আজ শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক, ১৪৩৩ | ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩৪°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫৯%

বিশ্বব্যাংকের মতে দুর্নীতি হলো ক্ষমতার অপব্যবহার

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:50:21 pm, Friday, 16 October 2026
  • 7

বিশ্বব্যাংকের মতে দুর্নীতি হলো ক্ষমতার অপব্যবহার

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বিশ্বব্যাংক বলছে, দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি বা অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার। এর মধ্যে সরকারি পদের অপব্যবহার করে ঘুষ নেওয়া, তহবিল তছরুপ কিংবা স্বজনপ্রীতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দৃষ্টিতে, দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত লাভের জন্য অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক দুর্নীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, ‘ব্যক্তিগত লাভের আশায় সরকারি পদ বা ক্ষমতার অপব্যবহার করা, যার মধ্যে সরকারি বা বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেআইনি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া বা নেওয়া দুটোই জড়িত’।

সমাজবিজ্ঞান বলছে দুর্নীতি হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পিত ক্ষমতা, দায়িত্ব, বিশ্বাস কিংবা সুযোগকে ন্যায়সংগত উদ্দেশ্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করা। অর্থাৎ, যে ক্ষমতা মানুষের কল্যাণের জন্য দেওয়া হয়েছে, তা যখন মানুষের ক্ষতি করে নিজের বা ঘনিষ্ঠদের সুবিধা দিতে ব্যবহৃত হয়, সেটাই দুর্নীতি। আইনি কাঠামোর দিক থেকে, লিখিত আইন, নিয়ম বা প্রোটোকল লঙ্ঘন করে জেনেশুনে কোনো অনৈতিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে করা যেকোনো বেআইনি কাজই হলো দুর্নীতি।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ করুন, এই সংজ্ঞাগুলো দিয়েছে সমাজের উঁচু স্তরের মানুষেরা। তাঁরা অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা বলছেন, আইনের কথা ও ন্যায়ের কথা বলছেন; কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে আইনকে ন্যায়ের মানদণ্ড বলা হচ্ছে, যে ক্ষমতাকে অর্পিত ক্ষমতা বলা হচ্ছে, সেগুলোই যদি অন্যায় আইন কিংবা অন্যায় ক্ষমতা হয়, তবে দুর্নীতি বা নীতিকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব?

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন রিকশাচালক যখন হাইওয়েতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে দ্রুতগামী বাসের মতো সমান তালে চলাচল করেন, তখন তিনি ভাবেন সেটাই তার অধিকার। আবার সেই একই রাস্তায় একজন বাস চালক বলছেন, হাইওয়েতে রিকশা চালানো সম্পূর্ণ অন্যায়। স্থানীয় সাধারণ মানুষ, যারা রিকশায় যাতায়াত করেন, তারা রিকশাওয়ালার মতামতের সাথে একমত হয়ে হয়ত বলেন, এই রাস্তা ছাড়া তো যাতায়াতের আর কোনো উপায় নেই, কারণ রিকশার জন্য তো আলাদা কোনো লেন তৈরি করা হয়নি!

তাহলে এখানে কে সঠিক আর কে অপরাধী? রাষ্ট্র হয়তো একটা নিয়ম করে দিতে পারে, কিন্তু সেই নিয়মটা কত ভাগ মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছে? আচ্ছা, ভেবে দেখুন তো, যদি আইন বানানোর ক্ষমতা সেই দিনমজুর, রিকশাচালক আর সাধারণ শ্রমিকদের হাতে দেওয়া হতো, তবে কি তারা হাইওয়েকে রিকশা চলাচলের জন্য নিষিদ্ধ করত? এই ছোট্ট আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ন্যায় কিংবা অন্যায়, নীতি কিংবা দুর্নীতি কে বুঝতে হলে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন।

