2:12 am, Friday, 31 July 2026

আবাসন খাতে ব্যাংক ঋণ মাত্র ৩০ শতাংশ

  • MIT ERP
  • Update Time : 12:00:41 am, Friday, 31 July 2026
  • 4
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আবাসন খাতে ঋণ যায় মাত্র ৭-৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ দেশের আবাসন খাতে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হয়। অর্থাৎ, এ বেচাকেনার মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হয়। সে হিসাবে আবাসন খাতের এই বাজারের ৭০ শতাংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক বা নগদে লেনদেন হয়। অথচ উন্নত ও উন্নয়নশীল প্রায় সব দেশেই আবাসন খাতের বেচাকেনা হয় ব্যাংক খাতের মাধ্যমে। ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিয়েই গ্রাহকেরা ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রায় ৩০ লাখ ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে। কিন্তু এসব ফ্ল্যাট বিক্রিতে ব্যাংক থেকে ঋণ গেছে খুবই কম। আবাসন খাত বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকারসহ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোয় আবাসন খাতের বিকাশ হয় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে। ইউরোপ বা আমেরিকার শহরগুলোয় বসবাসকারী নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নাগরিকদের প্রধান ভরসাস্থল হলো ব্যাংক। সেসব শহরে খুব সহজেই দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদের আবাসন ঋণ পাওয়া যায়। গ্রাহকদের চাহিদার বিচারে ৮০০-১০০০ বর্গফুটের দৃষ্টিনন্দন ফ্ল্যাটও নির্মাণ করে আবাসন কোম্পানিগুলো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পুরোপুরি বিপরীত। এখানে ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সংযোগ বাড়লে খাতটি আরও বেশি বিকশিত হতো। এই খাতের বিদ্যমান অস্বচ্ছতাও কমে আসত। কম সুদে ব্যাংক ঋণ নিশ্চিত হওয়ায় মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটত। সারা বিশ্বেই ব্যাংক ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আবাসন খাত তুলনামূলক নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত। কারণ এই খাতে ঋণের বিপরীতে ক্রয়কৃত ফ্ল্যাট তথা পর্যাপ্ত জামানত থাকে। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে জামানতের সম্পদ বিক্রি করে ঋণ আদায় সহজ হয়। এ খাতে বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণের হারও কম। এত সব সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও বাংলাদেশে হোম লোনের বাজার বড় হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থই বেশি ব্যয় হচ্ছে। এ জন্য গ্রাহকেরা নগদ লেনদেনেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করছেন। ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি বেশি হওয়া, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ঋণ পেতে ভোগান্তিসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও এ ক্ষেত্রে দায়ী বলে মনে করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলো থেকে মাত্র ৯৩ হাজার ৮৭৮ গ্রাহক নগরাঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় ঋণ নিয়েছেন। এসব গ্রাহকের বিপরীতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩১ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতিজন গ্রাহক গড়ে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। নগরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামীণ অঞ্চলের আবাসনেও ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে আবাসন ঋণ নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৭৪৩। গ্রামীণ আবাসনের জন্য নেওয়া এই ঋণের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ৭০ ৯ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিজন গ্রাহক ৮ লাখ ২৯ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছেন। অন্যদিকে বাড়ি সংস্কারের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫ জন গ্রাহক। এই গ্রাহকেরা ৭ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকপ্রতি গড়ে ঋণ পেয়েছেন ৪ লাখ ৭৮ হজার টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত আবাসন খাতের কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে ৩৮ হাজার ৬০১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। মোট ৬ হাজার ৯৭২টি ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে এ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাবপ্রতি বিতরণকৃত ঋণের গড় স্থিতি ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনভিত্তিক আবাসন ঋণের সুনির্দিষ্ট গ্রাহকসংখ্যার হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের আবাসন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাজধানী ঢাকানির্ভর। ভালো মানের ভবন নির্মাণের সুনাম থাকা কোম্পানিগুলোর ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেশি। সেগুলোর আকারও হয় অনেক বড়। বিলাসবহুল ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের প্রায় সবই বিক্রি হয় নগদ টাকায়। এ ক্ষেত্রে ঘুস-দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত কালো টাকার ভূমিকাই বেশি। অন্যদিকে মধ্যবিত্তদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণকারী বেশির ভাগ আবাসন কোম্পানির তৈরি করা ফ্ল্যাট বা ভবনের মান নিম্নমানের। চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ মানের উপকরণ ব্যবহার না করা, নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ব্যর্থতা, জমির কাগজপত্র সঠিক না থাকা, ব্যাংক ঋণ না পাওয়াসহ নানা সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন। জমি ও নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশে ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের দামও ক্রমাগত বেড়েছে। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে ফ্ল্যাট কেনায় ব্যাংক ঋণের আকার বাড়ানো হয়নি। এতে অনেক গ্রাহক ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি ঋণপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণে ব্যক্তিপ্রতি ঋণ অনুমোদন সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে ওই ব্যাংক আবাসন খাতে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের বেশি, কিন্তু ১০ শতাংশের নিচে থাকলে ৩ কোটি এবং ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি থাকা ব্যাংক আগের মতোই সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত আবাসন ঋণ দিতে পারবে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কম, তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো হলেও ঋণ ও নিজস্ব পুঁজির অনুপাত আগের মতোই ৭০ : ৩০ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, ফ্ল্যাটের দাম ১০০ টাকা হলে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা ব্যাংক অর্থায়ন করবে। বাকি ৩০ টাকা ক্রেতার নিজের থাকতে হবে। দেশে হোম লোন দেওয়ার জন্য বিশেষায়িত কোনো ব্যাংক না থাকলেও তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি খাতের বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কেবল আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার জন্য। আর বেসরকারি খাতের ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স পিএলসি আবাসন খাতে ঋণ দিচ্ছে। তবে দেশে কার্যরত প্রায় সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরই আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রডাক্ট রয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, গৃহঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি এই ঋণ পরিশোধের সময়সীমাও বাড়ানো দরকার, যাতে করে নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীরা ঋণ নিতে পারেন। একজন চাকরিজীবী বা মধ্যবিত্ত যদি বাড়িভাড়া বা তার চেয়ে কিছু বেশি টাকা মাসিক কিস্তিতে গৃহঋণ নিতে পারেন, তাহলে একদিকে যেমন তিনি স্বস্তি পাবেন, তেমনি আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। পৃথিবীর সব দেশেই গৃহঋণ পাওয়া যায় সহজ শর্তে এবং দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি পরিশোধ সুবিধায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং খাতে গৃহঋণের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, গৃহঋণ বাড়লে শুধু আবাসন খাত নয়, এর সঙ্গে জড়িত অন্তত ৫০০ খাত বিকশিত হয়। আবাসন খাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রড, সিমেন্ট, বালু, রং, কাঠ, আসবাব ইত্যাদি শিল্প খাত। তা ছাড়া গৃহঋণ ঝুঁকিহীন। এই ঋণগ্রহীতারা অস্তিত্বের প্রয়োজনে খেলাপি হন না। খেলাপি হলেও ব্যাংক সহজেই টাকা উদ্ধার করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সাহসী সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারে দেশের অর্থনীতি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

