বড়দের কবিতায় যিনি এঁকেছেন স্বদেশ, প্রেম আর মানুষের জীবন, ছোটদের জন্য সেই কবিই খুলে দিয়েছিলেন কল্পনার এক রঙিন দরজা। ছড়ার ছন্দে, শব্দের খেলায় আর শিশুমনের বিস্ময়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শিশু-কিশোরদেরও আপন কবি।
একটি শিশু ট্রেন দেখছে। ছুটে চলা ট্রেনটি ঘিরে তার মনে জাগছে কত প্রশ্ন, কত কৌতূহল! ট্রেন কোথায় যায়, কোথা থেকে আসে, তার গন্তব্যই-বা কোথায়Ñ শিশুমনের এমন সহজ অথচ বিস্ময়ভরা ভাবনাই যেন কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে। শামসুর রাহমানের ‘ট্রেন’ কবিতার কথা মনে পড়লে এমনই এক শিশুজগতের ছবি ভেসে ওঠে। যে জগতে সামান্য একটি দৃশ্যও হয়ে উঠতে পারে আনন্দের, বিস্ময়ের কিংবা কল্পনার নতুন দরজা।
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতায় শামসুর রাহমানের অবস্থান অনন্য। স্বদেশ, নাগরিক জীবন, প্রেম, মানুষের অধিকার ও সময়ের নানা সংকট নিয়ে তার কবিতা পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। কিন্তু এই কবির আরেকটি পরিচয় আছে, যা অনেক সময় বড়দের সাহিত্যচর্চার আলোচনায় আড়ালে পড়ে যায়। তিনি শিশুদেরও কবি। ছোটদের হাসি, আনন্দ, দুষ্টুমি আর কল্পনার জগৎকে আপন করে নিয়ে তিনি লিখেছেন অসংখ্য ছড়া ও কবিতা।
শিশুদের জন্য লিখতে বসে শামসুর রাহমান যেন ফিরে যেতেন নিজের শৈশবের কাছে। শব্দের সঙ্গে খেলা, ছন্দের দোল, পরিচিত জীবনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারÑ এসব তার শিশুতোষ রচনাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তার কাছে শিশুসাহিত্য ছিল না নিছক নীতিকথা শোনানোর মাধ্যম; বরং শিশুকে আনন্দ দেওয়ার, ভাবতে শেখানোর এবং কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়ার এক সৃজনশীল অবকাশ।
ছড়ার জগতে এক অন্য শামসুর রাহমান শামসুর রাহমানের প্রথম ছড়ার বই ‘এলাটিং বেলাটিং’। বইটির নামেই যেন লুকিয়ে আছে ছেলেবেলার খেলার মাঠ, ছন্দের দোলা আর দুরন্ত কল্পনার ইশারা। শিশুদের মুখে মুখে ফেরে এমন ছড়ার সহজাত আনন্দকে তিনি সাহিত্যের মর্যাদায় তুলে এনেছেন। তার ছড়ায় শব্দ শুধু অর্থ প্রকাশ করে না, শব্দ নিজেই হয়ে ওঠে খেলার সঙ্গী।
শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখতে যে প্রাণবন্ততা প্রয়োজন, তার ছড়ায় তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পরিচিত জগতের নানা উপকরণকে তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন, যেন সেগুলো নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কখনো প্রকৃতি, কখনো রূপকথার আবহ, কখনো দৈনন্দিন জীবনের মজার কোনো ঘটনাÑ সব মিলিয়ে তার ছড়ায় তৈরি হয়েছে আনন্দময় এক সাহিত্যভুবন। ‘ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো’, ‘গোলাপ ফোটে খুকির হাতে’, ‘রংধনুর সাঁকো’, ‘লাল ফুলকির ছড়া’Ñ এমন সব নাম তার শিশুতোষ সাহিত্যজগতের বৈচিত্র্যের পরিচয় দেয়।
বইয়ের নামগুলোতেই পাওয়া যায় পরিচিত প্রকৃতি, লোকজ জীবনের অনুষঙ্গ আর কল্পনার রঙিন আভাস। ট্রেনের জানালায় শিশুমনের বিস্ময় শিশুরা বড়দের মতো করে পৃথিবীকে দেখে না। একটি পাখির উড়ে যাওয়া, আকাশে মেঘের ভেলা, বৃষ্টির শব্দ কিংবা দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের হুইসেল তাদের মনে তৈরি করতে পারে একেকটি নতুন পৃথিবী। শামসুর রাহমানের শিশুতোষ কবিতার সৌন্দর্য এখানেইÑ তিনি ছোটদের এই বিস্ময়বোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