আমার কাছে যা নীতি বা ভালো কাজ বলে মনে হয়, অন্য কারও কাছে সেটাই অন্যায় বা দুর্নীতি বলে মনে হতে পারে। আর এই বিতর্ক তো অন্তহীন। কিন্তু এর একটি সমাধান রয়েছে। কোনটি ভালো বা নীতি এবং কোনটি দুর্নীতি, তা বুঝতে হলে আমাদের এমন মানুষের কাছে শিখতে হবে যাঁরা সত্যিই জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। কিন্তু এখানেও একটি বড় সংকট রয়েছে। সমাজের বা রাষ্ট্রের সব জ্ঞানী মানুষেরাই কি নীতিবান, নাকি এই জ্ঞানীদের মাঝেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে কৌশলী ও বিপজ্জনক দুর্নীতিবাজ মানুষেরা?

তাই প্রয়োজন রাষ্ট্রে এমন একজন মানুষকে খুঁজে নেওয়া, যিনি সত্যিই জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। আর তেমন মানুষকে খুঁজে পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ইতিহাস যাচাই করা। যে ব্যক্তি সমাজের ভোগবাদী শ্রেণীর অংশ, তিনি যত বড় জ্ঞানীই হোন না কেন, তাঁর দেওয়া নীতির সংজ্ঞা ভুল হওয়ার আশঙ্কাটাই সবচেয়ে বেশি। একমাত্র এমন মানুষের থেকেই নীতি ও দুর্নীতির সঠিক সংজ্ঞা পাওয়া সম্ভব, যিনি হয়তো সম্পদশালী, কিন্তু সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের মতো বিছানায় ঘুমান, সাধারণ খাবার খান কিংবা সাদামাটা পোশাক পরেন।

এমন মানুষের কাছেই নীতি ও দুর্নীতির সঠিক আলোচনা পাওয়া সম্ভব, যিনি একটি ভালো খাবার খাওয়ার সময় অন্তরে অপরাধবোধ অনুভব করেন এই ভেবে যে, আজ এই সময়ে সমাজের সকলেই কি এমন ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে? এমন মানুষের কাছ থেকেই আপনি নীতি ও দুর্নীতির সঠিক সংজ্ঞা পাবেন, যিনি তার চেয়েও গরিব মানুষদের বেশি সম্মান করেন এই উপলব্ধি থেকে যে, গরিব মানুষেরা আসলে গরিব হয়েছে আমাদেরই তৈরি করা ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক নিয়মের কারণে।

এমন মানুষের কাছেই আপনি প্রকৃত নীতি ও দুর্নীতির সংজ্ঞা পাবেন, যিনি রাষ্ট্রক্ষমতার চেয়ারে বসে অর্পিত দায়িত্বের বিশাল বোঝা অনুভব করে অন্তরে কান্নার অনুভুতি অনুভব করেন। তাহলে নীতি ও দুর্নীতিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? এটি স্পষ্ট যে নীতির বিপরীত হলো দুর্নীতি। অর্থাৎ নীতি হলো—সঠিক, ন্যায়, ন্যায্য, নিয়ম, ভালো ও উপকারী; আর দুর্নীতি হলো—অন্যায়, অন্যায্য, খারাপ ও ক্ষতিকর।

কিন্তু কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ, তা কি আমরা সবাই পুরোপুরি জানি? হ্যাঁ, কিছুটা হয়তো জানি; কিন্তু ভালো ও মন্দের গভীরতা সম্পর্কে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। আজ আমরা যে ডিভাইস বা প্রযুক্তিকে অত্যন্ত উপকারী ও ভালো বলছি, হয়তো কয়েক বছর পর সেই ডিভাইসটিকেই চরম ক্ষতিকর বলে মনে হতে পারে। একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করাকে আজ আমরা খুব ভালো কাজ বলে মনে করছি, কিন্তু আমার সেই সুন্দর বাড়িটিই হয়তো আশেপাশের অসংখ্য মানুষের অন্তরে হীনম্মন্যতা ও দুঃখের জন্ম দিচ্ছে।

