ঢাকার রাজপথে মিটারে চালিত সিএনজি-অটোরিকশা চুক্তি ছাড়া ভাড়ায় চলে না। এসব অটোরিকশায় চড়তে হলে মানুষকে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া গুনতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং অ্যাপে অন্তর্ভুক্ত সিএনজি-অটোরিকশা নগরবাসীর যাতায়াতে অনেকটাই স্বাচ্ছন্দ্য ফেরায়। শুধু তাই নয়, অ্যাপে কন্ট্রাক্টের কারণে এই বাহন যাত্রীদের জন্য অনেকটা নিরাপদও। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে পরিবহন তদারকি সংস্থা বিআরটিএ’র একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত সবকিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে রাজধানীর লাখো মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতকে আবারো দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দেবে- এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। জানা গেছে, গত এক দশকে রাজধানীর গণপরিবহনে প্রযুক্তনির্ভর যে সেবাগুলো মানুষের আস্থা অর্জন করেছে, তার অন্যতম অ্যাপভিত্তিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা। মোবাইল ফোনে কয়েকটি স্পর্শেই গাড়ি ডাকা, আগেই ভাড়া জানা, চালকের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং পুরো যাত্রার ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের সুবিধায় এই সেবা হয়ে উঠেছিল নগরবাসীর নির্ভরতার প্রতীক। কিন্তু বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সংশোধিত রাইডশেয়ারিং নীতিমালায় উবার, পাঠাও, ইনড্রাইভের মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে সিএনজি-অটোরিকশা এবং নন-এসি কার সেবা বাদ দেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, এই সিদ্ধান্তে লাভবান হবে কারা? আর ক্ষতির বোঝা বইবেন কারা? এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বনানীর বিআরটিএ কার্যালয় ঘেরাও করেন শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তারা অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আন্দোলনরত চালকদের মধ্য থেকে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে চেয়ারম্যানের দপ্তরে ডাকা হয়। প্রতিনিধি দলে ছিলেন মোফাজ্জল হোসেন ফরাজী, জয়নাল আবেদীন শান্ত, নাছির উদ্দিন, মনির হোসেন ও মোহাম্মদ আলম। বৈঠক শেষে মোহাম্মদ আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিআরটিএ চেয়ারম্যান তাদের আশ্বস্ত করেছেন, অ্যাপে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ রাখার বিষয়ে ইতিবাচক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার ভাষ্য, অ্যাপভিত্তিক সেবা বন্ধ হলে শুধু চালকদের আয় কমবে না, বিপাকে পড়বেন লাখো যাত্রীও। ২০০৩ সালে রাজধানীতে দূষণকারী টু-স্ট্রোক বেবিট্যাক্সির পরিবর্তে চালু হয় ফোর-স্ট্রোক সিএনজিচালিত অটোরিকশা। উদ্দেশ্য ছিল মিটারভিত্তিক ভাড়া নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হয়নি। বরং দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীবাসীকে ভুগতে হয়েছে একই সমস্যায়। মিটার চালাতে অনীহা, অতিরিক্ত ভাড়া দাবি এবং গন্তব্য বেছে যাত্রী নেওয়ার প্রবণতা সাধারণ যাত্রীর নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়। ২০১৬-১৭ সালের দিকে রাইডশেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে সিএনজিচালিত অটোরিকশা যুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। নির্ধারিত ভাড়া, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, চালকের পরিচয় যাচাই এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ যাত্রীদের আস্থা বাড়ায়। বিশেষ করে নারী, পরিবার ও রাতের যাত্রীদের কাছে এটি হয়ে ওঠে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন। এখন সেই ব্যবস্থাই সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কথা হয় অ্যাপভিত্তিক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে। তাদের দাবি, সরকারি নির্দেশনায় দৈনিক জমার সীমা থাকলেও বাস্তবে অনেক মালিক বেশি টাকা আদায় করেন। এরপর জ্বালানি ব্যয় ও অন্যান্য খরচ মিটিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাপচালিত সিএনজি-অটোরিকশার চালক আজাদ রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অ্যাপে নিয়মিত ট্রিপ পাওয়া যায়। অতিরিক্ত ভাড়া দাবি না করেও ভালো আয় করা সম্ভব হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা বন্ধ হলে আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রীর অপেক্ষা করতে হবে। এতে দুর্ভোগ বাড়বে চালক ও যাত্রী উভয়েরই। পরিবহন খাত-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, রাজধানীতে এখনো কিছু অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে অতীতেও নানা অভিযোগ ছিল, এখনো আছে। তাদের মতে, অ্যাপভিত্তিক সেবা সীমিত হয়ে গেলে নগদ লেনদেন, দরকষাকষি এবং ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের সুযোগ আবারো বাড়তে পারে। তবে সিদ্ধান্তটির পেছনে কোনো বিশেষ সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে কি না- সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো তদন্ত হয়নি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৩ মে রাইডশেয়ারিং-সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকে নীতিগতভাবে অ্যাপভিত্তিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা সেবা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। রাইডশেয়ারিং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি ব্যাখ্যা বা প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৮টি রাইডশেয়ারিং প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে সেবা দিচ্ছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৩৫ হাজার যানবাহন পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপভিত্তিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা সেবা সীমিত হলে এর প্রভাব শুধু চালকদের ওপরই পড়বে না। ডিজিটাল পরিবহন খাত, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গ্যারেজ, জ্বালানি, বিমা, মোবাইল আর্থিক সেবা, কাস্টমার সাপোর্টসহ পুরো ইকোসিস্টেমই ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে গণপরিবহনকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার কথা। সেখানে কার্যকর একটি ডিজিটাল সেবা সীমিত করার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। তিনি বলেন, কোথাও অনিয়ম থাকলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু পুরো সেবা বন্ধ করে দেওয়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। রাজধানীর কর্মজীবী মানুষের বড় একটি অংশ এখন অ্যাপভিত্তিক সিএনজিচালিত অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আরিফ রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আগে থেকেই ভাড়া জানা যায়, চালকের পরিচয় থাকে, যাত্রাপথ ট্র্যাক করা যায়। এই সেবা বন্ধ হলে আবারো অতিরিক্ত ভাড়া, দরকষাকষি ও অনিশ্চয়তার পুরোনো বাস্তবতায় ফিরতে হবে। স্পেন প্রবাসী আব্দুল লতিফ বলেন, দেশে এলেই তিনি অ্যাপভিত্তিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবহার করেন। স্বল্প দূরত্বে এটি নিরাপদ, সহজ ও সুবিধাজনক। বন্ধ না করে বরং সেবাটিকে আরও উন্নত করা উচিত। এ বিষয়ে বিআরটিএ’র পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. জাকির হোসেন বলেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের যেসব দাবি-দাওয়া রয়েছে, সেগুলো পরবর্তীকালে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ২০০৭ সালে সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিচালনার জন্য আলাদা নীতিমালা করা হয়েছিল। পরে কীভাবে রাইডশেয়ারিং নীতিমালায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা যুক্ত হলো, আবার কেন সেটিকে বাদ দেওয়া হচ্ছে- সে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তার ভাষ্য, পুরো বিষয়টিতে পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর নীতিগত অসঙ্গতি ও সমন্বয়হীনতাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অ্যাপভিত্তিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা সেবা রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থায় শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায়নি, বরং যাত্রী ও চালকের মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিরাপত্তার একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। সেই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, বিআরটিএর লক্ষ্য যদি সত্যিই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে প্রযুক্তিনির্ভর একটি জনপ্রিয় সেবা বাদ দেওয়ার পরিবর্তে সেটিকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও কার্যকর করার উদ্যোগই কি বেশি যৌক্তিক হতো না? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট না হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার, রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে নয়, বরং আরও শক্তিশালী করেই দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। এখন সবার দৃষ্টি বিআরটিএ’র দিকে। সংস্থাটি কি অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে, নাকি বিতর্ক আরও গভীর হবে-সেটিই এখন দেখার বিষয়।
4:15 am, Friday, 31 July 2026
শিরোনাম :











