আজ শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৬%

শিকড় যত গভীরে যায় ছায়া তত বিস্তৃত হয়

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:44:35 pm, Friday, 2 October 2026
  • 9

শিকড় যত গভীরে যায় ছায়া তত বিস্তৃত হয়

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজের বিশাল এক ছাতা। কাছে গেলে চোখে পড়ে ডালপালা ছাপিয়ে মাটির দিকে নেমে এসেছে অসংখ্য ঝুরি। কোনোটি মাটিতে গেঁথে নতুন কাণ্ড হয়েছে, কোনোটি বাতাসে দুলছে। তার ছায়ায় পথিকের বিশ্রাম, শিশুদের ছোটাছুটি, প্রবীণদের আড্ডা আর ডালে পাখির আশ্রয়।

প্রকাণ্ড বটগাছ যেন নিজেই একটি ছোট্ট পৃথিবী। এমনই এক বটগাছের দেখা মেলে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার সিংজুরী ইউনিয়নের বৈলতলায়। বছরের পর বছর ঝড়-বৃষ্টি, রোদ-খরা পেরিয়েও দাঁড়িয়ে থাকা এই বটগাছ শুধু একটি বৃক্ষ নয়; এটি গ্রামবাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন ও স্মৃতির অংশ। এর ছায়ায় কত মানুষ ক্লান্তি ভুলেছেন, কত গল্পের জন্ম হয়েছে, কত প্রজন্ম বড় হয়েছে— তার হিসাব নেই।

বটগাছের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এর শিকড়। ডাল থেকে নেমে আসা ঝুরি মাটির স্পর্শ পেয়ে ধীরে ধীরে শক্ত হয়, একসময় নতুন কাণ্ডে পরিণত হয়। সেই কাণ্ড আবার নতুন ডাল ধারণ করে, নতুন ডাল থেকে নামে নতুন ঝুরি। এভাবেই একটি ছোট্ট গাছ একসময় মহীরুহে পরিণত হয়। মানুষের জীবনও অনেকটা এমন। জন্মের পর পরিবার, ভালোবাসা, শিক্ষা, সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতা তাকে শিকড়ের মতো আঁকড়ে ধরে।

সেই শিকড় যত শক্ত হয়, মানুষ তত দৃঢ় হয়ে ওঠে। একসময় যে শিশু অন্যের আশ্রয়ে বড় হয়, সে-ই পরিণত বয়সে হয়ে ওঠে পরিবারের আশ্রয়। বটগাছের ঝুরির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের যেন অদ্ভুত মিল! একটি শিকড় মাটিতে পৌঁছে নতুন কাণ্ড তৈরি করে; মানুষের পরিবারও তেমনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। পুরোনো সম্পর্কের শিকড় ধরে নতুন প্রজন্ম দাঁড়িয়ে থাকে।

ঝড় এলে বটগাছের ডাল ভাঙে, পাতা ঝরে। আবার কিছুদিন পর নতুন পাতা আসে, নতুন শিকড় মাটিতে নামে। মানুষের জীবনেও আসে দুঃসময়, হারানোর বেদনা, ভাঙন। কিন্তু শক্ত শিকড় মানুষকে আবার দাঁড়ানোর সাহস দেয়। তাই বটগাছ যেন শেখায়— ঝড়ে ডাল ভাঙতে পারে, কিন্তু শিকড় শক্ত থাকলে জীবন থেমে যায় না। বৈলতলার এই বটগাছ শুধু মানুষের নয়, পশুপাখিরও আশ্রয়।

তার ডালে অসংখ্য পাখির বাসা; ফল নানা প্রাণীর খাদ্য। বিস্তৃত ছায়ায় তৈরি হয় তুলনামূলক শীতল পরিবেশ। কার্যত একটি বড় বটগাছ অনেকটা ছোট্ট একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থার মতো। গ্রামবাংলার বটতলা তাই কেবল একটি স্থান নয়— এটি স্মৃতি ও সামাজিকতারও নাম। কোথাও সেখানে বসে মেলা, কোথাও আড্ডা, কোথাও পথিকের বিশ্রাম। পুরোনো বটগাছ হয়ে ওঠে একটি এলাকার নীরব ইতিহাসের সাক্ষী।