একজনের অত্যন্ত দামি অলংকার তাঁর কাছে খুব ভালো লাগার বিষয় হতে পারে, কিন্তু যাদের সেগুলো কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের অন্তরে সেটি সৃষ্টি করে কষ্টের পাহাড়। তাই নীতিকে দুর্নীতি থেকে কিংবা মন্দকে ভালো থেকে পৃথক করতে হলে ‘দুর্নীতি’ শব্দটিকে আরও অনেক গভীরভাবে বুঝতে পারা প্রয়োজন। নিচের প্রশ্নগুলোর প্রতি বিজ্ঞ পাঠকদের মূল্যবান মতামত জানতে চাই: ১. ঘুষ দাবি করা নিশ্চিতভাবেই দুর্নীতি; কিন্তু যিনি ঘুষ দিচ্ছেন, তিনি কি আরও বড় দুর্নীতিবাজ নন?

কেননা, যদি সমাজের সবাই একযোগে ঘুষ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে ঘুষের এই দুষ্টচক্র এমনিতেই থেমে যেতে বাধ্য। ২. উৎকোচ দিয়ে চাকরি নেওয়া নিঃসন্দেহে দুর্নীতি; কিন্তু চাকরি পাওয়ার জন্য সুপারিশ করা বা সুপারিশ চাওয়া কি দুর্নীতি নয়, যেখানে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাঝে নিজেদের যোগ্যতা প্রমান করে সেই চাকুরীটি পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে?

৩. একজন গরিব ও ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে যখন কেউ বিরিয়ানি খান, সেটি কি নীতি, ভালো কাজ নাকি অন্যায় বা দুর্নীতি? আরও গভীরে গিয়ে যদি চিন্তা করা যায়, তবে কোনো খাবারের লোভনীয় ছবি, বিজ্ঞাপন কিংবা খাবারের সুবাস কি জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত, যেখানে অনেকেই হয়ত সেই খাবার খাওয়ার সামর্থ্য রাখেন না? ৪. বিশ্বজুড়ে আজ ব্যবসার সবচেয়ে বড় কৌশল হলো পণ্যের বিক্রি বাড়ানো; আর সেই লক্ষ্য অর্জনে তারা কৌশলে মানুষের অন্তরে নিজেদের পণ্য ঢুকিয়ে দিতে প্রতিনিয়ত ‘মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি করে চলেছে।

মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য কিনবে—এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ীরা মানুষের মনকে ম্যানিপুলেট করার জন্য যেভাবে কৌশল আঁটছে এবং মানুষকে তাদের বিজ্ঞাপন দেখতে ও শুনতে বাধ্য করছে, সেটি কি অন্যায় বা দুর্নীতি নয়? ৫। একজন মানুষ যখন শুধু নিজের মতামতকেই সঠিক মনে করে এবং তা অন্যদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়, কিংবা ক্ষুধা না থাকলেও খাওয়া, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়া, বেশি কেনাকাটা করা, বিলাসিতা করা এগুলি কি অন্যায় বা দুর্নীতি নয় যখন প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের উপর প্রতিদিনই অতিরিক্ত চাপ বেড়ে চলেছে?

তাই কোনো দুর্নীতি বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু অপরাধীর দিকে তাকালে চলে না; দেখতে হয় কোন মানসিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তাকে দুর্নীতি করতে উৎসাহিত করছে কিংবা বাধা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। একজন মানুষ যখন মনে করেন, “সুযোগ যখন পেয়েছি, তখন নিজের লাভটা করে নিই”, তখন ব্যক্তিগত স্বার্থ তার নৈতিক দায়িত্বের ওপর স্থান পায়।

