ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১২টা। আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে ছটফট করছিল ১৫ বছরের মোহনা। ঘনঘন শ্বাস নেওয়া ও বুকে ব্যথায় তার অবস্থা খারাপ। চিকিৎসক দ্রুত ইনজেকশন দেওয়ার পাশাপাশি গ্যাভিসল সাসপেনশনসহ কয়েকটি ওষুধ লিখে স্বজনদের বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে বলেন।
প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে মোহনার বাবা মো. মাসুদ হোসেন সাইকেলে ছুটে যান আক্কেলপুর বাজার, হাসপাতাল গেট ও রেলগেটসংলগ্ন এলাকার ওষুধের দোকানগুলোতে। কিন্তু কোথাও খোলা দোকান পাননি। শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরের জয়পুরহাট সদর থেকে ওষুধ কিনে ফেরেন তিনি। ততক্ষণে মোহনার শারীরিক অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
মাসুদের এই ভোগান্তি শুধু একটি পরিবারের রাতের দুর্ভোগের ঘটনা নয়। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষের জন্য গভীর রাতে জরুরি ওষুধ পাওয়া যেন নিয়মিত এক সংকট। রাত হলে উপজেলার অধিকাংশ ওষুধের দোকান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য দূরের পথে ছুটতে হয়।
হাসপাতালের রেজিস্টারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগে গড়ে ১২ থেকে ১৭ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগের ঝুঁকি, শিশুদের ডায়রিয়া কিংবা হঠাৎ রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার মতো সংকটাপন্ন রোগী থাকেন গড়ে ৪ থেকে ৬ জন। জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা এক উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (এসএসিএমও) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাতে আসা রোগীদের অনেকেরই জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশন, অক্সিজেন মাস্ক বা জরুরি স্যালাইনের প্রয়োজন হয়।
এসবের কিছু হাসপাতাল থেকে দেওয়া হলেও ইনডোর স্টকে সব ধরনের ওষুধ সব সময় পর্যাপ্ত থাকে না। ফলে প্রেসক্রিপশন নিয়ে স্বজনদের বাইরে পাঠাতে হয়। অনেক সময় তাদের খালি হাতে ফিরে আসতে দেখে চিকিৎসকদেরও খারাপ লাগে। স্থানীয়রা জানান, আক্কেলপুর পৌরবাজারে দুই ডজনের বেশি ওষুধের দোকান রয়েছে। কিন্তু রাত ১২টার পর পুরো সদর এলাকা কার্যত ফার্মেসিশূন্য হয়ে পড়ে।
এতে গভীর রাতে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের স্বজনদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। ভুক্তভোগী মাধবী বলেন, রাতে হঠাৎ শিশুর তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা বয়স্ক কারও হৃদরোগের লক্ষণ দেখা দিলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধ পাওয়া যায় না। অথচ রাতের বেলা প্যারাসিটামল, নরমাল স্যালাইন কিংবা গ্যাসের ওষুধের মতো সাধারণ ওষুধ কিনতেও কোনো দোকান খোলা পাওয়া যায় না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আফাজ মোল্লা বলেন, উপজেলা সদরে অন্তত তিন-চারটি ওষুধের দোকান রোস্টার পদ্ধতিতে রাতভর খোলা রাখা কঠিন হওয়ার কথা নয়। বণিক সমিতি ও প্রশাসন উদ্যোগ নিলে পালাক্রমে প্রতিটি দোকান সপ্তাহে অন্তত এক দিন রাতে সেবা দিতে পারে। ফার্মেসি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গভীর রাতে দোকান বন্ধ রাখার অন্যতম কারণ হলো নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত বিক্রয়কর্মীর অভাব।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, গভীর রাতে একা দোকান খোলা রাখা নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া রাতে ক্রেতার সংখ্যা কম থাকায় নিয়মিত কর্মচারী রেখে ব্যবসা পরিচালনা করাও লাভজনক নয়। তবে প্রশাসন ও বণিক সমিতি নির্দেশনা দিলে রোস্টার ভিত্তিতে রাতে সেবা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আক্কেলপুর কলেজ বাজার বণিক সমিতির আহ্বায়ক মো. আলমগীর চৌধুরী বাদশা বলেন, গভীর রাতে জরুরি ওষুধের প্রয়োজনীয়তা তারা বুঝতে পারছেন।
বিষয়টি মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে রোস্টার ভিত্তিতে কয়েকটি ফার্মেসি রাতে খোলা রাখার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হবে। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশিক-উর-রহমান বলেন, গভীর রাতে জরুরি ওষুধ না পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালের বাইরে থেকে ওষুধ সংগ্রহের প্রয়োজন হলে রোগীর স্বজনদের যেন দূরে ছুটতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। রোস্টার ভিত্তিতে রাতে ফার্মেসি খোলা রাখার বিষয়ে বণিক সমিতি ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।




















