বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের কক্সবাজার ও উখিয়ার ঘিঞ্জি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া হাজার হাজার শিশুর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তা ও অপরাধের ঝুঁকিতে পড়ছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুত জীবনের নয় বছর পার হলেও শিবিরের খুপরি ঘরগুলোতে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ভবিষ্যৎহীন এক নতুন প্রজন্ম। বৈশ্বিক অনুদান কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনাগ্রহের সুযোগে এসব পথহারা শিশুদের অপরাধের অন্ধকারে টেনে নিচ্ছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, শিবিরগুলোতে মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও শিবিরের অস্বাস্থ্যকর খুপরি ঘরগুলোতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ২০১৭ সালের সহিংসতার সময় যেসব শিশু জন্ম নিয়েছিল, তাদের শৈশব কেটেছে এই বন্দিশিবিরে। উপযুক্ত শিক্ষা, খেলাধুলার সুযোগ এবং মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে আজ তারা কৈশোরে পা দিচ্ছে চরম এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে।
শিবিরের নিরাপত্তা চাদর ঢিলে হয়ে পড়ায় শিশুরা মারাত্মকভাবে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, পাচার ও অপহরণের শিকারে পরিণত হচ্ছে। জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ শিশুদের এই করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘২০১৭ সালে শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুরা আজ তাদের পুরো শৈশব হারিয়ে কৈশোরে পা দিচ্ছে এই বন্দী শিবিরে।
একদিকে খাদ্য ও সুরক্ষার তীব্র অভাব, অন্যদিকে ভবিষ্যৎহীন জীবন এই কোমলমতি শিশু ও কিশোরদের খুব সহজেই অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ’ জুলি বিশপ সতর্ক করে বলেন, ‘ক্যাম্পগুলোতে শিশু সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংকুচিত হয়ে পড়ায় নারী ও শিশুরা আশঙ্কাজনকভাবে অপরাধী চক্রের শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ’ এদিকে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর অর্থায়ন কমে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা।
বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সংকটের কারণে রোহিঙ্গা তহবিলে বরাদ্দ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে দাতা সংস্থাগুলো। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপো গ্রান্ডি এক বিবৃতিতে জানান, ‘দাতা সংস্থাগুলোর অনুদান কমার সোজা অর্থ হলো শিশুদের পুষ্টিকর খাবার ছাঁটাই এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া। কুপোষণ ও ক্ষুধার তীব্রতায় অভিভাবকরা যখন মরিয়া হয়ে উঠছেন, তখন কিশোরদের একটি বড় অংশ জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ছে।
’ গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিয়ে শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দীর্ঘ নীরবতার সমালোচনা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ পরিষদের ভাষণে তিনি বলেন, বাংলাদেশ টানা নয় বছর ধরে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে এই বিপুল সংখ্যক পরিবার ও শিশুকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই মানবিক উদারতাকে তাদের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত বানানোর কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শিশুদের সুরক্ষার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘দীর্ঘায়িত এই বাস্তুচ্যুতির ফলে শিশু ও তরুণরা সীমান্তজুড়ে মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে রাখতে হবে, এই সংকটের সৃষ্টি মিয়ানমারে হয়েছিল এবং শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য সমাধানও মিয়ানমারের ভেতরেই নিশ্চিত করতে হবে।
’ একই সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বেসামরিক মানুষ ও শিশুদের ওপর জান্তা সরকারের আক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সহ-সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। তিনি জানান, রাখাইন রাজ্যে শিশুদের স্কুল ও ঘরবাড়ির ওপর বিমান হামলা চালানের পাশাপাশি তাদের পরিবারকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা স্পষ্ট জানান যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিজে) বিচার নিশ্চিত করা এবং মিয়ানমারে শিশুদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করা ছাড়া এই সংকটের কোনো টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।





