যখন তিনি দেখেন, “সবাই তো এভাবেই খাচ্ছে”, তখন সমাজের পরোক্ষ সমর্থনে অন্যায়টি তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যখন তিনি দেখেন অপরাধ করেও কোনো শাস্তি হয় না, তখন শাস্তির ভয় কমে যায়। আর কোনো সমাজে যখন যোগ্যতা ও সততার পরিবর্তে আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়, তখন সৎ থাকার উৎসাহও দুর্বল হয়ে পড়ে।

দুর্নীতি কি শুধু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির কারণেই হয়? দুর্নীতিকে কেবল কিছু অসৎ মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রদোষ বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখা হলে এর মূল শেকড়টি কখনোই উন্মোচিত হয় না। দুর্নীতি আসলে কেবল ব্যক্তির লোভের ফল নয়; এটি একধরনের মানসিক ব্যাধি, যা সংক্রামক ভাইরাসের মতো পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। করোনাভাইরাস যেমন ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে আক্রমণ করেছিল, লোভের এই ভাইরাসও তেমনি সমাজের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নীরবে ছড়িয়ে পড়ে।

একজন মানুষ যখন চারপাশের মানুষের বিলাসবহুল জীবনযাপন, অর্থবিত্ত ও জৌলুসপূর্ণ প্রদর্শনী দেখেন, তখন সেই দৃশ্যগুলো তার অবচেতনে ভাইরাসের মতো প্রবেশ করে। অন্যের সুরম্য বাড়ি বা দামি গাড়ি দেখে নিজের মনের ভেতরেও বিত্তশালী হওয়ার এক তীব্র লোভ জন্ম নেয়। সমাজে সম্পদ ও বিলাসবহুল প্রদর্শনী যত বেশি বাড়ে, দুর্নীতির চারাগাছও তত দ্রুত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে।

এই কারণেই কোনো সমাজে যখন দুর্নীতি ব্যাপকভাবে শিকড় গেড়ে বসে, তখন সেটিকে শুধু কিছু ব্যক্তির অপরাধ বলে দায় সারলে আসল সংকট আড়ালেই থেকে যায়। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত প্রশ্নগুলোরই মুখোমুখি হতে হবে। • একজন সৎ মানুষ কি এই রাষ্ট্রে বা সমাজে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারেন? • আইন বা নিয়ম কি সত্যিই দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, নাকি তা কেবল দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য?

• কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা অভিযোগ করলে কি উল্টো প্রতিশোধের শিকার হওয়ার বা বিপদগ্রস্ত হওয়ার ভয় থাকে? • রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং সরকারি নিয়োগগুলোতে কি সঠিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখা হয়? • অপরাধী যতই প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর হোক না কেন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ করে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কি সম্ভব?

যদি কোনো সমাজ ব্যবস্থায় সততার সাথে পথ চলার কারণে একজন সৎ মানুষকে পদে পদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় এবং অনিয়ম, দুর্নীতি বা তোষামোদের আশ্রয় নিয়ে অন্যরা পুরস্কৃত হন, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল কোনো ব্যক্তির নৈতিক দুর্বলতার নয়, বরং এটি পুরো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর এক গভীর পচন।

তাই একটি কার্যকর ও টেকসই দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কেবল শাস্তির বিধান যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন: স্বচ্ছ নিয়মকানুন, স্বাধীন তদন্ত কমিশন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, কার্যকর অডিট বা নিরীক্ষা পদ্ধতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা অভিযোগকারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইনি সুরক্ষা, এবং জনগণের অবাধে তথ্য জানার অধিকার কিন্তু সব চেয়ে বড় প্রয়োজন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে আত্মসম্মানবোধের মুল্য বৃদ্ধির জন্য গণজোয়ার সৃষ্টি করা।

একজন মানুষ যখন সততা, নীতিবোধ ও দায়িত্বশীলতাকে নিজের আত্মসম্মান বলে অনুভব করতে অভ্যস্ত হবে কেবল তখনই সব ধরণের দুর্নীতি মুছে যেতে শুরু করবে আর প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পরিবেশ।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

