মালয়েশিয়ায় কাজ করতে যাওয়া হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিকের কাছে মাস শেষে বেতন পাওয়ার অর্থ শুধু নিজের খরচ চালানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশে থাকা পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, ঋণের কিস্তি পরিশোধ, সন্তানের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু টাকা জমিয়ে রাখার স্বপ্ন।
কিন্তু সেই হিসাবের খাতায় নতুন একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের (ইপিএফ) চাঁদা। নিয়ম অনুযায়ী, কর্মীর মাসিক বেতনের ২ শতাংশ এবং নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে আরও ২ শতাংশ জমা হবে এই তহবিলে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের বেতন থেকে এই নিয়ম কার্যকর হয়েছে। ফলে মালয়েশিয়ায় কর্মরত যোগ্য বিদেশি কর্মীদের বেতন ও সঞ্চয়ের হিসাবেও এসেছে পরিবর্তন।
তবে এটি সাধারণ আয়কর নয়; বরং অবসরকালীন সঞ্চয়ব্যবস্থা। কর্মীর বেতন থেকে কেটে নেওয়া অর্থ তার ইপিএফ হিসাবে জমা হওয়ার কথা। অন্যদিকে, নিয়োগকর্তাকেও নির্ধারিত হারে অর্থ জমা দিতে হবে। গৃহকর্মীরা এই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। ট্যাক্স নয়, ভবিষ্যতের সঞ্চয় ইপিএফকে অনেকে অতিরিক্ত কর বা ট্যাক্স হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু এর উদ্দেশ্য ভিন্ন।
এটি এমন একটি সঞ্চয় তহবিল, যেখানে কর্মী ও নিয়োগকর্তার জমা করা অর্থ ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে। নতুন নীতিতে বিদেশি কর্মীদেরও বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের আওতায় আনা হয়েছে। এতে একদিকে কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে মাসিক আয় থেকে কিছু অর্থ কম হাতে আসছে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, তাদের অনেকেই সীমিত বেতনে কাজ করেন। মাসের শুরুতেই খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, ঋণের কিস্তি এবং পরিবারের খরচের হিসাব করতে হয়। এসব ব্যয় মেটানোর পর যে অর্থ দেশে পাঠানো হয়, তার ওপর নির্ভর করেন পরিবারের সদস্যরা। ফলে বেতনের একটি অংশ সঞ্চয়ে জমা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বাজেটে চাপ তৈরি হতে পারে। মাসে কত টাকা কমবে হাতে? প্রভাবটি বোঝার জন্য একটি সহজ হিসাব করা যাক।
মালয়েশিয়ায় কোনো কর্মীর মাসিক বেতন ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত হলে তার ২ শতাংশ চাঁদা হবে ৩৪ রিঙ্গিত। অর্থাৎ, অন্য কোনো পরিবর্তন না থাকলে হাতে পাওয়া বেতন ৩৪ রিঙ্গিত কমবে। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তাকে ওই কর্মীর ইপিএফ হিসাবে আরও ৩৪ রিঙ্গিত জমা দিতে হবে। ফলে প্রতি মাসে কর্মীর নামে মোট ৬৮ রিঙ্গিত জমা হবে। একইভাবে, মাসিক বেতন ২ হাজার রিঙ্গিত হলে কর্মীর অংশ হবে ৪০ রিঙ্গিত এবং নিয়োগকর্তার অংশও ৪০ রিঙ্গিত।
সে ক্ষেত্রে প্রতি মাসে মোট ৮০ রিঙ্গিত জমা হবে কর্মীর ইপিএফ হিসাবে। তবে এই হিসাব নির্ধারিত বেতনের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। প্রযোজ্য নিয়ম, বেতনের ধরন ও অন্যান্য কর্তনের কারণে প্রকৃত হিসাব ভিন্ন হতে পারে। একজন শ্রমিকের কাছে ৩৪ বা ৪০ রিঙ্গিত খুব বড় অঙ্ক মনে না হলেও মাস শেষে প্রতিটি রিঙ্গিতের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে যারা বিদেশে যাওয়ার ঋণ শোধ করছেন কিংবা দেশে পরিবারের নিয়মিত ব্যয় বহন করছেন, তাদের জন্য এই অর্থের কর্তন নতুন করে বাজেট সাজানোর প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
দেশে টাকা পাঠানোর হিসাবেও পরিবর্তন মালয়েশিয়ায় কর্মরত অনেক বাংলাদেশির প্রধান লক্ষ্য দেশে নিয়মিত টাকা পাঠানো। কেউ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় চালান, কেউ জমি কেনেন, কেউ ঘর নির্মাণ করেন, আবার কেউ বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করেন। তাদের কাছে বেতনের একটি অংশ কেটে নেওয়া মানে দেশে পাঠানোর অর্থ কমে যাওয়ার আশঙ্কা। বিশেষ করে যাদের বেতন কম এবং পরিবারের ওপর নির্ভরশীল সদস্য বেশি, তাদের জন্য এই পরিবর্তন সামলানো কঠিন হতে পারে।
