আজ শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক, ১৪৩৩ | ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩৪°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫৯%

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় মুখর ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:31:13 pm, Friday, 16 October 2026
  • 16

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় মুখর ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতিটি পর্বে ঢাক-ঢোল ও কাঁশি-সানাইয়ের বাদ্য-বাজনা এবং সুরের আবহ অপরিহার্য। এই প্রয়োজন থেকেই প্রতি বছরের মতো এবারও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসেছে প্রায় পাঁচশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট।

প্রতি বছরের মতো এবারও এই হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক বাদকদল হাজির হয়েছেন নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) থেকে জমতে শুরু করেছে এই হাট। চলবে শুক্রবার ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত।

বৃহস্পতিবার দুপু‌রে হা‌টে গি‌য়ে দেখা যায়, বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় মুখরিত হ‌য়ে উঠে‌ছে কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকা। ঢাক-ঢোল, কাঁশি-সানাই, করতাল আর বাঁশির শব্দে জমে উঠেছে হাটের পরিবেশ। সুরের তালে তালে চলছে প্রতিযোগিতা-কে বাজাবেন সেরাটা। কার সুরে মুদ্ধ হবে পূজা আয়োজকেরা। বাদকেরা নিজেদের সুর আর দক্ষতা উজাড় করে দিচ্ছেন মণ্ডপে বাজানোর সুযোগ পেতে। আর পূজা আয়োজকেরা ঘুরে ঘুরে শুনছেন, পছন্দ করছেন, করছেন দরদামও। যার বাজনায় মন গলছে, তার সঙ্গেই হচ্ছে চুক্তি।

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা থেকে ঢাকের হাটে এসেছেন পূজা আয়োজক বিমল চন্দ্র পাল। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর দুর্গাপূজার বাদ্যযন্ত্র নিতে ঐতিহ‌্যবাহী এ হাটে আসা হয়। সকাল থেকে এসে অনেকের বাজনা শুনেছি। সেখান থেকে একটি যন্ত্রী দলকে ম‌নে ধ‌রে‌ছে। ‌তারা বাজায় ভা‌লো। ৬০ হাজার টাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।’

গাজীপুরের টঙ্গী থেকে এসেছেন শ্যামল পন্ডিত। তিনি বলেন, ‘এবারই এ হাটে প্রথম এসে মুগ্ধ হয়েছি। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাদক দল এসেছে। সেখান থেকে বিক্রমপুরের পাঁচজ‌নের এক‌টি বাদক দ‌ল নিয়েছি। চুক্তি হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা।’

নাম ‘ঢাকের হাট’ হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। এখানে আসেন যাঁরা, সবাই বাদ্যযন্ত্র বাজান। তাদের বাজনা শুনে, দক্ষতা যাচাই করে পূজা আয়োজকেরা মণ্ডপে বাজানোর জন্য তাদের ভাড়া করে নেন। সম্মানি নির্ধারিত হয় দল বা সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্র আর দক্ষতার ওপর।

বিক্রমপু‌রের ঢা‌কি প‌রিমল দাস ব‌লেন, ‘ফো‌নে অনেক যোগা‌যোগ ক‌রে‌ছিল, যাইনি। এখা‌নে না আস‌লে মন মা‌নে না। অনেকের স‌ঙ্গে দেখা হয়। এর আনন্দটাই আলাদা। আমি ৩০ হাজার টাকা চে‌য়ে‌ছি। দর কষাক‌ষি চল‌ছে, কম‌বে‌শি ক‌রে চ‌লে যাব।’

দশ জনের একটি দল নিয়ে কুমিল্লা থেকে এসেছেন কাজল মণিঋষি। তাদের রয়েছে ঢাকসহ আধুনিক বাদ্যযন্ত্র। চুক্তি হাকাচ্ছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অনেকেই দরদাম করছেন। কাজল মণিঋষি বলেন, ‘লাখের কম হলে বাজাতে যাব না।’

