একদিকে হামের ভয়াবহ সংক্রমণ, অন্যদিকে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। একের পর এক রোগীর মৃত্যু এবং হাসপাতালে আক্রান্তদের চাপ— সব মিলিয়ে সিলেট অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের শুরু থেকে হামে আক্রান্ত ও সন্দেহজনক হাম নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১৯৫ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে চারজন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ১৫ জনের। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৫০ জন। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রোববার (১৮ অক্টোবর) পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৬৩৮ জনের।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী হবিগঞ্জ জেলায়। এরপর রয়েছে সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায়। আক্রান্তদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের বাসিন্দা নেপাল চন্দ্র দাস (৫২)।
এ নিয়ে চলতি বছর বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে চারজনের। মৃতদের মধ্যে দুজন হবিগঞ্জের এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জের একজন করে। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব বলছে, সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত হবিগঞ্জে ২৭৬ জন, সুনামগঞ্জে ১৩৯ জন এবং সিলেটে ১৩৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আরও ২৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৩৮। তবে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে মৌলভীবাজারে পৃথক আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখ না থাকায় এ জেলার সুনির্দিষ্ট হিসাব আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ১৫ জনের মধ্যে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন, মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে একজন, লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন, বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন এবং হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে চারজন রয়েছে।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ হচ্ছে এডিস মশার প্রজননস্থল ছড়িয়ে পড়া। সিলেট নগরীর পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও মশার লার্ভা পাওয়ার খবর সামনে এসেছে। এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সিলেট সিটি করপোরেশনের সব ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ার তথ্য উঠে আসে। নগরীর ১ হাজারের বেশি স্থানে লার্ভা শনাক্ত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পূর্ববর্তী বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বড় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখার কথাও জানানো হয়েছে।
সিলেটের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে হামের সংক্রমণ। চলতি বছর হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৫-এ পৌঁছেছে বলে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়। ফলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম নিয়েও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা।
বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার এবং নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। শুধু ওষুধ ছিটানো নয়, মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ নষ্ট করাও জরুরি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে সমন্বয় রেখে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
কোথায় লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, কোন এলাকায় রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে এবং কোন এলাকায় নতুন সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, হাম ও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। দুটি রোগের সংক্রমণ, জটিলতা, আক্রান্ত জনগোষ্ঠী এবং মৃত্যুর কারণ এক নয়।
তাই শুধু মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে কোনো রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। আক্রান্তের হার, রোগীর বয়স, জটিলতার ধরন, চিকিৎসা পাওয়ার সময় এবং রোগের বিস্তারও বিবেচনায় নিতে হয়। তিনি বলেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অন্য বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
নিজে থেকে ওষুধ গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া উচিত। তার মতে, হাম প্রতিরোধেও টিকাদান, আক্রান্ত ব্যক্তিকে যথাযথভাবে শনাক্ত করা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের টিকাদানের অবস্থা যাচাই করা এবং নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।
সিটি করপোরেশনের এই কর্মকর্তা বলেন, সিলেটে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৬৩৮ এবং মৃত্যুর সংখ্যা চার— এই পরিসংখ্যানকে এককভাবে আতঙ্কের কারণ হিসেবে দেখার চেয়ে প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করার সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু হামে ১৯৫ মৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে ডেঙ্গুর নতুন সংক্রমণ যুক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে চ্যালেঞ্জ যে বেড়েছে, তা স্পষ্ট।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নেই। বাড়িঘর ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে সচেতন হতে হবে। জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।





















