আজ মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৭°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২%

চায়ের আড্ডায় ফসলের চিকিৎসা: বদলে যাচ্ছে কৃষকের চিন্তাভাবনা

  • MIT ERP
  • Update Time : 07:54:17 pm, Sunday, 11 October 2026
  • 20

চায়ের আড্ডায় ফসলের চিকিৎসা: বদলে যাচ্ছে কৃষকের চিন্তাভাবনা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মহাসড়ক ঘেঁষে যাওয়া পেকুয়ার টইটং সোনাইছড়ি নামের একটি গ্রাম। এ সড়কের পাশে রয়েছে একটি চায়ের স্টল। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই কৃষকদের ভিড় জমে এ চায়ের স্টলে। কিন্তু আলোচনার বিষয় এখন আর রাজনীতি বা গ্রাম্য সালিশ নয়।

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ২০ হেক্টর ধানক্ষেতের পোকা দমন। কোনটা বন্ধু পোকা, কোনটা শত্রু পোকা, কোন পোকা কোন পোকাকে খায় – এই নিয়েই চলে কৃষকদের মাঝে তর্ক-বিতর্ক। চায়ের স্টলের এই আড্ডাই এখন হয়ে উঠেছে ফসলের রোগবালাই দমনের এক খোলা পাঠশালা। আর এই পাঠশালার পেছনে রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্যতিক্রমী দুটি পদ্ধতি – ‘অতন্দ্র জরিপ’ ও ‘আয়সা ( আয়সা- এগ্রো ইকোসিস্টেম এনালাইসিস)।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবছর পেকুয়া উপজেলায় ৮ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সোনাইছড়ি ব্লকেই আবাদ হয়েছে ৫০০ হেক্টর। এই ব্লকের মহাসড়ক সংলগ্ন ২০ হেক্টর ফসলি মাঠ থেকে লটারির মাধ্যমে ৫০ শতকের একটি জমিকে ‘অতন্দ্র জরিপ প্লট’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রতি বৃহস্পতিবার সকালে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার নেতৃত্বে ৩০ জন কৃষক দল বেঁধে নামেন এই জমিতে।

প্রচলিত নিয়মে কৃষকরা জমিতে পোকা দেখলেই কীটনাশক স্প্রে করেন। কিন্তু অতন্দ্র জরিপ বলছে – ‘দেখলেই স্প্রে নয়, আগে জরিপ, তারপর সিদ্ধান্ত’। এই পদ্ধতিতে জমির কোনাকুনি ভাবে দৈবচয়নের মাধ্যমে মাত্র ২০টি ধানগাছের গোছা বাছাই করা হয়। সেই ২০টি গাছে কি পরিমাণে ক্ষতিকারক পোকা (মাজরা, বাদামী গাছফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকা) এবং উপকারী পোকা (মাকড়সা, লেডি বার্ড বিটল, ড্যামসেল ফ্লাই) আছে তার হিসাব করা হয়।

যদি দেখা যায় শত্রু পোকার চেয়ে বন্ধু পোকার সংখ্যা বেশি, তাহলে বিষ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বন্ধু পোকাই শত্রু পোকাকে খেয়ে ফেলবে। এতে কৃষকের ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকার কীটনাশক খরচ বেঁচে যায়। এই কার্যক্রমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ‘পোকার চিড়িয়াখানা’ বা ইনজেট জিও। কৃষকরা জমি থেকে একটি আস্ত ধানগাছের গোছা তুলে এনে একটি মাটির টবে স্থাপন করেন।

তারপর সেটিকে একটি স্বচ্ছ পলিথিন ব্যাগ দিয়ে মুড়িয়ে দেন। এর ভেতরে জমি থেকে ধরে আনা বিভিন্ন পোকা ছেড়ে দেওয়া হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, পলিথিনের ভেতরে একটি মাকড়সা কিভাবে বাদামী গাছফড়িং শিকার করছে, তা কৃষকরা নিজের চোখে দেখছেন। কোন পোকা কিভাবে পাতা খায়, তার জীবনচক্র কেমন – তা হাতেকলমে শিখছেন তারা। স্থানীয় কৃষক আব্দুল গফুর (৫৫) বলেন, ৩০ বছর ধরে চাষ করি।