এই ঢাকের হাট শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নয়, ভিড় করছেন অন্য ধর্মের লোকজনও। তাদের কাছে এই হাট শুধুই বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন নয়, এটা এখন ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অংশ।

এবারের হাটে উপস্থিত হয়েছেন বিক্রমপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরাণীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের নানা জেলা থেকে আসা বাদকদল। ঢাক-ঢোল ছাড়াও রয়েছে বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনিসহ রয়েছে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র।

স্থানীয়রা জানান, এই হাট এখন আর শুধু হিন্দু‌দের নেই। সব ধ‌র্মের লোকজন। ঢাক‌ঢোল ও সু‌রের মুর্ছনা শুন‌তে এখা‌নে চ‌লে আসে। হাট‌টি যেন এক উৎস‌বে প‌রিণত হ‌য়ে‌ছে। সব‌ মি‌লি‌য়ে এটি স্থানীয় ঐতিহ‌্য ও সংস্কৃ‌তির অংশ হ‌য়ে গে‌ছে।

স্থানীয় স্বেচ্ছা‌সেবী সংগঠন শ্রীমা সংঘ হা‌টের তত্ত্বাবধান কর‌ছে। ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহা বলেন, ‘ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের সময় শুরু হয় কটিয়াদীর এই ঢাকের হাট। রাজপ্রাসাদে পূজার জন্য সেরা ঢাকির সন্ধানে বার্তা পাঠানো হয়েছিল বিক্রমপুরে। সেখান থেকে বহু ঢাকি নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাদের বাজনা শুনে সেরা দল বেছে নেন। সেই থেকেই শুরু হয় এই ঐতিহ্যের যাত্রা।’

জীবন কুমার আরও বলেন, ‘এ হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা আমরা নিশ্চিত করে থাকি। যদি কোন যন্ত্রী ভাড়ায় না যেতে পারেন, তাহলে তাদের বাড়িতে ফেরার সকল ব্যবস্থা সংগঠনের পক্ষ থেকে করা হয়।’

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

পিরোজপুরের জিয়ানগরে টাকা ধারের বিরোধে প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় মুখর ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট

Update Time : 02:31:13 pm, Friday, 16 October 2026

শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতিটি পর্বে ঢাক-ঢোল ও কাঁশি-সানাইয়ের বাদ্য-বাজনা এবং সুরের আবহ অপরিহার্য। এই প্রয়োজন থেকেই প্রতি বছরের মতো এবারও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসেছে প্রায় পাঁচশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট।

প্রতি বছরের মতো এবারও এই হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক বাদকদল হাজির হয়েছেন নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) থেকে জমতে শুরু করেছে এই হাট। চলবে শুক্রবার ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত।

বৃহস্পতিবার দুপু‌রে হা‌টে গি‌য়ে দেখা যায়, বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় মুখরিত হ‌য়ে উঠে‌ছে কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকা। ঢাক-ঢোল, কাঁশি-সানাই, করতাল আর বাঁশির শব্দে জমে উঠেছে হাটের পরিবেশ। সুরের তালে তালে চলছে প্রতিযোগিতা-কে বাজাবেন সেরাটা। কার সুরে মুদ্ধ হবে পূজা আয়োজকেরা। বাদকেরা নিজেদের সুর আর দক্ষতা উজাড় করে দিচ্ছেন মণ্ডপে বাজানোর সুযোগ পেতে। আর পূজা আয়োজকেরা ঘুরে ঘুরে শুনছেন, পছন্দ করছেন, করছেন দরদামও। যার বাজনায় মন গলছে, তার সঙ্গেই হচ্ছে চুক্তি।

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা থেকে ঢাকের হাটে এসেছেন পূজা আয়োজক বিমল চন্দ্র পাল। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর দুর্গাপূজার বাদ্যযন্ত্র নিতে ঐতিহ‌্যবাহী এ হাটে আসা হয়। সকাল থেকে এসে অনেকের বাজনা শুনেছি। সেখান থেকে একটি যন্ত্রী দলকে ম‌নে ধ‌রে‌ছে। ‌তারা বাজায় ভা‌লো। ৬০ হাজার টাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।’