মাসে সামান্য কম টাকা পাঠালেও পরিবারের ব্যয়, ঋণের কিস্তি কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে প্রভাব এক রকম হবে না। বেতন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও পারিবারিক দায়িত্বের ওপর এর মাত্রা নির্ভর করবে। অন্যদিকে, ইপিএফে জমা হওয়া অর্থ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন প্রবাসে কাজ করার পর দেশে ফিরে অনেক শ্রমিক পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকার সমস্যায় পড়েন।
পরিবারের ব্যয়, অসুস্থতা কিংবা আকস্মিক বিপদে তাদের উপার্জনের বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। বাধ্যতামূলক সঞ্চয় তাদের জন্য কিছু অর্থ জমিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সঞ্চয়ের সুফল পেতে জানতে হবে নিয়ম ইপিএফে অর্থ জমা হলেই কর্মী যেকোনো সময় তা তুলে নিতে পারবেন, এমন ধারণা ঠিক নয়। কখন, কীভাবে এবং কোন শর্তে অর্থ উত্তোলন করা যাবে, তা সংশ্লিষ্ট নিয়মের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার কর্মসংস্থান ছেড়ে দেশে ফিরে গেলে কীভাবে জমা অর্থ দাবি করতে হবে, সে বিষয়ে কর্মীদের পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। এ ছাড়া ২ শতাংশ হারে জমা হওয়া অর্থ একজন শ্রমিকের অবসরকালীন প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট হবে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। স্বল্প বেতনের কর্মীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে।
তাই ইপিএফকে আর্থিক নিরাপত্তার সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত, ভবিষ্যতের সব প্রয়োজন পূরণের নিশ্চয়তা হিসেবে নয়। নিয়োগকর্তার দায়িত্ব, কর্মীর সতর্কতা এই ব্যবস্থার সুফল নিশ্চিত করতে নিয়োগকর্তার দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত হারে চাঁদা জমা হচ্ছে কি না, কর্মীর হিসাব সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না এবং বেতন থেকে কেটে নেওয়া অর্থ যথাযথভাবে জমা পড়ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশি কর্মীদেরও বেতনপত্র সংরক্ষণ, ইপিএফ হিসাবের তথ্য যাচাই এবং কর্তনের সঙ্গে জমার হিসাব মিলিয়ে দেখা উচিত। কোনো নিয়োগকর্তা ইপিএফের নামে টাকা কেটে জমা না দিলে কিংবা হিসাবের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। বিদেশ যাওয়ার আগে এবং কর্মরত অবস্থায় এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা থাকলে বিভ্রান্তি ও আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি কমবে।
মালয়েশিয়ায় ইপিএফের ২ শতাংশ চাঁদা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য একদিকে মাসিক আয়ের ওপর চাপ, অন্যদিকে ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের সুযোগ। কম বেতনের কর্মীদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে দেশে পাঠানো অর্থ কমতে পারে। আবার নিয়ম মেনে অর্থ জমা হলে দীর্ঘমেয়াদে তা আর্থিক নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবাসে একজন শ্রমিকের প্রতিটি দিনের পরিশ্রমের পেছনে থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার আকাক্সক্ষা।
তাই তার বেতনের প্রতিটি রিঙ্গিতের হিসাব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই অর্থের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। মালয়েশিয়ার ইপিএফ ব্যবস্থা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সঞ্চয়ের স্বচ্ছতা, অর্থ উত্তোলনের সুযোগ এবং শ্রমিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকছে তার ওপর।





















