আজ রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
১০ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৪°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

দেশ ছেড়ে বিদেশমুখী রোগীরা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:03:44 pm, Sunday, 25 October 2026
  • 12

দেশ ছেড়ে বিদেশমুখী রোগীরা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

তাসনুভা অন্তরা। দেশের একটি স্বনামধন্য গণমাধ্যমে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে এলার্জিজনিত রোগে ভুগছেন। দেশে বিভিন্ন ডাক্তার দেখালেও কোনো সমাধান না পেয়ে চলতি মাসের ১৭ তারিখ যান থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে।

সেখানকার একটি হাসপাতালে বাংলাদেশি প্রায় ৬২ হাজার টাকা খরচে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানতে পারেন বাংলাদেশের চিকিৎসকরা যা বলেছেন তাই তার রোগের সমাধান। কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, শুধু দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর অনাস্থার কারণে এত টাকা খরচ হলো। আমাদের চিকিৎসকরা যদি তাদের মতো এত আন্তরিক হতো। তাহলে কাউকে বিদেশে আসতে হতো না চিকিৎসার জন্য।

একই রকম আক্ষেপ করেন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত শফিকুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে কোমড়ের ব্যথায় ভুগছেন। দেশে বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েও কোনো সমাধান না পেয়ে আসেন ব্যাংককে ডাক্তার দেখাতে। সব রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে তার মোট ব্যয় হয় বাংলাদেশি টাকায় ২ লাখ টাকা। কিন্তু তবুও চিকিৎসক স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারেননি। কিছু ব্যায়াম আর ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বলেছেন ব্যথা হলে এগুলো সেবন করতে।

দেশের চিকিৎসকরাও ঠিক একই রকম কথা বলেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকরা বিশ্বের যেকোনো দেশের চিকিৎসকের তুলনায় মেধায় কম নয়। কিন্তু তবুও শুধু আস্থাহীনতার কারণে মানুষ বিদেশে এসে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে চিকিৎসার পেছনে। এই কাড়ি কাড়ি টাকার অর্থমূল্য বছরে প্রায় ৫ বিলিয়নের বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর উন্নত চিকিৎসার আশায় থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান বহু রোগী।

হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, নিউরোলজি, অর্থোপেডিকস থেকে শুরু করে নানা ধরনের রোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য তাদের একটি অংশ বেছে নেন থাইল্যান্ডের হাসপাতালগুলো। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের বিমানভাড়া, হোটেল, খাবার, যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের ব্যয়ও বহন করতে হয়। থাই দূতাবাসের এক হিসাবে জানা যায়, বছরে প্রায় ৬৫ হাজার বাংলাদেশি থাইল্যান্ড যায়।

যাদের বেশির ভাগই যায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। অল্পকিছু পরিমাণ মানুষ ঘুরতে গেলেও তারাও সুযোগ পেলেই একবার সেখানকার ডাক্তার দেখান। এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে দেশটিতে বাংলাদেশিদের চিকিৎসা খাতে ডিজিটাল ব্যয় বেড়েছে ২০ শতাংশ। বিশেষায়িত চিকিৎসার ঘাটতি, রোগ নির্ণয় নিয়ে সংশয় ও সেবার মান নিয়ে অনাস্থাই এই বিদেশমুখিতার কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল, চিকিৎসক এবং আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর প্রবণতা কমছে না। বরং প্রতিবেশী ভারত ছাড়াও থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে চিকিৎসা নিতে আগ্রহ বাড়ছে অনেক বাংলাদেশির। তাদের মধ্যে রয়েছেন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগী, অস্ত্রোপচারপ্রত্যাশী, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যাওয়া ব্যক্তি এবং উন্নত চিকিৎসার নিশ্চয়তা খুঁজছেন এমন পরিবার।

থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে এই প্রবণতার একটি সাম্প্রতিক চিত্র উঠে এসেছে দেশটির ঢাকাস্থ দূতাবাসের তথ্যে। ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত থিতিপর্ন চিরাসাওয়াদি জানান, দূতাবাসে প্রতি মাসে প্রায় ৯ হাজার ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করা হয়, যার প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসাসংক্রান্ত। এ হিসাবের ভিত্তিতে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার বাংলাদেশির থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার অনুমান তুলে ধরা হয়।

এই রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, স্থানীয় পরিবহন, চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগীর সঙ্গে যাওয়া স্বজনদের খরচ। ফলে চিকিৎসার জন্য বিদেশযাত্রা একদিকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সঞ্চয়ের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিদেশে চিকিৎসায় বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশিরা প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যায় এবং তা দেশের ভারসাম্য লেনদেনে চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সংশ্লিষ্ট এক আলোচনায় ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিদেশে চিকিৎসাব্যয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই দুই হিসাবের পার্থক্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে— বিদেশে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত সরকারি হিসাব কি রয়েছে?

বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা নির্ধারণেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। কেউ চিকিৎসা ভিসায় যান, কেউ পর্যটক ভিসায় গিয়ে চিকিৎসা নেন। ফলে শুধু চিকিৎসা ভিসার তথ্য দিয়ে প্রকৃত রোগীসংখ্যা কিংবা মোট ব্যয় নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে সামগ্রিক ব্যয়ের এই হিসাবকে শুধু থাইল্যান্ডের ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য দেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের ব্যয়ও এর অন্তর্ভুক্ত।

থাইল্যান্ডে বছরে ঠিক কত টাকা খরচ হচ্ছে, তা নির্ধারণে দেশভিত্তিক রোগীসংখ্যা, হাসপাতালের বিল, চিকিৎসাসংক্রান্ত বৈদেশিক লেনদেন এবং ভ্রমণব্যয়ের সমন্বিত তথ্য প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের চিকিৎসাব্যয়ের প্রবণতা বোঝার আরেকটি সূত্র পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভিসার বিশ্লেষণে। কেন থাইল্যান্ডমুখী হচ্ছেন রোগীরা : চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পেছনে শুধু উন্নত প্রযুক্তি নয়, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসকদের দক্ষতা, রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার মান, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা এবং রোগীর প্রতি আচরণ— এসব বিষয় রোগী ও পরিবারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং বিশেষায়িত সেবার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়।

দেশে অনেক ধরনের জটিল রোগের চিকিৎসা সম্ভব হলেও সব প্রতিষ্ঠানে একই মানের বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তি, নিবিড় পরিচর্যা, সমন্বিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বহুমাত্রিক চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামত প্রয়োজন হলে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে হলে সেবার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ছাড়া রোগ নির্ণয় নিয়ে সংশয়, একই রোগের জন্য একাধিক পরীক্ষা, চিকিৎসা ব্যয়ের অনিশ্চয়তা এবং হাসপাতালের বিল নিয়ে রোগী ও স্বজনদের উদ্বেগ বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

দেশে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান : বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে শুধু রোগীদের দেশেই চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা যথেষ্ট নয়। বরং কোন ধরনের চিকিৎসার জন্য রোগীরা সবচেয়ে বেশি বিদেশে যাচ্ছেন, কোন রোগের ক্ষেত্রে দেশে বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে এবং কোথায় রোগীদের আস্থার সংকট বেশি— তা চিহ্নিত করতে হবে উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমত, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও বিভাগগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

দ্বিতীয়ত, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাগারগুলোর মান নিশ্চিত করা, চিকিৎসার ফল নিয়মিত মূল্যায়ন এবং হাসপাতালের ব্যয় সম্পর্কে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তৃতীয়ত, চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তি, রোগীর অধিকার সুরক্ষা এবং চিকিৎসাসেবার মান তদারকিতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং হাসপাতালগুলোর তথ্য সমন্বয় করা গেলে রোগীর সংখ্যা, গন্তব্য, চিকিৎসার ধরন ও ব্যয়ের বাস্তব চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। নইলে দেশের টাকা বিদেশে এভাবে চলে যাবে এটাই স্বাভাবিক বলে আমাদের ধরে নিতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