গাজীপুরের টঙ্গী থেকে এসেছেন শ্যামল পন্ডিত। তিনি বলেন, ‘এবারই এ হাটে প্রথম এসে মুগ্ধ হয়েছি। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাদক দল এসেছে। সেখান থেকে বিক্রমপুরের পাঁচজ‌নের এক‌টি বাদক দ‌ল নিয়েছি। চুক্তি হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা।’

নাম ‘ঢাকের হাট’ হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। এখানে আসেন যাঁরা, সবাই বাদ্যযন্ত্র বাজান। তাদের বাজনা শুনে, দক্ষতা যাচাই করে পূজা আয়োজকেরা মণ্ডপে বাজানোর জন্য তাদের ভাড়া করে নেন। সম্মানি নির্ধারিত হয় দল বা সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্র আর দক্ষতার ওপর।

বিক্রমপু‌রের ঢা‌কি প‌রিমল দাস ব‌লেন, ‘ফো‌নে অনেক যোগা‌যোগ ক‌রে‌ছিল, যাইনি। এখা‌নে না আস‌লে মন মা‌নে না। অনেকের স‌ঙ্গে দেখা হয়। এর আনন্দটাই আলাদা। আমি ৩০ হাজার টাকা চে‌য়ে‌ছি। দর কষাক‌ষি চল‌ছে, কম‌বে‌শি ক‌রে চ‌লে যাব।’

দশ জনের একটি দল নিয়ে কুমিল্লা থেকে এসেছেন কাজল মণিঋষি। তাদের রয়েছে ঢাকসহ আধুনিক বাদ্যযন্ত্র। চুক্তি হাকাচ্ছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অনেকেই দরদাম করছেন। কাজল মণিঋষি বলেন, ‘লাখের কম হলে বাজাতে যাব না।’

এই ঢাকের হাট শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নয়, ভিড় করছেন অন্য ধর্মের লোকজনও। তাদের কাছে এই হাট শুধুই বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন নয়, এটা এখন ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অংশ।

এবারের হাটে উপস্থিত হয়েছেন বিক্রমপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরাণীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের নানা জেলা থেকে আসা বাদকদল। ঢাক-ঢোল ছাড়াও রয়েছে বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনিসহ রয়েছে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র।

স্থানীয়রা জানান, এই হাট এখন আর শুধু হিন্দু‌দের নেই। সব ধ‌র্মের লোকজন। ঢাক‌ঢোল ও সু‌রের মুর্ছনা শুন‌তে এখা‌নে চ‌লে আসে। হাট‌টি যেন এক উৎস‌বে প‌রিণত হ‌য়ে‌ছে। সব‌ মি‌লি‌য়ে এটি স্থানীয় ঐতিহ‌্য ও সংস্কৃ‌তির অংশ হ‌য়ে গে‌ছে।

স্থানীয় স্বেচ্ছা‌সেবী সংগঠন শ্রীমা সংঘ হা‌টের তত্ত্বাবধান কর‌ছে। ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহা বলেন, ‘ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের সময় শুরু হয় কটিয়াদীর এই ঢাকের হাট। রাজপ্রাসাদে পূজার জন্য সেরা ঢাকির সন্ধানে বার্তা পাঠানো হয়েছিল বিক্রমপুরে। সেখান থেকে বহু ঢাকি নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাদের বাজনা শুনে সেরা দল বেছে নেন। সেই থেকেই শুরু হয় এই ঐতিহ্যের যাত্রা।’

জীবন কুমার আরও বলেন, ‘এ হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা আমরা নিশ্চিত করে থাকি। যদি কোন যন্ত্রী ভাড়ায় না যেতে পারেন, তাহলে তাদের বাড়িতে ফেরার সকল ব্যবস্থা সংগঠনের পক্ষ থেকে করা হয়।’