আজ রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
২ কার্তিক, ১৪৩৩ | ০৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

যুদ্ধ, ঋণ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

  • MIT ERP
  • Update Time : 12:10:39 am, Sunday, 18 October 2026
  • 14

যুদ্ধ, ঋণ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে। কয়েক বছরের ব্যবধানে এসব দেশের রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এতে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ন্যায্য রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে দ্রুত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক আন্তঃসংযোগ থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় সংস্থাটির আর্থিক খাত মূল্যায়ন কর্মসূচি (এফএসএপি) সংস্কার করা হচ্ছে।

গতকাল শনিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা ও সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব বিষয় উঠে আসে। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে আর্থিক খাতের নতুন ঝুঁকি মূল্যায়নে এফএসএপি সংস্কারের বিস্তারিত তুলে ধরেন আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের উপপরিচালক মিকায়েল উরবানভা এবং গ্রিসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু।

ঋণ পরিশোধে বাড়ছে চাপ : ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নিজেদের নীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ন্যায্যভাবে রাজস্ব সংগ্রহ, ধনীদের কর ও সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণের মাধ্যমে এসব দেশকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন— প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন পথ তৈরি করা এবং এআইসহ নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নে অংশ নেওয়া।

দ্বিতীয়ত, সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। জর্জিয়েভার বলেন, মূল্যস্ফীতি দরিদ্র মানুষের ওপর করের মতো প্রভাব ফেলে। মানুষ অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না; তারা সুস্পষ্ট নীতি এবং এমন ব্যাবসায়িক পরিবেশ চায়, যেখানে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। প্রতিকূল আর্থিক পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে এসব দেশের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

ঋণ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ধনী দেশগুলোতে ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত বাড়ছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ অনুপাত সামান্য কমছে। তবে ঋণের মাত্রা কমলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। কয়েক বছরে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এসব দেশের ঋণের মাত্রা কমানো ও রাজস্বের স্থায়িত্ব জোরদারে সংস্থাটি এরই মধ্যে কাজ করেছে। তাই সব দেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন না-ও হতে পারে। তবে যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, তাদের দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা দেওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব। আবার ঋণ টেকসই হলেও কোনো দেশ তারল্যসংকটে পড়লে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে হবে।

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান জর্জিয়েভা। তিনি বলেন, দারিদ্র্যবিমোচন ও প্রবৃদ্ধি ট্রাস্টের (পিআরজিটি) মাধ্যমে অর্থায়নে সদস্যদের সমর্থন বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধিতেও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমেছে : মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জর্জিয়েভা বলেন, অঞ্চলটির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার (মেনা) অনেক দেশ সংস্কার এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো গত কয়েক বছরে জোরালো সংস্কার করেছে।

ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে রাজস্ব ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ইরাক ও লেবাননের বিষয়ে জর্জিয়েভা বলেন, ইরাক কর্তৃপক্ষ আইএমএফের কাছে একটি সহায়তামূলক কর্মসূচির অনুরোধ করেছে। দেশটিকে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সংস্থাটি কাজ করবে।

লেবানন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও নিবিড় আলোচনা চলছে এবং ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। যৌথভাবে আরও কিছু কাজ সম্পন্ন করা গেলে সফল হওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী। এ ছাড়া মিশরের সঙ্গে চলমান কর্মসূচি বছরের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা এবং জর্ডানের সঙ্গে একটি সফল কর্মসূচি রয়েছে। আর্থিক খাত মূল্যায়নে নতুন ঝুঁকিতে গুরুত্ব : ঋণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আর্থিক খাতের ঝুঁকি শনাক্ত করার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনছে আইএমএফ।

২০২৬ সালের পর্যালোচনার পর এফএসএপিকে আরও ঝুঁকিভিত্তিক, নমনীয় ও দেশভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় এআই, সাইবার নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সরকারি ঋণ এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক বাজারের আন্তঃসংযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। গতকাল শনিবার ব্যাংককে ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়নের ভবিষ্যৎ : কর্মদক্ষতা, মনোযোগ এবং প্রভাব শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে এ সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

মিকায়েল উরবানভা বলেন, ২০২৬ সালের পর্যালোচনায় কর্মসূচির আওতা, সুপারিশের কার্যকারিতা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার দক্ষতা এবং দেশগুলোর অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দেশের ঝুঁকি ও প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যায়নের পরিধি নির্ধারণ করা হবে। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য সুপারিশগুলো আরও বাস্তবায়নযোগ্য করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, কমসংখ্যক মিশন, নমনীয় সময়সূচি এবং দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। আইএমএফের আর্টিকেল ফোর পরামর্শের সঙ্গে এফএসএপির সুপারিশের সংযোগ বাড়ালে বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সমন্বয় করা সহজ হবে। স্বেচ্ছামূলক মূল্যায়নের সুযোগ বাড়িয়ে আরও বেশি দেশকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এফএসএপি চালু করে। এ কর্মসূচির আওতায় ব্যাংক, বিনিয়োগ তহবিল, বিমা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক বাজারের অবকাঠামো মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত এবং সংস্কারের সুপারিশ করা হয়। আইএমএফ আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বব্যাংক আর্থিক খাতের উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়। ২০১০ সাল থেকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক।