দেশ ছেড়ে বিদেশমুখী রোগীরা

Update Time : 10:03:44 pm, Sunday, 25 October 2026

তাসনুভা অন্তরা। দেশের একটি স্বনামধন্য গণমাধ্যমে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে এলার্জিজনিত রোগে ভুগছেন। দেশে বিভিন্ন ডাক্তার দেখালেও কোনো সমাধান না পেয়ে চলতি মাসের ১৭ তারিখ যান থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে।

সেখানকার একটি হাসপাতালে বাংলাদেশি প্রায় ৬২ হাজার টাকা খরচে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানতে পারেন বাংলাদেশের চিকিৎসকরা যা বলেছেন তাই তার রোগের সমাধান। কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, শুধু দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর অনাস্থার কারণে এত টাকা খরচ হলো। আমাদের চিকিৎসকরা যদি তাদের মতো এত আন্তরিক হতো। তাহলে কাউকে বিদেশে আসতে হতো না চিকিৎসার জন্য।

একই রকম আক্ষেপ করেন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত শফিকুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে কোমড়ের ব্যথায় ভুগছেন। দেশে বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েও কোনো সমাধান না পেয়ে আসেন ব্যাংককে ডাক্তার দেখাতে। সব রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে তার মোট ব্যয় হয় বাংলাদেশি টাকায় ২ লাখ টাকা। কিন্তু তবুও চিকিৎসক স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারেননি। কিছু ব্যায়াম আর ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বলেছেন ব্যথা হলে এগুলো সেবন করতে।

দেশের চিকিৎসকরাও ঠিক একই রকম কথা বলেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকরা বিশ্বের যেকোনো দেশের চিকিৎসকের তুলনায় মেধায় কম নয়। কিন্তু তবুও শুধু আস্থাহীনতার কারণে মানুষ বিদেশে এসে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে চিকিৎসার পেছনে। এই কাড়ি কাড়ি টাকার অর্থমূল্য বছরে প্রায় ৫ বিলিয়নের বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর উন্নত চিকিৎসার আশায় থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান বহু রোগী।

হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, নিউরোলজি, অর্থোপেডিকস থেকে শুরু করে নানা ধরনের রোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য তাদের একটি অংশ বেছে নেন থাইল্যান্ডের হাসপাতালগুলো। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের বিমানভাড়া, হোটেল, খাবার, যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের ব্যয়ও বহন করতে হয়। থাই দূতাবাসের এক হিসাবে জানা যায়, বছরে প্রায় ৬৫ হাজার বাংলাদেশি থাইল্যান্ড যায়।

যাদের বেশির ভাগই যায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। অল্পকিছু পরিমাণ মানুষ ঘুরতে গেলেও তারাও সুযোগ পেলেই একবার সেখানকার ডাক্তার দেখান। এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে দেশটিতে বাংলাদেশিদের চিকিৎসা খাতে ডিজিটাল ব্যয় বেড়েছে ২০ শতাংশ। বিশেষায়িত চিকিৎসার ঘাটতি, রোগ নির্ণয় নিয়ে সংশয় ও সেবার মান নিয়ে অনাস্থাই এই বিদেশমুখিতার কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল, চিকিৎসক এবং আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর প্রবণতা কমছে না। বরং প্রতিবেশী ভারত ছাড়াও থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে চিকিৎসা নিতে আগ্রহ বাড়ছে অনেক বাংলাদেশির। তাদের মধ্যে রয়েছেন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগী, অস্ত্রোপচারপ্রত্যাশী, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যাওয়া ব্যক্তি এবং উন্নত চিকিৎসার নিশ্চয়তা খুঁজছেন এমন পরিবার।

থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে এই প্রবণতার একটি সাম্প্রতিক চিত্র উঠে এসেছে দেশটির ঢাকাস্থ দূতাবাসের তথ্যে। ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত থিতিপর্ন চিরাসাওয়াদি জানান, দূতাবাসে প্রতি মাসে প্রায় ৯ হাজার ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করা হয়, যার প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসাসংক্রান্ত। এ হিসাবের ভিত্তিতে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার বাংলাদেশির থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার অনুমান তুলে ধরা হয়।

