নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ২৫০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)। উইমেনস হেলথ ইনিশিয়েটিভ নামের এ কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) জার্মানির রাজধানী বার্লিনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ দূতাবাস। জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জুলকার নাইন অনুষ্ঠানে আতিথ্য দেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জার্মানি সফররত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন রাহাত বিন জামান।
দূতাবাসের প্রথম সচিব ও হেড অব চ্যান্সারি এস এম মাজহারুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সঙ্গে অংশীদারত্ব এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ থেকে পর্যায়ক্রমে সরকারি ব্যয় ৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে। পাশাপাশি এক লাখ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাঁদের ৮০ শতাংশই নারী।
এ ছাড়া সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, চিকিৎসানির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যোন্নয়নকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে এ বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কর্মসূচির আওতায় মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা এবং জরুরি প্রসূতিসেবা উন্নত করা হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জেলা হাসপাতাল, রোগী স্থানান্তর ও রেফারেল ব্যবস্থা এবং নিবিড় পরিচর্যাসেবা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে মহামারি ও অন্যান্য জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও এ উদ্যোগ সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা বলেন, নারীর স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ পরিবার ও সমাজের সক্ষমতা বাড়ায় এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। নারীর স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিনের অর্থায়ন ঘাটতি পূরণে উদ্যোগটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কিটা। তিনি বলেন, এ কর্মসূচির মাধ্যমে লাখ লাখ নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘস্থায়ী উন্নতি আনা সম্ভব হবে।
ইউএনএফপিএ ও সংস্থাটির উদ্ভাবনী কর্মসূচি ‘উইমেনএক্স কালেকটিভ’ উদ্যোগটি প্রণয়নে সহায়তা করেছে। বাস্তবায়ন পর্যায়েও সংস্থাটি কারিগরি সহায়তা দেবে। কর্মসূচিটির কারিগরি সহায়তায় ইউএনএফপিএ অন্তত ২৫ মিলিয়ন ইউরো অনুদান সংগ্রহ করছে। এতে জার্মানির ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিএমজেড) এবং বেসরকারি খাতের অংশীদাররাও সহায়তা দিচ্ছে।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশে ডেঙ্গু, হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকারের নেওয়া কার্যক্রম তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ইউরোপীয় ইউনিয়নের মালিকানাধীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক।
অন্যদিকে, ইউএনএফপিএ জাতিসংঘের প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা। বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও অধিকার সুরক্ষায় কাজ করছে সংস্থাটি। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ইউএনএফপিএর অংশীদারত্ব শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিক, জার্মানির বিএমজেডের কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।


























