যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভোটের মুখোমুখি হয়েছেন ভোটাররা। তবে এ নির্বাচনে হোয়াইট হাউসের নতুন বাসিন্দা বেছে নেওয়া হয় না। বরং নির্ধারিত হয়, প্রেসিডেন্ট তার বাকি মেয়াদে কতটা সহজে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
চার বছর মেয়াদি প্রেসিডেন্টের শাসনকালের মাঝপথে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনই পরিচিত মধ্যবর্তী নির্বাচন বা ‘মিডটার্ম ইলেকশন’ নামে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এতে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়বে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এবং বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।
নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে, ট্রাম্পের প্রশাসন আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নে কতটা সুবিধা পাবে। মধ্যবর্তী নির্বাচন কী? যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দুই বছর পরপর কংগ্রেসের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। এ কারণে প্রতি দুই বছর পরপর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়।
কংগ্রেসের প্রধান দায়িত্ব হলো আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করা। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নীতি বাস্তবায়নের সুযোগেও পরিবর্তন আসতে পারে। কোন কোন পদে নির্বাচন হবে? এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে, সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ভোট হবে ৩৫টিতে। একই দিনে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নরসহ স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনও বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে। নির্বাচনে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে এবারের নির্বাচনে অর্থনীতি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন অনেক মার্কিন নাগরিক।
মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্কনীতিও নির্বাচনি বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, শুল্ক আরোপের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের ব্যয়ভার আরও ভারী হয়েছে। অন্যদিকে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন বলে দাবি রিপাবলিকানদের।
তবে এসব অভিযানের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও নির্বাচনি আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই দলের অনেক নেতা এআইয়ের বিকাশ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের পক্ষে থাকলেও এ বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কেন গুরুত্বপূর্ণ? বর্তমানে কংগ্রেসের দুই কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে।
প্রতিনিধি পরিষদে দলটির আসন ২১৮টি এবং সিনেটে ৫৩টি। তবে বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যবধান কম হওয়ায় নির্বাচনে সামান্য পরিবর্তনও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে তার প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও বাড়বে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে শুনানি আয়োজন, কর্মকর্তাদের তলব এবং সরকারি নথিপত্র চাওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারবেন। অন্যদিকে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে বাড়তি বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। তবে রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ তুলনামূলক সহজ হবে।
আইন পাস এবং প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি নিজ দলের সমর্থন পাবেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের নাম ব্যালটে না থাকলেও ফলাফলকে তার নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি জনগণের সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক হিসেবে দেখা হয়। সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল এ নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষের মুখে পড়তে পারে।
এবারের নির্বাচনের ফলাফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরেও রাজনৈতিক হিসাবনিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, ট্রাম্প তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারবেন না। ফলে তার উত্তরসূরি হিসেবে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হতে পারে। একইভাবে, ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং আগামী নির্বাচনের কৌশল নিয়েও আলোচনা শুরু হতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো ফল দলটির নেতাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে, আর প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল নতুন নেতৃত্ব ও কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। সব মিলিয়ে, মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন বণ্টনের লড়াই নয়; এটি ট্রাম্পের প্রশাসনের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, তার নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে দুই দলের প্রস্তুতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।






















