গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ, জাল স্বাক্ষরে চেক নগদায়ন, ভুয়া ঋণ সৃষ্টিসহ মোট ১৯টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ১৭টিই বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। উঠে এসেছে প্রায় ২৪ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের চরম সত্য।
অথচ এত বড় অপরাধের পরও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে কেবল ‘দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের’ মতো নামমাত্র লঘুদণ্ড। শাস্তির এমন বহর দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে বছরের পর বছর ঘুরেও আত্মসাৎ হওয়া আমানতের টাকা ফেরত পাননি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকেরা। চৌদ্দগ্রামের সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার জের কাটতে না কাটতেই এবার ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নতুন করে আরও কয়েকজন গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
ঘটনাটি আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম শাখার। অভিযুক্ত কর্মকর্তা সরওয়ার আলম তালুকদার বর্তমানে ব্যাংকটির কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ে কর্মরত। তিনি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাশিনগর ইউনিয়নের বারৈয়া গ্রামের বাসিন্দা। আগের গম্ভীর অপরাধের কঠোর শাস্তি না হওয়ায় নতুন করে একের পর এক অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৯ জুন পর্যন্ত চৌদ্দগ্রাম শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন সরওয়ার আলম তালুকদার। দায়িত্বে থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রাহকের আমানতের টাকা মারার পাশাপাশি, স্বজনদের নামে নীতিমালা ভেঙে ঋণ বিতরণ ও ঋণের জামানতি চেকে জালিয়াতির মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ তদন্তে ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে সরওয়ার আলম তালুকদার এবং তাঁর সহযোগী অপর দুই কর্মকর্তা—আবদুল জলিল ও আবুল কালামের বিরুদ্ধে মোট ২৩ লাখ ৯২ হাজার ২৩৪ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মেলে। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সহকারী ব্যবস্থাপক মো. আবদুর রহিম শিকদারের স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, চাকরি প্রবিধানমালা ২০০৫ অনুযায়ী এটি দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ, তছরুপ ও প্রতারণামূলক অপরাধ।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ‘ক্ষমা প্রার্থনা, লিখিত জবাব ও চাকরির বয়স’ বিবেচনায় নিয়ে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার দোহাই দিয়ে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। এর ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রাপ্য দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা হয় মাত্র। নথি ঘেঁটে জানা যায়, ২০২২ সালের ৩ মার্চ সরওয়ারের বিরুদ্ধে আমানত আত্মসাৎ ও জালিয়াতির ১৯টি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে আনা হয়।
তদন্তে প্রকাশ পায়, অধীনস্থ কর্মকর্তার কাছ থেকে জোরপূর্বক চেক নিয়ে স্বাক্ষর জাল করে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৬৬ টাকা তুলে নেন সরওয়ার। আমানতকারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয় ৯ লাখ ৮ হাজার ৩০০ টাকা। এছাড়া এসডিপিএসের রসিদ বদলে ২৫ হাজার টাকা, ঋণ পরিশোধের ২ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ টাকা এবং ভুয়া স্বাক্ষরে দুই লাখ টাকার ঋণ দেখিয়ে পুরোটাই পকেটে ভরেন তিনি।
নগদ জমা ছাড়া কাল্পনিক লেনদেন দেখিয়ে আরও ৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পুরোনো অপরাধের দায় কম সাজায় পার পাওয়ার মধ্যেই চলতি বছরের ২৫ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে আরও তিন গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগকারী পারভীন আক্তার, পারভীন বেগম ও আবুল খায়েরের মোট ৭৬ হাজার টাকার বেশি আমানতের হদিস মিলছে না।
চৌদ্দগ্রাম শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক নাছির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, সাবেক ব্যবস্থাপকের সময়ে এসডিপিএসের টাকা আত্মসাৎ হয়েছে দাবি করে চারজন গ্রাহক তাঁর কাছে সম্প্রতি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী সোলেমান আহমেদ জানান, ২০২১ সালে ঋণ নেওয়ার সময় জামানত দেওয়া চেক ব্যবহার করে তাঁর অজান্তে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়।
ব্যাংকে অভিযোগ করে তদন্তে প্রমাণ মিললেও অতিরিক্ত ঋণের বোঝা এখনো টানতে হচ্ছে তাঁকে। উল্টো প্রতিবাদ করায় প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে থানায় জিডি পর্যন্ত করতে হয়েছে তাঁকে। আরেক ভুক্তভোগী রহিমা বেগম জানান, তিনি ও তাঁর প্রয়াত স্বামী পৃথক হিসাবে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে তুলে নেওয়া হয় অতিরিক্ত চার লাখ ৩০ হাজার টাকা।
২০২৪ সালের জুনে স্বামী মারা গেলেও সেই জালিয়াতির ঋণের দায় মেটাতে হচ্ছে বিধবা রহিমা বেগমকে। প্রবাসী শফিউল আজম ও গ্রাহক আবুল খায়েরের গল্পটাও একই রকম—আমানত তুলে নিতে গিয়ে দেখেছেন জমার খাতায় বড় ফাঁকি। ব্যাংকটির কুমিল্লা অঞ্চলের আবাসিক ব্যবস্থাপক (আরএমও) জামাল উদ্দিনের দাবি, নতুন অভিযোগ এখনও তাঁর হাতে পৌঁছায়নি, পেলে ব্যবস্থা নেবেন।
আর ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন জানান, তিনি সবেমাত্র যোগ দিয়েছেন, খোঁজ নিয়ে বক্তব্য দেবেন। নিজের পক্ষে সওয়াল করে অভিযুক্ত সাবেক ব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম তালুকদার নতুন সব অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ দাবি করেছেন। আর আগের লঘুদণ্ডের বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করেছেন বলে জানান। বিভাগীয় শাস্তি, জালিয়াতি এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার সম্পূর্ণ পৃথক বিষয় হলেও ব্যাংকের দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন এত হালকা সাজা দেওয়া হলো—সচেতন মহলের এখন একটাই প্রশ্ন। জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঋণের দায় মুক্তি এবং আত্মসাৎ হওয়া আমানত ফেরত দিতে ব্যাংক কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।





