‘ট্রেন’ কবিতাটি শিশুদের কাছে পরিচিত হওয়ার পেছনে রয়েছে এমনই সহজাত আকর্ষণ। ট্রেনের চলাচল শিশুর কাছে কেবল যাতায়াতের ঘটনা নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গতি, দূরত্ব, অজানা গন্তব্য আর অসংখ্য প্রশ্ন। কবিতার ছন্দ সেই কৌতূহলকে আরও আনন্দময় করে তোলে। শিশুকে জোর করে কিছু শেখানোর চেষ্টা নেই; বরং পরিচিত একটি বিষয় ঘিরে আনন্দ ও কল্পনার সুযোগ তৈরি হয়।
শিশুসাহিত্যের এই গুণটিই শামসুর রাহমানকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। নাতনিদের ঘিরে স্নেহের ছড়ার জগৎ কবির শিশুপ্রেমের কোমল দিক প্রকাশ পেয়েছে তার নাতনিদের উদ্দেশে লেখা বইয়ে। ‘নয়নার জন্য’ এবং ‘তারার দোলনায় দীপিতা’ নামের বই দুটি মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের জন্য লেখার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত স্নেহেরও গভীর সম্পর্ক ছিল।
একজন দাদু যখন নাতনিকে ঘিরে ছড়া লেখেন, তখন সেখানে কেবল কবির কল্পনা থাকে না; মিশে থাকে আদর, মায়া, একান্ত ভালোবাসা। শিশুর ছোট্ট পৃথিবীকে বড়দের ভাষায় ব্যাখ্যা না করে তার পাশে বসে সেই পৃথিবীকে উপভোগ করার যে আনন্দ, এমন রচনার মধ্যে তারই আভাস পাওয়া যায়। এই ব্যক্তিগত ভালোবাসা অবশ্য ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বইয়ের পাতায় তা পৌঁছে গেছে অন্য শিশুদের কাছেও।
নয়না কিংবা দীপিতাকে ঘিরে লেখা ছড়ায় পাঠকেরা খুঁজে নিতে পারেন নিজেদের পরিবারের শিশুদের মুখ, তাদের দুষ্টুমি কিংবা তাদের ঘিরে বড়দের মমতার অনুভূতি। প্রকৃতি ও পরিচিত জীবনের গল্প শিশুদের পৃথিবী গড়ে ওঠে তাদের চারপাশের দৃশ্য ও অভিজ্ঞতা দিয়ে। ফুল, পাখি, গাছ, চাঁদ, তারা, নদী, মাঠÑ এসব তাদের কাছে একই সঙ্গে বাস্তব ও কল্পনার উপাদান।
শামসুর রাহমানের শিশুতোষ রচনায় প্রকৃতি ও পরিচিত জীবনের অনুষঙ্গ সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার ছড়া-কবিতার বইয়ের নামের মধ্যেই পাওয়া যায় রংধনু, গোলাপ, ধান কিংবা ফুলকির মতো পরিচিত উপাদান। এসব শব্দ শিশুর মনে ছবি তৈরি করে। ছন্দ সেই ছবিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ফলে কবিতা পড়ার সময় শিশুরা শুধু শব্দের অর্থ বোঝে না, মনের মধ্যে তৈরি করে নেয় নিজস্ব দৃশ্যপট।
এই অভিজ্ঞতা শিশুর ভাষাবোধ ও কল্পনাশক্তি বিকাশে সহায়ক হতে পারে। কবিতার সঙ্গে তার পরিচয় হয় আনন্দের মধ্য দিয়ে, আর সেই আনন্দই তাকে বইয়ের কাছে টেনে আনে। ছোটদের আপনজন শামসুর রাহমানের কবিতায় যেমন মানুষের জীবন ও সমাজের নানা জটিলতা এসেছে, শিশুদের জন্য লেখা তার ছড়া-কবিতায় তেমনি এসেছে সহজ আনন্দ ও বিস্ময়ের অনুভূতি। বিষয় আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই ভাষা ও কল্পনার প্রতি তার মনোযোগ লক্ষ করা যায়।
তার উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘এলাটিং বেলাটিং’, ‘ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো’, ‘গোলাপ ফোটে খুকির হাতে’, ‘রংধনুর সাঁকো’, ‘লাল ফুলকির ছড়া’, ‘নয়নার জন্য’ ও ‘তারার দোলনায় দীপিতা’। এই বইগুলো তার সাহিত্যজীবনের এমন একটি অংশের পরিচয় দেয়, যেখানে শিশুর আনন্দ ও কল্পনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শিশুদের জন্য লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তাদের মনোজগতের সঙ্গে সত্যিকারের সংযোগ তৈরি করা। শুধু সহজ শব্দ ব্যবহার করলেই শিশুসাহিত্য হয়ে ওঠে না; প্রয়োজন শিশুর কৌতূহল, বিস্ময় ও আনন্দকে অনুভব করার ক্ষমতা। শামসুর রাহমানের শিশুতোষ রচনায় এই সংযোগের সন্ধান পাওয়া যায়।





















