এখন সিনেমা চালালে দেখা যায় পুরো হলে হাতেগোনা কয়েকজন দর্শক। যে টিকিট বিক্রি হয়, তা দিয়ে জেনারেটরের তেলের খরচও ওঠে না। এমন অবস্থায় হল টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। ’ গাজীপুর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানকার একটা বড় অংশের মানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই সিনেমা হলগুলো। তবে কালের বিবর্তনে একের পর এক হল বন্ধ হয়ে গেছে। মাত্র এক দেড় বছর আগেও গাজীপুরে হাতেগোনা চারটি সিনেমা হল সচল ছিল, যার মধ্যে উল্কা অন্যতম।

এবার উল্কা বন্ধ হয়ে গেলে জেলাটিতে সাধারণ মানুষের সস্তা বিনোদনের পথ আরও কমে আসবে। এর আগে কাপাসিয়ার একমাত্র হল ‘মনোরম’ রূপান্তরিত হয়েছে রেস্তোরাঁয়। উল্কা বন্ধ হলে গাজীপুর শুধু বর্ষা ও ঝুমুর সিনেমা হল দুটি চালু থাকবে। এই হল দুটিও বর্তমানে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। উল্কা সিনেমা হলের এই পরিণতি দেশের সামগ্রিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন শিল্পের এক নির্মম বাস্তবতারই প্রতিফলন।

চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দাপট এবং আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের অভাবের কারণে সাধারণ মানুষ এখন আর সিঙ্গেল স্ক্রিন হলে আসতে চান না। সরকার সিনেমা হল বাঁচাতে নানা উদ্যোগ ও ফান্ডের কথা বললেও তৃণমূলের হল মালিকদের ভাগ্যবদল হচ্ছে না। নভেম্বর থেকে হয়তো আর খুলবে না উল্কা সিনেমা হলের প্রধান ফটক।

প্রজেক্টরের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাজীপুরের বিনোদন ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের চিরসমাপ্তি ঘটবে।