জাতীয় দলে নাও ফিরতে পারেন রোনালদো, এমন ইঙ্গিত তাঁর বোনের

বিশ্বব্যাংকের মতে দুর্নীতি হলো ক্ষমতার অপব্যবহার

Update Time : 03:50:21 pm, Friday, 16 October 2026

বিশ্বব্যাংক বলছে, দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি বা অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার। এর মধ্যে সরকারি পদের অপব্যবহার করে ঘুষ নেওয়া, তহবিল তছরুপ কিংবা স্বজনপ্রীতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দৃষ্টিতে, দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত লাভের জন্য অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক দুর্নীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, ‘ব্যক্তিগত লাভের আশায় সরকারি পদ বা ক্ষমতার অপব্যবহার করা, যার মধ্যে সরকারি বা বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেআইনি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া বা নেওয়া দুটোই জড়িত’।

সমাজবিজ্ঞান বলছে দুর্নীতি হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পিত ক্ষমতা, দায়িত্ব, বিশ্বাস কিংবা সুযোগকে ন্যায়সংগত উদ্দেশ্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করা। অর্থাৎ, যে ক্ষমতা মানুষের কল্যাণের জন্য দেওয়া হয়েছে, তা যখন মানুষের ক্ষতি করে নিজের বা ঘনিষ্ঠদের সুবিধা দিতে ব্যবহৃত হয়, সেটাই দুর্নীতি। আইনি কাঠামোর দিক থেকে, লিখিত আইন, নিয়ম বা প্রোটোকল লঙ্ঘন করে জেনেশুনে কোনো অনৈতিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে করা যেকোনো বেআইনি কাজই হলো দুর্নীতি।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ করুন, এই সংজ্ঞাগুলো দিয়েছে সমাজের উঁচু স্তরের মানুষেরা। তাঁরা অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা বলছেন, আইনের কথা ও ন্যায়ের কথা বলছেন; কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে আইনকে ন্যায়ের মানদণ্ড বলা হচ্ছে, যে ক্ষমতাকে অর্পিত ক্ষমতা বলা হচ্ছে, সেগুলোই যদি অন্যায় আইন কিংবা অন্যায় ক্ষমতা হয়, তবে দুর্নীতি বা নীতিকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব?

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন রিকশাচালক যখন হাইওয়েতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে দ্রুতগামী বাসের মতো সমান তালে চলাচল করেন, তখন তিনি ভাবেন সেটাই তার অধিকার। আবার সেই একই রাস্তায় একজন বাস চালক বলছেন, হাইওয়েতে রিকশা চালানো সম্পূর্ণ অন্যায়। স্থানীয় সাধারণ মানুষ, যারা রিকশায় যাতায়াত করেন, তারা রিকশাওয়ালার মতামতের সাথে একমত হয়ে হয়ত বলেন, এই রাস্তা ছাড়া তো যাতায়াতের আর কোনো উপায় নেই, কারণ রিকশার জন্য তো আলাদা কোনো লেন তৈরি করা হয়নি!

তাহলে এখানে কে সঠিক আর কে অপরাধী? রাষ্ট্র হয়তো একটা নিয়ম করে দিতে পারে, কিন্তু সেই নিয়মটা কত ভাগ মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছে? আচ্ছা, ভেবে দেখুন তো, যদি আইন বানানোর ক্ষমতা সেই দিনমজুর, রিকশাচালক আর সাধারণ শ্রমিকদের হাতে দেওয়া হতো, তবে কি তারা হাইওয়েকে রিকশা চলাচলের জন্য নিষিদ্ধ করত? এই ছোট্ট আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ন্যায় কিংবা অন্যায়, নীতি কিংবা দুর্নীতি কে বুঝতে হলে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন।

