আজ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২৫%

ভূমিহীন সেলিম মিয়ার অনন্য উদ্যোগ: গড়ে তুলেছেন ভূমি গবেষণাগার

  • MIT ERP
  • Update Time : 09:56:47 pm, Tuesday, 3 November 2026
  • 12

ভূমিহীন সেলিম মিয়ার অনন্য উদ্যোগ: গড়ে তুলেছেন ভূমি গবেষণাগার

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

নিজের কোনো জমি নেই, নেই স্থায়ী বাসস্থানও। থাকেন ভাড়া বাসায়। অথচ ভূমিসংক্রান্ত নানা জটিলতা ভাবায় তাকে। কেন জমি নিয়ে বাড়ছে খুনোখুনি ও সংঘর্ষ? কেন ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নারীরা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ভূমিসংক্রান্ত হাজার হাজার সংবাদ সংগ্রহ করেছেন সেলিম মিয়া। সেসব সংবাদ কেটে ঘরের চার দেয়ালে সেঁটে গড়ে তুলেছেন ভূমি গবেষণাগার ও তথ্যভাণ্ডার। শুধু তথ্য সংগ্রহেই থেমে থাকেননি, ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ ও জটিলতা নিরসনে উদ্ভাবন করেছেন ডিজিটাল ভূমি কার্ড।

জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিক পাস সেলিম মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পার্শ্ববর্তী চর বিরহিমের সাতালস্কর গ্রামে। ১৯৯৫ সালে তিস্তার ভাঙনে ভিটেমাটি হারান তিনি। এরপর সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। জীবিকার তাগিদে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) চাকরি নেন। তবে বছরখানেক পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। পরে জীবিকার প্রয়োজনে মামলার এজাহার লেখার কাজ শুরু করেন।

এজাহার লিখতে গিয়ে সেলিমের চোখে পড়ে, অধিকাংশ মামলার নেপথ্যেই রয়েছে জমিসংক্রান্ত বিরোধ। বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। এরপর ভূমিসংক্রান্ত নানা জটিলতা ও বিরোধের কারণ অনুসন্ধান এবং সেগুলোর সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে গড়ে তোলেন নিজের ‘ভূমি গবেষণাগার’।

সেলিমের গবেষণাগারে দেখা যায়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সংঘর্ষে নিহত ও আহত হওয়া, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ সংগ্রহ করেছেন তিনি। এসব সংবাদ কেটে আঠা দিয়ে ঘরের চার দেয়ালে সেঁটে রেখেছেন।

এ ছাড়া স্ট্যাম্পের খরচ, ভূমি জরিপের ভুলত্রুটি, জাল দলিল তৈরি, ভূমি জবরদখল ও ভূমিদস্যুতা, ভূমি অফিসের অনিয়ম, সাবেক ছিটমহলের ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা, রেলওয়ের জমি দখল, আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, ভূমি অধিগ্রহণ এবং সাবরেজিস্ট্রি অফিসের নানা অনিয়মসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদ ও তথ্য সংরক্ষণ করেছেন তিনি।

সেলিমের সংরক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ বছরে দেশে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধে দুই হাজার ৪০২ জনের বেশি মানুষ খুন হয়েছেন। এর মধ্যে রংপুর বিভাগে ৪৭৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪৩৪, খুলনা বিভাগে ২৩৪, বরিশাল বিভাগে ১১৮, ঢাকা বিভাগে ৪০৮, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১৭, সিলেট বিভাগে ১৮৬ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩২৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।

তবে শুধু সমস্যার চিত্র তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি সেলিম। এসব বিরোধের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে তৈরি করেছেন ‘ডিজিটাল ভূমি কার্ড’।

সেলিম মিয়ার ভাষ্য, প্রত্যেক ভূমিমালিকের জন্য একটি করে ডিজিটাল কার্ড থাকবে। এতে জমির মালিকের মৃত্যুর তারিখ, মোট জমির পরিমাণ ও ওয়ারিশদের তালিকা সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি জমি কেনাবেচার হিসাব রাখার ব্যবস্থাও থাকবে। কেউ জমি কিনলে কার্ডে জমির পরিমাণ যোগ হবে, আর বিক্রি করলে বিয়োগ হবে।

তার মতে, সরকারিভাবে এ ধরনের কার্ড চালু করা গেলে কেউ আর অন্যের জমি থেকে তাকে বঞ্চিত করতে পারবে না। এতে ‘জোর যার, মুলুক তার’ কিংবা ‘লাঠি যার, জমি তার’ নীতি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাও কমে আসবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নাটোরের বাগাতিপাড়ায় ইজিবাইকের ধাক্কায় চা বিক্রেতার মৃত্যু

