দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র রূপ ধারণ করছে। বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না, শিল্পকারখানায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাচ্ছে না প্রয়োজনীয় গ্যাস। এ সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডলারে কেনা এ গ্যাস দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করলেও আমদানির বিপুল ব্যয়, ভর্তুকির চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট নতুন করে অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনায় ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা।
বিপরীতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের জন্য উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় দেশীয় অনুসন্ধানের বরাদ্দের প্রায় ৫১ গুণ। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় বেড়েছে ৮৫৫.৪২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৮৫ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত মাসে ৩২টি কূপ খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। আরও ১৫০টি কূপের মধ্যে ৫১টি খননের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩২টির কাজ শেষ, ১১টির কাজ চলমান এবং আটটি কূপের কাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে বিএনপি সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন ও সংস্কারের (ওয়ার্কওভার) পরিকল্পনা নিয়েছে।
এর বাইরে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই বিশাল কর্মসূচির বাস্তবায়ন, দেশীয় গ্যাসের প্রকৃত মজুত এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর সক্ষমতাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একদিকে এলএনজি আমদানিতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের মাটির নিচে থাকা গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে আমদানির মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়ার প্রবণতা কতটা টেকসই, তা নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ ব্যবধান কেবল অর্থের নয়; এটি দেশের জ্বালানিনীতির অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত পেট্রোবাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৭.৭৪ মিলিয়ন ডলার।
২০২৪ সালে ৮৬টি কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৩ হাজার ২২২.৩২ মিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডলারের বিনিময় হার ১০০ টাকা ধরে হিসাব করলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এ অর্থ গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এলএনজি আমদানির ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হওয়া ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ। আর গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর জন্য প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও শেষ পর্যন্ত এর ব্যয় প্রায় আড়াইগুণ বেশি হয়। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানির ভর্তুকিতে সরকারের কোষাগারে চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও এলএনজির জন্য ভর্তুকির মোট ৪২ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে প্রথম তিন মাসেই প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে জ্বালানি বিভাগ; অর্থাৎ পুরো বছরের বরাদ্দের প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থবছরের এক-চতুর্থাংশ সময়ের মধ্যেই ছাড় করতে হয়েছে সরকারকে।
তাই জ্বালানি তেল, গ্যাস বা বিদ্যুতের বাড়তি দামের বোঝা গ্রাহকদের জন্য চাপের হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরকারকে সরবরাহ ঠিক রাখতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরবরাহ সংকট ও স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতার কারণে রাষ্ট্রের আর্থিক দায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি করা এলএনজির গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রতি ঘনমিটারে ৪৬ টাকা ৪০ পয়সা।
বিপরীতে একই সময়ে দেশে গ্যাস বিক্রির গড় মূল্য ছিল ২৩ টাকা ৮০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটার এলএনজিভিত্তিক গ্যাসে গড়ে ২২ টাকা ৫০ পয়সার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। যা শেষ পর্যন্ত ভর্তুকির মাধ্যমে সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। আমদানিতে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করার পরও কেন গ্যাসের সংকট কাটছে না? কেন শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
আর কেনইবা আমদানির ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রকে বারবার ভর্তুকি ও বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে? এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশের গ্যাস খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে আসছে। তিতাস, বিবিয়ানা ও রশিদপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন ও চাপের অবনতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এক প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা জানতে পেরেছি, ২০২৫ সালের জুনে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছিল। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ঘনমিটারে আনুমানিক ৩ টাকা হলেও আমদানিকৃত এলএনজির ব্যয় ছিল প্রায় ৫৫ টাকা। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানিকৃত গ্যাসের ব্যয় বহুগুণ বেশি। এ ব্যবধানই রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনার আর্থিক চাপকে বাড়িয়ে তুলছে।
তবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে একেবারেই কোনো কার্যক্রম নেই— এমন দাবি করা সঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, পেট্রোবাংলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০টি এবং ২০২৬-২৮ সময়ে আরও ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া নতুন ড্রিলিং রিগ কেনার উদ্যোগের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব পরিকল্পনার বিপরীতে বাস্তবে কতটি কূপ খনন হয়েছে, কতটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, কতটুকু গ্যাস মজুত নিশ্চিত হয়েছে এবং সেখান থেকে উৎপাদন কবে শুরু হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা আর বাস্তবে গ্যাস উৎপাদন এক বিষয় নয়। অনুসন্ধানের ফলাফল, কূপের উৎপাদনক্ষমতা এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের সময়সীমা প্রকাশ না করা হলে এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন। এলএনজি আমদানির আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো ডলারের ওপর নির্ভরতা উল্লেখ করে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশীয় গ্যাসের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা সম্ভব হলেও আমদানিকৃত এলএনজির মূল্য পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। একই সময়ে টাকার অবমূল্যায়ন হলে ডলারে নির্ধারিত আমদানি ব্যয় মেটাতে আরও বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের ওঠানামা, টাকার অবমূল্যায়ন এবং খাতের বিভিন্ন অদক্ষতা পেট্রোবাংলার আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে চাপে ফেলেছে। বিদেশি সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি সমস্যার মুখে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভরতা একটি চক্র তৈরি করছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়ছে, আমদানিতে ডলারের চাহিদা বাড়ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ব্যয় আরও বাড়ছে, ভর্তুকি ও ঋণের প্রয়োজন বাড়ছে, শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় আমদানির ওপর নির্ভরতা যত বাড়বে, ততই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
আমদানিকৃত এলএনজির উচ্চমূল্য এবং ভোক্তা পর্যায়ে তুলনামূলক কম দামে গ্যাস সরবরাহের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বড় আর্থিক ব্যবধান। এ ব্যবধান পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের সংকট শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়, এটি এখন রাষ্ট্রের বাজেট ব্যবস্থাপনারও বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এলএনজি আমদানি বাড়লেও দেশের গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৫৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহ ছিল প্রায় ৮৯২ মিলিয়ন ঘনফুট। একই সময়ে গ্যাসের ঘাটতি ছিল দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ বৃদ্ধি করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট হচ্ছে না। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে দাবি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমত পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। তৃতীয়ত এলএনজি আমদানি, সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের সক্ষমতা সীমিত। চতুর্থত আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর থেকে বের হতে আমরা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। সফল অনুসন্ধানের মাধ্যমে পাওয়া গ্যাস দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক কম ব্যয়ে সরবরাহ করা সম্ভব।
তবে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার নিশ্চিত নয়। অনুসন্ধানে ব্যয় করেও বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস নাও পাওয়া যেতে পারে। এর জন্য এখনই আমাদের আমদানিনির্ভরতা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।






