আমার কাছে যা নীতি বা ভালো কাজ বলে মনে হয়, অন্য কারও কাছে সেটাই অন্যায় বা দুর্নীতি বলে মনে হতে পারে। আর এই বিতর্ক তো অন্তহীন। কিন্তু এর একটি সমাধান রয়েছে। কোনটি ভালো বা নীতি এবং কোনটি দুর্নীতি, তা বুঝতে হলে আমাদের এমন মানুষের কাছে শিখতে হবে যাঁরা সত্যিই জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। কিন্তু এখানেও একটি বড় সংকট রয়েছে। সমাজের বা রাষ্ট্রের সব জ্ঞানী মানুষেরাই কি নীতিবান, নাকি এই জ্ঞানীদের মাঝেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে কৌশলী ও বিপজ্জনক দুর্নীতিবাজ মানুষেরা?

তাই প্রয়োজন রাষ্ট্রে এমন একজন মানুষকে খুঁজে নেওয়া, যিনি সত্যিই জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। আর তেমন মানুষকে খুঁজে পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ইতিহাস যাচাই করা। যে ব্যক্তি সমাজের ভোগবাদী শ্রেণীর অংশ, তিনি যত বড় জ্ঞানীই হোন না কেন, তাঁর দেওয়া নীতির সংজ্ঞা ভুল হওয়ার আশঙ্কাটাই সবচেয়ে বেশি। একমাত্র এমন মানুষের থেকেই নীতি ও দুর্নীতির সঠিক সংজ্ঞা পাওয়া সম্ভব, যিনি হয়তো সম্পদশালী, কিন্তু সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের মতো বিছানায় ঘুমান, সাধারণ খাবার খান কিংবা সাদামাটা পোশাক পরেন।

এমন মানুষের কাছেই নীতি ও দুর্নীতির সঠিক আলোচনা পাওয়া সম্ভব, যিনি একটি ভালো খাবার খাওয়ার সময় অন্তরে অপরাধবোধ অনুভব করেন এই ভেবে যে, আজ এই সময়ে সমাজের সকলেই কি এমন ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে? এমন মানুষের কাছ থেকেই আপনি নীতি ও দুর্নীতির সঠিক সংজ্ঞা পাবেন, যিনি তার চেয়েও গরিব মানুষদের বেশি সম্মান করেন এই উপলব্ধি থেকে যে, গরিব মানুষেরা আসলে গরিব হয়েছে আমাদেরই তৈরি করা ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক নিয়মের কারণে।

এমন মানুষের কাছেই আপনি প্রকৃত নীতি ও দুর্নীতির সংজ্ঞা পাবেন, যিনি রাষ্ট্রক্ষমতার চেয়ারে বসে অর্পিত দায়িত্বের বিশাল বোঝা অনুভব করে অন্তরে কান্নার অনুভুতি অনুভব করেন। তাহলে নীতি ও দুর্নীতিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? এটি স্পষ্ট যে নীতির বিপরীত হলো দুর্নীতি। অর্থাৎ নীতি হলো—সঠিক, ন্যায়, ন্যায্য, নিয়ম, ভালো ও উপকারী; আর দুর্নীতি হলো—অন্যায়, অন্যায্য, খারাপ ও ক্ষতিকর।

কিন্তু কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ, তা কি আমরা সবাই পুরোপুরি জানি? হ্যাঁ, কিছুটা হয়তো জানি; কিন্তু ভালো ও মন্দের গভীরতা সম্পর্কে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। আজ আমরা যে ডিভাইস বা প্রযুক্তিকে অত্যন্ত উপকারী ও ভালো বলছি, হয়তো কয়েক বছর পর সেই ডিভাইসটিকেই চরম ক্ষতিকর বলে মনে হতে পারে। একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করাকে আজ আমরা খুব ভালো কাজ বলে মনে করছি, কিন্তু আমার সেই সুন্দর বাড়িটিই হয়তো আশেপাশের অসংখ্য মানুষের অন্তরে হীনম্মন্যতা ও দুঃখের জন্ম দিচ্ছে।