ভূমিহীন সেলিম মিয়ার অনন্য উদ্যোগ: গড়ে তুলেছেন ভূমি গবেষণাগার

Update Time : 09:56:47 pm, Tuesday, 3 November 2026

নিজের কোনো জমি নেই, নেই স্থায়ী বাসস্থানও। থাকেন ভাড়া বাসায়। অথচ ভূমিসংক্রান্ত নানা জটিলতা ভাবায় তাকে। কেন জমি নিয়ে বাড়ছে খুনোখুনি ও সংঘর্ষ? কেন ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নারীরা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ভূমিসংক্রান্ত হাজার হাজার সংবাদ সংগ্রহ করেছেন সেলিম মিয়া। সেসব সংবাদ কেটে ঘরের চার দেয়ালে সেঁটে গড়ে তুলেছেন ভূমি গবেষণাগার ও তথ্যভাণ্ডার। শুধু তথ্য সংগ্রহেই থেমে থাকেননি, ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ ও জটিলতা নিরসনে উদ্ভাবন করেছেন ডিজিটাল ভূমি কার্ড।

জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিক পাস সেলিম মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পার্শ্ববর্তী চর বিরহিমের সাতালস্কর গ্রামে। ১৯৯৫ সালে তিস্তার ভাঙনে ভিটেমাটি হারান তিনি। এরপর সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। জীবিকার তাগিদে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) চাকরি নেন। তবে বছরখানেক পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। পরে জীবিকার প্রয়োজনে মামলার এজাহার লেখার কাজ শুরু করেন।

এজাহার লিখতে গিয়ে সেলিমের চোখে পড়ে, অধিকাংশ মামলার নেপথ্যেই রয়েছে জমিসংক্রান্ত বিরোধ। বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। এরপর ভূমিসংক্রান্ত নানা জটিলতা ও বিরোধের কারণ অনুসন্ধান এবং সেগুলোর সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে গড়ে তোলেন নিজের ‘ভূমি গবেষণাগার’।

সেলিমের গবেষণাগারে দেখা যায়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সংঘর্ষে নিহত ও আহত হওয়া, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ সংগ্রহ করেছেন তিনি। এসব সংবাদ কেটে আঠা দিয়ে ঘরের চার দেয়ালে সেঁটে রেখেছেন।

এ ছাড়া স্ট্যাম্পের খরচ, ভূমি জরিপের ভুলত্রুটি, জাল দলিল তৈরি, ভূমি জবরদখল ও ভূমিদস্যুতা, ভূমি অফিসের অনিয়ম, সাবেক ছিটমহলের ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা, রেলওয়ের জমি দখল, আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, ভূমি অধিগ্রহণ এবং সাবরেজিস্ট্রি অফিসের নানা অনিয়মসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদ ও তথ্য সংরক্ষণ করেছেন তিনি।

সেলিমের সংরক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ বছরে দেশে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধে দুই হাজার ৪০২ জনের বেশি মানুষ খুন হয়েছেন। এর মধ্যে রংপুর বিভাগে ৪৭৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪৩৪, খুলনা বিভাগে ২৩৪, বরিশাল বিভাগে ১১৮, ঢাকা বিভাগে ৪০৮, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১৭, সিলেট বিভাগে ১৮৬ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩২৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।

তবে শুধু সমস্যার চিত্র তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি সেলিম। এসব বিরোধের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে তৈরি করেছেন ‘ডিজিটাল ভূমি কার্ড’।

সেলিম মিয়ার ভাষ্য, প্রত্যেক ভূমিমালিকের জন্য একটি করে ডিজিটাল কার্ড থাকবে। এতে জমির মালিকের মৃত্যুর তারিখ, মোট জমির পরিমাণ ও ওয়ারিশদের তালিকা সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি জমি কেনাবেচার হিসাব রাখার ব্যবস্থাও থাকবে। কেউ জমি কিনলে কার্ডে জমির পরিমাণ যোগ হবে, আর বিক্রি করলে বিয়োগ হবে।

তার মতে, সরকারিভাবে এ ধরনের কার্ড চালু করা গেলে কেউ আর অন্যের জমি থেকে তাকে বঞ্চিত করতে পারবে না। এতে ‘জোর যার, মুলুক তার’ কিংবা ‘লাঠি যার, জমি তার’ নীতি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাও কমে আসবে।