অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করে একসময় সংসার চালাতেন কৃষক মোহাম্মদ আলী। আজ তার নিজের জমিতে ফলছে সবুজ ধনিয়া পাতা। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ধৈর্য আর স্বপ্ন তাকে এনে দিয়েছে সাফল্য। নিজের জমি কেনা, নতুন ঘর নির্মাণের পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন ৮-১০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান।
ময়মনসিংহের নান্দাইলের এই কৃষক এখন এলাকার অন্য কৃষকদের কাছেও অনুপ্রেরণার নাম। অভাব পেরিয়ে স্বপ্নের পথে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার কুরাটি গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলীর (৫৫) একসময় নিজের কোনো জমিজমা ছিল না। অন্যের জমিতে কাজ করে চলত সংসার। অভাবের সেই দিন বদলাতে প্রায় ১৫ বছর আগে অন্যের জমি চুক্তিতে নিয়ে শুরু করেন বিলাতি ধনিয়াপাতা চাষ।
অল্প জমিতে শুরু করা সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রথম দিকে সীমিত পরিসরে চাষ করলেও লাভের সম্ভাবনা দেখে বাড়াতে থাকেন আবাদ। বর্তমানে তার ১৮ কাঠা জমিতে বিলাতি ধনিয়া পাতার চাষ হচ্ছে। নিজের জমি কিনেছেন, বাড়িতে তুলেছেন নতুন ঘর। একসময় যিনি অন্যের জমিতে শ্রম দিতেন, এখন তার জমিতেই কাজ করেন ৮-১০ জন শ্রমিক। প্রতিদিন বিক্রি ৪০০-৫০০ কেজি মোহাম্মদ আলী জানান, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি ধনিয়া পাতা বিক্রি করতে পারেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা তার জমিতে এসে পাতা কিনে নিয়ে যান। চলতি বছর সব খরচ বাদ দিয়ে ১০-১২ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। বিলাতি ধনিয়া পাতার চাহিদা সারা বছর থাকায় বিক্রি নিয়ে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয় না। বিশেষ করে রমজান মাসে স্থানীয় বাজারে চাহিদা বেড়ে গেলে প্রতি কেজি ধনিয়া পাতা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
অন্য সময় দাম কিছুটা কম থাকলেও শহরের বাজার, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় চাহিদা থাকায় বিক্রির সুযোগ রয়েছে। প্রতিদিন জমি থেকে পাতা তুলে পানিতে ধোয়া, বাছাই ও আঁটি বাঁধার পর সেগুলো দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো হয়। এই কর্মব্যস্ততার মধ্যেই গড়ে উঠেছে তার সাফল্যের গল্প। নিজের উন্নতির সঙ্গে কর্মসংস্থান ধনিয়া পাতা চাষ ও পরিচর্যা থেকে শুরু করে পাতা উত্তোলন, ধোয়া, বাছাই এবং আঁটি বাঁধার কাজে প্রতিদিন ৮-১০ জন শ্রমিক কাজ করেন।
এতে নিজের আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। কুরাটি গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল কাদির বলেন, মোহাম্মদ আলী এ এলাকায় বিলাতি ধনিয়া পাতা চাষের পথিকৃৎ। তার সাফল্য দেখে গ্রামের অনেক কৃষক এখন এই চাষে আগ্রহী হয়েছেন। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্যদেরও উৎসাহিত করছেন তিনি। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা কৃষি কর্মকর্তা নাইমা সুলতানা জানান, ধনিয়া পাতা মূলত দুই ধরনের।
একটি দেশি জাত, যা সাধারণত শীতকালে চাষ করা হয়। অন্যটি গাঢ় সবুজ রঙের বিলাতি ধনিয়া পাতা, যা সারা বছর পাওয়া যায়। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। মোহাম্মদ আলীকেও চাষাবাদের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। সবুজ ফসলে নতুন স্বপ্ন মোহাম্মদ আলীর জীবন বদলের গল্প শুধু একজন কৃষকের সাফল্য নয়, বরং অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা।
পরিশ্রম, ধৈর্য ও বাজারের চাহিদা বুঝে চাষাবাদ করলে কৃষিও যে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ হতে পারে, তা তিনি দেখিয়েছেন। কুরাটি গ্রামের সবুজ জমিতে তাই শুধু ধনিয়া পাতাই ফলছে না, জন্ম নিচ্ছে নতুন সম্ভাবনাও। মোহাম্মদ আলীর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্য কৃষকেরাও এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তার হাত ধরে বদলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে গ্রামের আরও অনেক কৃষক।





