একজনের অত্যন্ত দামি অলংকার তাঁর কাছে খুব ভালো লাগার বিষয় হতে পারে, কিন্তু যাদের সেগুলো কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের অন্তরে সেটি সৃষ্টি করে কষ্টের পাহাড়। তাই নীতিকে দুর্নীতি থেকে কিংবা মন্দকে ভালো থেকে পৃথক করতে হলে ‘দুর্নীতি’ শব্দটিকে আরও অনেক গভীরভাবে বুঝতে পারা প্রয়োজন। নিচের প্রশ্নগুলোর প্রতি বিজ্ঞ পাঠকদের মূল্যবান মতামত জানতে চাই: ১. ঘুষ দাবি করা নিশ্চিতভাবেই দুর্নীতি; কিন্তু যিনি ঘুষ দিচ্ছেন, তিনি কি আরও বড় দুর্নীতিবাজ নন?

কেননা, যদি সমাজের সবাই একযোগে ঘুষ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে ঘুষের এই দুষ্টচক্র এমনিতেই থেমে যেতে বাধ্য। ২. উৎকোচ দিয়ে চাকরি নেওয়া নিঃসন্দেহে দুর্নীতি; কিন্তু চাকরি পাওয়ার জন্য সুপারিশ করা বা সুপারিশ চাওয়া কি দুর্নীতি নয়, যেখানে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাঝে নিজেদের যোগ্যতা প্রমান করে সেই চাকুরীটি পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে?

৩. একজন গরিব ও ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে যখন কেউ বিরিয়ানি খান, সেটি কি নীতি, ভালো কাজ নাকি অন্যায় বা দুর্নীতি? আরও গভীরে গিয়ে যদি চিন্তা করা যায়, তবে কোনো খাবারের লোভনীয় ছবি, বিজ্ঞাপন কিংবা খাবারের সুবাস কি জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত, যেখানে অনেকেই হয়ত সেই খাবার খাওয়ার সামর্থ্য রাখেন না? ৪. বিশ্বজুড়ে আজ ব্যবসার সবচেয়ে বড় কৌশল হলো পণ্যের বিক্রি বাড়ানো; আর সেই লক্ষ্য অর্জনে তারা কৌশলে মানুষের অন্তরে নিজেদের পণ্য ঢুকিয়ে দিতে প্রতিনিয়ত ‘মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি করে চলেছে।

মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য কিনবে—এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ীরা মানুষের মনকে ম্যানিপুলেট করার জন্য যেভাবে কৌশল আঁটছে এবং মানুষকে তাদের বিজ্ঞাপন দেখতে ও শুনতে বাধ্য করছে, সেটি কি অন্যায় বা দুর্নীতি নয়? ৫। একজন মানুষ যখন শুধু নিজের মতামতকেই সঠিক মনে করে এবং তা অন্যদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়, কিংবা ক্ষুধা না থাকলেও খাওয়া, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়া, বেশি কেনাকাটা করা, বিলাসিতা করা এগুলি কি অন্যায় বা দুর্নীতি নয় যখন প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের উপর প্রতিদিনই অতিরিক্ত চাপ বেড়ে চলেছে?

তাই কোনো দুর্নীতি বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু অপরাধীর দিকে তাকালে চলে না; দেখতে হয় কোন মানসিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তাকে দুর্নীতি করতে উৎসাহিত করছে কিংবা বাধা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। একজন মানুষ যখন মনে করেন, “সুযোগ যখন পেয়েছি, তখন নিজের লাভটা করে নিই”, তখন ব্যক্তিগত স্বার্থ তার নৈতিক দায়িত্বের ওপর স্থান পায়।