আগে মনে করতাম সব পোকাই খারাপ। বিষ দিয়া সব মারি ফেলতাম। এখন বুঝি, কিছু পোকা আমাগো বন্ধু। এই জরিপ শেখার পর থাইকা দুইবার বিষ দেওনের জায়গাত একবারও দেওন লাগে না। আরেক কৃষক নুরুল আলম বলেন, আগে দোকানে গিয়া বলতাম, জমিতে পোকা লাগছে, বিষ দেন। এখন চা দোকানে বইসা নিজেরাই সিদ্ধান্ত লই। খরচ অর্ধেক কমে গেছে। এদিকে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, উপকারী পোকা মারা যাচ্ছে।

সেখানে পেকুয়ার এই ‘চায়ের দোকানের স্কুল’ মডেল সারা দেশের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিরশাদুল ইসলাম বলেন, আমরা কৃষকদের সাথে নিয়ে অতন্দ্র জরিপ করি। এর উদ্দেশ্য হলো এই ব্লকে বর্তমানে কি কি পোকা ও রোগবালাই আছে তা চিহ্নিত করা। এটি চিহ্নিত করে আমরা কৃষকদের সঠিক পরামর্শ দিতে পারি। এই তথ্য আমরা পার্শ্ববর্তী ব্লকেও ছড়িয়ে দিই যাতে সব কৃষক সতর্ক হতে পারে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, এটি আইপিএম (সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা) এর একটি অংশ। আমরা পেকুয়ার ৫টি ব্লকে এই কার্যক্রম চালু করেছি। অতন্দ্র জরিপের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি একটি মাঠে বন্ধু পোকা ও শত্রু পোকার অনুপাত কত। এর মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে কিনা। এতে অযথা কীটনাশকের ব্যবহার ৩০-৪০ শতাংশ কমে যাবে, পরিবেশ ভালো থাকবে এবং নিরাপদ ফসল উৎপাদন হবে।

কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

যশোরে পূর্বশত্রুতার জেরে কৃষককে দা ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা

চায়ের আড্ডায় ফসলের চিকিৎসা: বদলে যাচ্ছে কৃষকের চিন্তাভাবনা

Update Time : 07:54:17 pm, Sunday, 11 October 2026

মহাসড়ক ঘেঁষে যাওয়া পেকুয়ার টইটং সোনাইছড়ি নামের একটি গ্রাম। এ সড়কের পাশে রয়েছে একটি চায়ের স্টল। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই কৃষকদের ভিড় জমে এ চায়ের স্টলে। কিন্তু আলোচনার বিষয় এখন আর রাজনীতি বা গ্রাম্য সালিশ নয়।

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ২০ হেক্টর ধানক্ষেতের পোকা দমন। কোনটা বন্ধু পোকা, কোনটা শত্রু পোকা, কোন পোকা কোন পোকাকে খায় – এই নিয়েই চলে কৃষকদের মাঝে তর্ক-বিতর্ক। চায়ের স্টলের এই আড্ডাই এখন হয়ে উঠেছে ফসলের রোগবালাই দমনের এক খোলা পাঠশালা। আর এই পাঠশালার পেছনে রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্যতিক্রমী দুটি পদ্ধতি – ‘অতন্দ্র জরিপ’ ও ‘আয়সা ( আয়সা- এগ্রো ইকোসিস্টেম এনালাইসিস)।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবছর পেকুয়া উপজেলায় ৮ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সোনাইছড়ি ব্লকেই আবাদ হয়েছে ৫০০ হেক্টর। এই ব্লকের মহাসড়ক সংলগ্ন ২০ হেক্টর ফসলি মাঠ থেকে লটারির মাধ্যমে ৫০ শতকের একটি জমিকে ‘অতন্দ্র জরিপ প্লট’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রতি বৃহস্পতিবার সকালে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার নেতৃত্বে ৩০ জন কৃষক দল বেঁধে নামেন এই জমিতে।