বিজমায়েস্ট্রোজ এক্স ইউএফএলপি ২০২৬-এর গ্র্যান্ড ফিনালে অনুষ্ঠিত, চ্যাম্পিয়ন ‘সোপ-আর-স্টারস’

আবাসন খাতে ব্যাংক ঋণ মাত্র ৩০ শতাংশ

Update Time : 12:00:41 am, Friday, 31 July 2026

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আবাসন খাতে ঋণ যায় মাত্র ৭-৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ দেশের আবাসন খাতে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হয়। অর্থাৎ, এ বেচাকেনার মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হয়। সে হিসাবে আবাসন খাতের এই বাজারের ৭০ শতাংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক বা নগদে লেনদেন হয়। অথচ উন্নত ও উন্নয়নশীল প্রায় সব দেশেই আবাসন খাতের বেচাকেনা হয় ব্যাংক খাতের মাধ্যমে। ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিয়েই গ্রাহকেরা ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রায় ৩০ লাখ ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে। কিন্তু এসব ফ্ল্যাট বিক্রিতে ব্যাংক থেকে ঋণ গেছে খুবই কম। আবাসন খাত বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকারসহ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোয় আবাসন খাতের বিকাশ হয় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে। ইউরোপ বা আমেরিকার শহরগুলোয় বসবাসকারী নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নাগরিকদের প্রধান ভরসাস্থল হলো ব্যাংক। সেসব শহরে খুব সহজেই দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদের আবাসন ঋণ পাওয়া যায়। গ্রাহকদের চাহিদার বিচারে ৮০০-১০০০ বর্গফুটের দৃষ্টিনন্দন ফ্ল্যাটও নির্মাণ করে আবাসন কোম্পানিগুলো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পুরোপুরি বিপরীত। এখানে ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সংযোগ বাড়লে খাতটি আরও বেশি বিকশিত হতো। এই খাতের বিদ্যমান অস্বচ্ছতাও কমে আসত। কম সুদে ব্যাংক ঋণ নিশ্চিত হওয়ায় মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটত। সারা বিশ্বেই ব্যাংক ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আবাসন খাত তুলনামূলক নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত। কারণ এই খাতে ঋণের বিপরীতে ক্রয়কৃত ফ্ল্যাট তথা পর্যাপ্ত জামানত থাকে। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে জামানতের সম্পদ বিক্রি করে ঋণ আদায় সহজ হয়। এ খাতে বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণের হারও কম। এত সব সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও বাংলাদেশে হোম লোনের বাজার বড় হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থই বেশি ব্যয় হচ্ছে। এ জন্য গ্রাহকেরা নগদ লেনদেনেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করছেন। ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি বেশি হওয়া, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ঋণ পেতে ভোগান্তিসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও এ ক্ষেত্রে দায়ী বলে মনে করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলো থেকে মাত্র ৯৩ হাজার ৮৭৮ গ্রাহক নগরাঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনায় ঋণ নিয়েছেন। এসব গ্রাহকের বিপরীতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩১ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতিজন গ্রাহক গড়ে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। নগরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামীণ অঞ্চলের আবাসনেও ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে আবাসন ঋণ নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৭৪৩। গ্রামীণ আবাসনের জন্য নেওয়া এই ঋণের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ৭০ ৯ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিজন গ্রাহক ৮ লাখ ২৯ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছেন। অন্যদিকে বাড়ি সংস্কারের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫ জন গ্রাহক। এই গ্রাহকেরা ৭ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকপ্রতি গড়ে ঋণ পেয়েছেন ৪ লাখ ৭৮ হজার টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত আবাসন খাতের কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে ৩৮ হাজার ৬০১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। মোট ৬ হাজার ৯৭২টি ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে এ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাবপ্রতি বিতরণকৃত ঋণের গড় স্থিতি ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনভিত্তিক আবাসন ঋণের সুনির্দিষ্ট গ্রাহকসংখ্যার হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের আবাসন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাজধানী ঢাকানির্ভর। ভালো মানের ভবন নির্মাণের সুনাম থাকা কোম্পানিগুলোর ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেশি। সেগুলোর আকারও হয় অনেক বড়। বিলাসবহুল ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের প্রায় সবই বিক্রি হয় নগদ টাকায়। এ ক্ষেত্রে ঘুস-দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত কালো টাকার ভূমিকাই বেশি। অন্যদিকে মধ্যবিত্তদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণকারী বেশির ভাগ আবাসন কোম্পানির তৈরি করা ফ্ল্যাট বা ভবনের মান নিম্নমানের। চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ মানের উপকরণ ব্যবহার না করা, নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ব্যর্থতা, জমির কাগজপত্র সঠিক না থাকা, ব্যাংক ঋণ না পাওয়াসহ নানা সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন। জমি ও নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশে ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের দামও ক্রমাগত বেড়েছে। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে ফ্ল্যাট কেনায় ব্যাংক ঋণের আকার বাড়ানো হয়নি। এতে অনেক গ্রাহক ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি ঋণপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণে ব্যক্তিপ্রতি ঋণ অনুমোদন সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে ওই ব্যাংক আবাসন খাতে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের বেশি, কিন্তু ১০ শতাংশের নিচে থাকলে ৩ কোটি এবং ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি থাকা ব্যাংক আগের মতোই সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত আবাসন ঋণ দিতে পারবে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কম, তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো হলেও ঋণ ও নিজস্ব পুঁজির অনুপাত আগের মতোই ৭০ : ৩০ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, ফ্ল্যাটের দাম ১০০ টাকা হলে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা ব্যাংক অর্থায়ন করবে। বাকি ৩০ টাকা ক্রেতার নিজের থাকতে হবে। দেশে হোম লোন দেওয়ার জন্য বিশেষায়িত কোনো ব্যাংক না থাকলেও তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি খাতের বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কেবল আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার জন্য। আর বেসরকারি খাতের ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স পিএলসি আবাসন খাতে ঋণ দিচ্ছে। তবে দেশে কার্যরত প্রায় সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরই আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রডাক্ট রয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, গৃহঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি এই ঋণ পরিশোধের সময়সীমাও বাড়ানো দরকার, যাতে করে নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীরা ঋণ নিতে পারেন। একজন চাকরিজীবী বা মধ্যবিত্ত যদি বাড়িভাড়া বা তার চেয়ে কিছু বেশি টাকা মাসিক কিস্তিতে গৃহঋণ নিতে পারেন, তাহলে একদিকে যেমন তিনি স্বস্তি পাবেন, তেমনি আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। পৃথিবীর সব দেশেই গৃহঋণ পাওয়া যায় সহজ শর্তে এবং দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি পরিশোধ সুবিধায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং খাতে গৃহঋণের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, গৃহঋণ বাড়লে শুধু আবাসন খাত নয়, এর সঙ্গে জড়িত অন্তত ৫০০ খাত বিকশিত হয়। আবাসন খাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রড, সিমেন্ট, বালু, রং, কাঠ, আসবাব ইত্যাদি শিল্প খাত। তা ছাড়া গৃহঋণ ঝুঁকিহীন। এই ঋণগ্রহীতারা অস্তিত্বের প্রয়োজনে খেলাপি হন না। খেলাপি হলেও ব্যাংক সহজেই টাকা উদ্ধার করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সাহসী সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারে দেশের অর্থনীতি।