এই রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, স্থানীয় পরিবহন, চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগীর সঙ্গে যাওয়া স্বজনদের খরচ। ফলে চিকিৎসার জন্য বিদেশযাত্রা একদিকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সঞ্চয়ের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিদেশে চিকিৎসায় বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশিরা প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যায় এবং তা দেশের ভারসাম্য লেনদেনে চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সংশ্লিষ্ট এক আলোচনায় ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিদেশে চিকিৎসাব্যয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই দুই হিসাবের পার্থক্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে— বিদেশে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত সরকারি হিসাব কি রয়েছে?

বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা নির্ধারণেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। কেউ চিকিৎসা ভিসায় যান, কেউ পর্যটক ভিসায় গিয়ে চিকিৎসা নেন। ফলে শুধু চিকিৎসা ভিসার তথ্য দিয়ে প্রকৃত রোগীসংখ্যা কিংবা মোট ব্যয় নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে সামগ্রিক ব্যয়ের এই হিসাবকে শুধু থাইল্যান্ডের ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য দেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের ব্যয়ও এর অন্তর্ভুক্ত।

থাইল্যান্ডে বছরে ঠিক কত টাকা খরচ হচ্ছে, তা নির্ধারণে দেশভিত্তিক রোগীসংখ্যা, হাসপাতালের বিল, চিকিৎসাসংক্রান্ত বৈদেশিক লেনদেন এবং ভ্রমণব্যয়ের সমন্বিত তথ্য প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের চিকিৎসাব্যয়ের প্রবণতা বোঝার আরেকটি সূত্র পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভিসার বিশ্লেষণে। কেন থাইল্যান্ডমুখী হচ্ছেন রোগীরা : চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পেছনে শুধু উন্নত প্রযুক্তি নয়, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসকদের দক্ষতা, রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার মান, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা এবং রোগীর প্রতি আচরণ— এসব বিষয় রোগী ও পরিবারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং বিশেষায়িত সেবার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়।

দেশে অনেক ধরনের জটিল রোগের চিকিৎসা সম্ভব হলেও সব প্রতিষ্ঠানে একই মানের বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তি, নিবিড় পরিচর্যা, সমন্বিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বহুমাত্রিক চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামত প্রয়োজন হলে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে হলে সেবার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ছাড়া রোগ নির্ণয় নিয়ে সংশয়, একই রোগের জন্য একাধিক পরীক্ষা, চিকিৎসা ব্যয়ের অনিশ্চয়তা এবং হাসপাতালের বিল নিয়ে রোগী ও স্বজনদের উদ্বেগ বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

দেশে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান : বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে শুধু রোগীদের দেশেই চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা যথেষ্ট নয়। বরং কোন ধরনের চিকিৎসার জন্য রোগীরা সবচেয়ে বেশি বিদেশে যাচ্ছেন, কোন রোগের ক্ষেত্রে দেশে বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে এবং কোথায় রোগীদের আস্থার সংকট বেশি— তা চিহ্নিত করতে হবে উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমত, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও বিভাগগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

দ্বিতীয়ত, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাগারগুলোর মান নিশ্চিত করা, চিকিৎসার ফল নিয়মিত মূল্যায়ন এবং হাসপাতালের ব্যয় সম্পর্কে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তৃতীয়ত, চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তি, রোগীর অধিকার সুরক্ষা এবং চিকিৎসাসেবার মান তদারকিতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং হাসপাতালগুলোর তথ্য সমন্বয় করা গেলে রোগীর সংখ্যা, গন্তব্য, চিকিৎসার ধরন ও ব্যয়ের বাস্তব চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। নইলে দেশের টাকা বিদেশে এভাবে চলে যাবে এটাই স্বাভাবিক বলে আমাদের ধরে নিতে হবে।