প্রচলিত নিয়মে কৃষকরা জমিতে পোকা দেখলেই কীটনাশক স্প্রে করেন। কিন্তু অতন্দ্র জরিপ বলছে – ‘দেখলেই স্প্রে নয়, আগে জরিপ, তারপর সিদ্ধান্ত’। এই পদ্ধতিতে জমির কোনাকুনি ভাবে দৈবচয়নের মাধ্যমে মাত্র ২০টি ধানগাছের গোছা বাছাই করা হয়। সেই ২০টি গাছে কি পরিমাণে ক্ষতিকারক পোকা (মাজরা, বাদামী গাছফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকা) এবং উপকারী পোকা (মাকড়সা, লেডি বার্ড বিটল, ড্যামসেল ফ্লাই) আছে তার হিসাব করা হয়।

যদি দেখা যায় শত্রু পোকার চেয়ে বন্ধু পোকার সংখ্যা বেশি, তাহলে বিষ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বন্ধু পোকাই শত্রু পোকাকে খেয়ে ফেলবে। এতে কৃষকের ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকার কীটনাশক খরচ বেঁচে যায়। এই কার্যক্রমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ‘পোকার চিড়িয়াখানা’ বা ইনজেট জিও। কৃষকরা জমি থেকে একটি আস্ত ধানগাছের গোছা তুলে এনে একটি মাটির টবে স্থাপন করেন।

তারপর সেটিকে একটি স্বচ্ছ পলিথিন ব্যাগ দিয়ে মুড়িয়ে দেন। এর ভেতরে জমি থেকে ধরে আনা বিভিন্ন পোকা ছেড়ে দেওয়া হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, পলিথিনের ভেতরে একটি মাকড়সা কিভাবে বাদামী গাছফড়িং শিকার করছে, তা কৃষকরা নিজের চোখে দেখছেন। কোন পোকা কিভাবে পাতা খায়, তার জীবনচক্র কেমন – তা হাতেকলমে শিখছেন তারা। স্থানীয় কৃষক আব্দুল গফুর (৫৫) বলেন, ৩০ বছর ধরে চাষ করি।

আগে মনে করতাম সব পোকাই খারাপ। বিষ দিয়া সব মারি ফেলতাম। এখন বুঝি, কিছু পোকা আমাগো বন্ধু। এই জরিপ শেখার পর থাইকা দুইবার বিষ দেওনের জায়গাত একবারও দেওন লাগে না। আরেক কৃষক নুরুল আলম বলেন, আগে দোকানে গিয়া বলতাম, জমিতে পোকা লাগছে, বিষ দেন। এখন চা দোকানে বইসা নিজেরাই সিদ্ধান্ত লই। খরচ অর্ধেক কমে গেছে। এদিকে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, উপকারী পোকা মারা যাচ্ছে।

সেখানে পেকুয়ার এই ‘চায়ের দোকানের স্কুল’ মডেল সারা দেশের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিরশাদুল ইসলাম বলেন, আমরা কৃষকদের সাথে নিয়ে অতন্দ্র জরিপ করি। এর উদ্দেশ্য হলো এই ব্লকে বর্তমানে কি কি পোকা ও রোগবালাই আছে তা চিহ্নিত করা। এটি চিহ্নিত করে আমরা কৃষকদের সঠিক পরামর্শ দিতে পারি। এই তথ্য আমরা পার্শ্ববর্তী ব্লকেও ছড়িয়ে দিই যাতে সব কৃষক সতর্ক হতে পারে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, এটি আইপিএম (সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা) এর একটি অংশ। আমরা পেকুয়ার ৫টি ব্লকে এই কার্যক্রম চালু করেছি। অতন্দ্র জরিপের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি একটি মাঠে বন্ধু পোকা ও শত্রু পোকার অনুপাত কত। এর মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে কিনা। এতে অযথা কীটনাশকের ব্যবহার ৩০-৪০ শতাংশ কমে যাবে, পরিবেশ ভালো থাকবে এবং নিরাপদ ফসল উৎপাদন হবে।

কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।