রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক সড়কে টানা ১৩ দিন ধরে অবরোধ চলছে। এতে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সাজেকের যোগাযোগব্যবস্থা। পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তীব্র হচ্ছে। কৃষিপণ্য পরিবহন করতে না পারায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরাও। অন্যদিকে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ সংকট নিরসনে এখনো কার্যকর কোনো সমাধান আসেনি। গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক সড়কে নতুন করে অবরোধ শুরু হয়।
এর আগে ১১ অক্টোবর থেকে টানা অবরোধের কারণে সাজেকে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ শিথিল করা হলেও ২২ অক্টোবর থেকে আবারও যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। দফায় দফায় অবরোধ ও শিথিলতার মধ্যেও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হয়নি। অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে বাঘাইছড়ি ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
ফলে বাইরে থেকে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা খাদ্যসংকটের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবরোধের কারণে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। একই সঙ্গে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাইরে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
এতে একদিকে খাদ্যসংকট বাড়ছে, অন্যদিকে পণ্য বিক্রি করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। অন্যদিকে, সাজেকের পর্যটন খাতেও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন ও রেস্তোরাঁসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন পর্যটক না আসায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও কর্মচারীরা। বাড়ছে ব্যবসায়ীদের লোকসানও। জিয়াউল হক যুবরাজ নামে এক রিসোর্ট ব্যবসায়ী বলেন, সাজেকের অবস্থা খুবই খারাপ। একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, অন্যদিকে খাবারের সংকট চলছে। সাজেকের প্রায় দেড় শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁয় পাঁচ শতাধিক কর্মচারী রয়েছেন।
এখন তাদের তিন বেলা খাবারের জোগান দেওয়াই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অবরোধকারী সংগঠনগুলো পাঁচ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এ কর্মসূচি পালন করছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকবে। ফলে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ না এলে সাজেকের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে সংকট নিরসনে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও এখনো কার্যকর কোনো সমাধান আসেনি।
গত ২৫ অক্টোবর রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উপস্থিতিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ২৬ অক্টোবর উজোবাজারে অনুষ্ঠিত জনসভা থেকেও কোনো সমঝোতা আসেনি। দাবি বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে আলোচনা কার্যত থমকে রয়েছে। এ বিষয়ে সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা বলেন, অবরোধের কারণে সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়রা কৃষিপণ্য পরিবহন করতে পারছেন না। এতে এলাকায় খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তবে এখনো আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। সাজেকের চলমান সংকট এখন আর শুধু রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি স্থানীয় মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, জীবিকা ও যোগাযোগের সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।






