গ্রিসের অভিজ্ঞতায় সংস্কারের গুরুত্ব : গ্রিসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, এফএসএপি জাতীয় কর্তৃপক্ষকে দৈনন্দিন তদারকির বাইরে গিয়ে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের সুযোগ দেয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে পাওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে তদারকি কাঠামো উন্নত করা সম্ভব।

গ্রিসের ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটিতে আগের এফএসএপি মূল্যায়ন হয়েছিল ২০০৬ সালে। সার্বভৌম ঋণসংকটের কারণে গ্রিক ব্যাংকগুলোর প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হয়েছিল এবং সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কার ও খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মূলধনভিত্তি ও তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী হয়েছে এবং চাপ-পরীক্ষায় তাদের সক্ষমতা সন্তোষজনক। খেলাপি ঋণের হারও এখন ইউরো এলাকার গড় পর্যায়ের কাছাকাছি। তবে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমলেও ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণসংক্রান্ত সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি বলে জানান তিনি। এ সমস্যা মোকাবিলায় গ্রিসের অর্থ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় দেউলিয়াত্ব কাঠামো সংস্কারের একটি খসড়া আইন উপস্থাপন করেছে।

এতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, ঋণসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয় রয়েছে। আন্তঃসংযোগ থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে ঝুঁকি : উরবানভা বলেন, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক বাজারের অবকাঠামোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ বাড়ায় এক খাতের ঝুঁকি অন্য খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে সরকারি ঋণ, তারল্যঝুঁকি, ঋণনির্ভর বিনিয়োগ এবং ব্যাংক, বিমা ও পেনশন তহবিলের পারস্পরিক সম্পর্ক মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতি, এআই, সাইবার হামলা ও জলবায়ু পরিবর্তন আর্থিক খাতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি গ্রিসের পর্যটন, নৌপরিবহন ও বাণিজ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকর নীতি ও তদারকি কাঠামো প্রস্তুত রাখা জরুরি। তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যায়ন হলে সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাই করা সহজ হয়।

ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি দেশগুলোকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দেবে। বিশেষ করে ক্রিপ্টো সম্পদ ও এআইয়ের মতো পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে আইএমএফের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেশগুলোর কাজে আসবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

গাজীপুরের সাবেক পিআইও ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে দেড় কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের দুদক মামলা

যুদ্ধ, ঋণ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

Update Time : 12:10:39 am, Sunday, 18 October 2026

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে। কয়েক বছরের ব্যবধানে এসব দেশের রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এতে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ন্যায্য রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে দ্রুত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক আন্তঃসংযোগ থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় সংস্থাটির আর্থিক খাত মূল্যায়ন কর্মসূচি (এফএসএপি) সংস্কার করা হচ্ছে।

গতকাল শনিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা ও সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব বিষয় উঠে আসে। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে আর্থিক খাতের নতুন ঝুঁকি মূল্যায়নে এফএসএপি সংস্কারের বিস্তারিত তুলে ধরেন আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের উপপরিচালক মিকায়েল উরবানভা এবং গ্রিসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু।

ঋণ পরিশোধে বাড়ছে চাপ : ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নিজেদের নীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ন্যায্যভাবে রাজস্ব সংগ্রহ, ধনীদের কর ও সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণের মাধ্যমে এসব দেশকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন— প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন পথ তৈরি করা এবং এআইসহ নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নে অংশ নেওয়া।

দ্বিতীয়ত, সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। জর্জিয়েভার বলেন, মূল্যস্ফীতি দরিদ্র মানুষের ওপর করের মতো প্রভাব ফেলে। মানুষ অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না; তারা সুস্পষ্ট নীতি এবং এমন ব্যাবসায়িক পরিবেশ চায়, যেখানে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। প্রতিকূল আর্থিক পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে এসব দেশের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

ঋণ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ধনী দেশগুলোতে ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত বাড়ছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ অনুপাত সামান্য কমছে। তবে ঋণের মাত্রা কমলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। কয়েক বছরে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এসব দেশের ঋণের মাত্রা কমানো ও রাজস্বের স্থায়িত্ব জোরদারে সংস্থাটি এরই মধ্যে কাজ করেছে। তাই সব দেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন না-ও হতে পারে। তবে যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, তাদের দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা দেওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব। আবার ঋণ টেকসই হলেও কোনো দেশ তারল্যসংকটে পড়লে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে হবে।

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান জর্জিয়েভা। তিনি বলেন, দারিদ্র্যবিমোচন ও প্রবৃদ্ধি ট্রাস্টের (পিআরজিটি) মাধ্যমে অর্থায়নে সদস্যদের সমর্থন বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধিতেও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমেছে : মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জর্জিয়েভা বলেন, অঞ্চলটির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার (মেনা) অনেক দেশ সংস্কার এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো গত কয়েক বছরে জোরালো সংস্কার করেছে।

ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে রাজস্ব ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ইরাক ও লেবাননের বিষয়ে জর্জিয়েভা বলেন, ইরাক কর্তৃপক্ষ আইএমএফের কাছে একটি সহায়তামূলক কর্মসূচির অনুরোধ করেছে। দেশটিকে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সংস্থাটি কাজ করবে।

লেবানন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও নিবিড় আলোচনা চলছে এবং ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। যৌথভাবে আরও কিছু কাজ সম্পন্ন করা গেলে সফল হওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী। এ ছাড়া মিশরের সঙ্গে চলমান কর্মসূচি বছরের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা এবং জর্ডানের সঙ্গে একটি সফল কর্মসূচি রয়েছে। আর্থিক খাত মূল্যায়নে নতুন ঝুঁকিতে গুরুত্ব : ঋণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আর্থিক খাতের ঝুঁকি শনাক্ত করার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনছে আইএমএফ।

২০২৬ সালের পর্যালোচনার পর এফএসএপিকে আরও ঝুঁকিভিত্তিক, নমনীয় ও দেশভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় এআই, সাইবার নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সরকারি ঋণ এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক বাজারের আন্তঃসংযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। গতকাল শনিবার ব্যাংককে ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়নের ভবিষ্যৎ : কর্মদক্ষতা, মনোযোগ এবং প্রভাব শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে এ সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

মিকায়েল উরবানভা বলেন, ২০২৬ সালের পর্যালোচনায় কর্মসূচির আওতা, সুপারিশের কার্যকারিতা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার দক্ষতা এবং দেশগুলোর অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দেশের ঝুঁকি ও প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যায়নের পরিধি নির্ধারণ করা হবে। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য সুপারিশগুলো আরও বাস্তবায়নযোগ্য করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, কমসংখ্যক মিশন, নমনীয় সময়সূচি এবং দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। আইএমএফের আর্টিকেল ফোর পরামর্শের সঙ্গে এফএসএপির সুপারিশের সংযোগ বাড়ালে বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সমন্বয় করা সহজ হবে। স্বেচ্ছামূলক মূল্যায়নের সুযোগ বাড়িয়ে আরও বেশি দেশকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এফএসএপি চালু করে। এ কর্মসূচির আওতায় ব্যাংক, বিনিয়োগ তহবিল, বিমা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক বাজারের অবকাঠামো মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত এবং সংস্কারের সুপারিশ করা হয়। আইএমএফ আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বব্যাংক আর্থিক খাতের উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়। ২০১০ সাল থেকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক।

গ্রিসের অভিজ্ঞতায় সংস্কারের গুরুত্ব : গ্রিসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, এফএসএপি জাতীয় কর্তৃপক্ষকে দৈনন্দিন তদারকির বাইরে গিয়ে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের সুযোগ দেয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে পাওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে তদারকি কাঠামো উন্নত করা সম্ভব।

গ্রিসের ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটিতে আগের এফএসএপি মূল্যায়ন হয়েছিল ২০০৬ সালে। সার্বভৌম ঋণসংকটের কারণে গ্রিক ব্যাংকগুলোর প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হয়েছিল এবং সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কার ও খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মূলধনভিত্তি ও তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী হয়েছে এবং চাপ-পরীক্ষায় তাদের সক্ষমতা সন্তোষজনক। খেলাপি ঋণের হারও এখন ইউরো এলাকার গড় পর্যায়ের কাছাকাছি। তবে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমলেও ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণসংক্রান্ত সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি বলে জানান তিনি। এ সমস্যা মোকাবিলায় গ্রিসের অর্থ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় দেউলিয়াত্ব কাঠামো সংস্কারের একটি খসড়া আইন উপস্থাপন করেছে।

এতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, ঋণসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয় রয়েছে। আন্তঃসংযোগ থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে ঝুঁকি : উরবানভা বলেন, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক বাজারের অবকাঠামোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ বাড়ায় এক খাতের ঝুঁকি অন্য খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে সরকারি ঋণ, তারল্যঝুঁকি, ঋণনির্ভর বিনিয়োগ এবং ব্যাংক, বিমা ও পেনশন তহবিলের পারস্পরিক সম্পর্ক মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতি, এআই, সাইবার হামলা ও জলবায়ু পরিবর্তন আর্থিক খাতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি গ্রিসের পর্যটন, নৌপরিবহন ও বাণিজ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকর নীতি ও তদারকি কাঠামো প্রস্তুত রাখা জরুরি। তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যায়ন হলে সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাই করা সহজ হয়।

ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি দেশগুলোকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দেবে। বিশেষ করে ক্রিপ্টো সম্পদ ও এআইয়ের মতো পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে আইএমএফের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেশগুলোর কাজে আসবে।