যখন তিনি দেখেন, “সবাই তো এভাবেই খাচ্ছে”, তখন সমাজের পরোক্ষ সমর্থনে অন্যায়টি তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যখন তিনি দেখেন অপরাধ করেও কোনো শাস্তি হয় না, তখন শাস্তির ভয় কমে যায়। আর কোনো সমাজে যখন যোগ্যতা ও সততার পরিবর্তে আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়, তখন সৎ থাকার উৎসাহও দুর্বল হয়ে পড়ে।

দুর্নীতি কি শুধু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির কারণেই হয়? দুর্নীতিকে কেবল কিছু অসৎ মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রদোষ বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখা হলে এর মূল শেকড়টি কখনোই উন্মোচিত হয় না। দুর্নীতি আসলে কেবল ব্যক্তির লোভের ফল নয়; এটি একধরনের মানসিক ব্যাধি, যা সংক্রামক ভাইরাসের মতো পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। করোনাভাইরাস যেমন ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে আক্রমণ করেছিল, লোভের এই ভাইরাসও তেমনি সমাজের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নীরবে ছড়িয়ে পড়ে।

একজন মানুষ যখন চারপাশের মানুষের বিলাসবহুল জীবনযাপন, অর্থবিত্ত ও জৌলুসপূর্ণ প্রদর্শনী দেখেন, তখন সেই দৃশ্যগুলো তার অবচেতনে ভাইরাসের মতো প্রবেশ করে। অন্যের সুরম্য বাড়ি বা দামি গাড়ি দেখে নিজের মনের ভেতরেও বিত্তশালী হওয়ার এক তীব্র লোভ জন্ম নেয়। সমাজে সম্পদ ও বিলাসবহুল প্রদর্শনী যত বেশি বাড়ে, দুর্নীতির চারাগাছও তত দ্রুত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে।

এই কারণেই কোনো সমাজে যখন দুর্নীতি ব্যাপকভাবে শিকড় গেড়ে বসে, তখন সেটিকে শুধু কিছু ব্যক্তির অপরাধ বলে দায় সারলে আসল সংকট আড়ালেই থেকে যায়। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত প্রশ্নগুলোরই মুখোমুখি হতে হবে। • একজন সৎ মানুষ কি এই রাষ্ট্রে বা সমাজে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারেন? • আইন বা নিয়ম কি সত্যিই দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, নাকি তা কেবল দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য?

• কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা অভিযোগ করলে কি উল্টো প্রতিশোধের শিকার হওয়ার বা বিপদগ্রস্ত হওয়ার ভয় থাকে? • রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং সরকারি নিয়োগগুলোতে কি সঠিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখা হয়? • অপরাধী যতই প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর হোক না কেন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ করে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কি সম্ভব?

যদি কোনো সমাজ ব্যবস্থায় সততার সাথে পথ চলার কারণে একজন সৎ মানুষকে পদে পদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় এবং অনিয়ম, দুর্নীতি বা তোষামোদের আশ্রয় নিয়ে অন্যরা পুরস্কৃত হন, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল কোনো ব্যক্তির নৈতিক দুর্বলতার নয়, বরং এটি পুরো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর এক গভীর পচন।

তাই একটি কার্যকর ও টেকসই দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কেবল শাস্তির বিধান যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন: স্বচ্ছ নিয়মকানুন, স্বাধীন তদন্ত কমিশন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, কার্যকর অডিট বা নিরীক্ষা পদ্ধতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা অভিযোগকারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইনি সুরক্ষা, এবং জনগণের অবাধে তথ্য জানার অধিকার কিন্তু সব চেয়ে বড় প্রয়োজন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে আত্মসম্মানবোধের মুল্য বৃদ্ধির জন্য গণজোয়ার সৃষ্টি করা।

একজন মানুষ যখন সততা, নীতিবোধ ও দায়িত্বশীলতাকে নিজের আত্মসম্মান বলে অনুভব করতে অভ্যস্ত হবে কেবল তখনই সব ধরণের দুর্নীতি মুছে যেতে শুরু করবে আর প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পরিবেশ।