বর্ষার ভরা মৌসুমে উত্তাল মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী এখন যৌবনের পূর্ণতায় ভরপুর। নদীর বুকজুড়ে প্রবল স্রোত, জোয়ার-ভাটার ছন্দ আর মাছ ধরার কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকার কথা ছিল গোটা উপকূল। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নদীর বুক চিরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলে অধিকাংশ জেলেই ফিরছেন প্রায় খালি হাতে। ভরা মৌসুমেও মেঘনার এমন ইলিশের কৃপণতা উপকূলের জেলে পরিবারগুলোতে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। ভোলা সদর, ইলিশা, দৌলতখান, তজুমদ্দিন, মনপুরা ও চরফ্যাশনের বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শত শত মাছ ধরার ট্রলার নদীতে ঘুরে বেড়ালেও আশানুরূপ ইলিশের দেখা মিলছে না। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একই পরিস্থিতি বিরাজ করায় চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে জেলেদের। জেলেরা জানান, সরকারের দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত ছিলেন তারা। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর ভালো একটি মৌসুমের আশায় চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে জাল মেরামত, ট্রলারে ডিজেল এবং পর্যাপ্ত বরফ কিনে নদীতে নেমেছিলেন। কিন্তু কাক্সিক্ষত মাছ না পাওয়ায় সেই বিনিয়োগ এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে; যা দিয়ে নৌকার জ্বালানি, বরফ ও শ্রমিকের মজুরিই উঠছে না। সদর উপজেলার নাছির মাঝির জেলে বাদশা মাঝি বলেন, সারাদিন নদীতে থেকে যে মাছ পাই, তা বাজারে বিক্রি করে ট্রলারের ডিজেলের খরচই ওঠে না। এই দেনা শোধ করব কীভাবে আর পরিবারই বা চালাব কীভাবে, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। চরফ্যাশনের গাছির খালের জেলে শরিফ মাঝি জানান, গত বছর এ সময়ে ট্রলারভর্তি ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফিরেছিলাম। এবার জালে কয়েকটা ইলিশ পেতেও কষ্ট হচ্ছে। এমন দুর্দিন আগে খুব কম দেখেছি। ইলিশের এই চরম সংকটে কেবল জেলেরাই নন, বিপাকে পড়েছেন মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার, বরফকল মালিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরাও। ভোলার বিভিন্ন মাছঘাটে আগের মতো হাঁকডাক ও সরব বেচাকেনা নেই। অনেক আড়তে দিনের বড় একটা সময় ব্যবসায়ীদের অলস বসে কাটাতে দেখা যাচ্ছে। বরফকলগুলো পর্যাপ্ত বরফ বিক্রি করতে না পেরে লোকসানের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, যেসব শ্রমিক ইলিশ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কাজ না থাকায় তাদের আয়ও বন্ধের উপক্রম হয়েছে। উপকূলের মানুষের কাছে ইলিশ কেবল একটি আমিষসমৃদ্ধ মাছ নয়; এটি তাদের জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ভরা মৌসুমেও যখন মেঘনা ইলিশে কৃপণ হয়ে ওঠে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে। এখন জেলে থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও বরফকল মালিক সবার চোখ কেবল নদীর দিকে। একটি অনুকূল জোয়ার এবং ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশের আশায় বুক বেঁধে দিন গুনছেন তারা। মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীর পানির প্রবাহ হ্রাস, লবণাক্ততার পরিবর্তন, আবহাওয়ার বৈরিতা, স্রোতের গতি-প্রকৃতির ভিন্নতা এবং গভীর সাগরে ইলিশের বিচরণ পরিবর্তনের কারণে সাময়িকভাবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। অনুকূল পরিবেশ ও কাক্সিক্ষত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নদীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় জেলেদের দাবি, আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় বহু পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত নিবন্ধিত জেলেদের জন্য বিশেষ খাদ্যসহায়তা ও সহজ শর্তে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি নদীতে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ নিয়ে কার্যকর গবেষণা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, জলবাযুর পরিবর্তন এবং নদীর বিভিন্ন মোহনায় ডুবোচর সৃষ্টির কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। অবৈধ ট্রলিং জাল ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের কারণে নদীতে পানির প্রবাহ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে আগামী দিনে উপকূলীয় নদ-নদীতে ইলিশের আগমন ও আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।
6:09 am, Friday, 31 July 2026
শিরোনাম :