দ্রুত নগরায়ণ ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধনে যখন পুরোনো গাছ কমছে, তখন বটগাছ সংরক্ষণ শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ রেখে যাওয়ার দায়িত্ব। প্রাচীন এই বটগাছটির শিকড় মাটির গভীরে, ডালপালা আকাশজুড়ে। আর তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে যেন জীবনের এক সহজ সত্য ধরা দেয়— ‘নিজের জন্য বেড়ে ওঠা বড় হওয়ার শুরু; অন্যের জন্য ছায়া হয়ে ওঠাই বড় হওয়ার পূর্ণতা।

ফলে শিকড় যত গভীরে যায়, ছায়া তত বিস্তৃত হয়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

প্রতিষ্ঠার দুই দশকে নোবিপ্রবিতে বিদেশি শিক্ষার্থী মাত্র ১২ জন

শিকড় যত গভীরে যায় ছায়া তত বিস্তৃত হয়

Update Time : 10:44:35 pm, Friday, 2 October 2026

দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজের বিশাল এক ছাতা। কাছে গেলে চোখে পড়ে ডালপালা ছাপিয়ে মাটির দিকে নেমে এসেছে অসংখ্য ঝুরি। কোনোটি মাটিতে গেঁথে নতুন কাণ্ড হয়েছে, কোনোটি বাতাসে দুলছে। তার ছায়ায় পথিকের বিশ্রাম, শিশুদের ছোটাছুটি, প্রবীণদের আড্ডা আর ডালে পাখির আশ্রয়।

প্রকাণ্ড বটগাছ যেন নিজেই একটি ছোট্ট পৃথিবী। এমনই এক বটগাছের দেখা মেলে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার সিংজুরী ইউনিয়নের বৈলতলায়। বছরের পর বছর ঝড়-বৃষ্টি, রোদ-খরা পেরিয়েও দাঁড়িয়ে থাকা এই বটগাছ শুধু একটি বৃক্ষ নয়; এটি গ্রামবাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন ও স্মৃতির অংশ। এর ছায়ায় কত মানুষ ক্লান্তি ভুলেছেন, কত গল্পের জন্ম হয়েছে, কত প্রজন্ম বড় হয়েছে— তার হিসাব নেই।

বটগাছের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এর শিকড়। ডাল থেকে নেমে আসা ঝুরি মাটির স্পর্শ পেয়ে ধীরে ধীরে শক্ত হয়, একসময় নতুন কাণ্ডে পরিণত হয়। সেই কাণ্ড আবার নতুন ডাল ধারণ করে, নতুন ডাল থেকে নামে নতুন ঝুরি। এভাবেই একটি ছোট্ট গাছ একসময় মহীরুহে পরিণত হয়। মানুষের জীবনও অনেকটা এমন। জন্মের পর পরিবার, ভালোবাসা, শিক্ষা, সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতা তাকে শিকড়ের মতো আঁকড়ে ধরে।

সেই শিকড় যত শক্ত হয়, মানুষ তত দৃঢ় হয়ে ওঠে। একসময় যে শিশু অন্যের আশ্রয়ে বড় হয়, সে-ই পরিণত বয়সে হয়ে ওঠে পরিবারের আশ্রয়। বটগাছের ঝুরির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের যেন অদ্ভুত মিল! একটি শিকড় মাটিতে পৌঁছে নতুন কাণ্ড তৈরি করে; মানুষের পরিবারও তেমনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। পুরোনো সম্পর্কের শিকড় ধরে নতুন প্রজন্ম দাঁড়িয়ে থাকে।

ঝড় এলে বটগাছের ডাল ভাঙে, পাতা ঝরে। আবার কিছুদিন পর নতুন পাতা আসে, নতুন শিকড় মাটিতে নামে। মানুষের জীবনেও আসে দুঃসময়, হারানোর বেদনা, ভাঙন। কিন্তু শক্ত শিকড় মানুষকে আবার দাঁড়ানোর সাহস দেয়। তাই বটগাছ যেন শেখায়— ঝড়ে ডাল ভাঙতে পারে, কিন্তু শিকড় শক্ত থাকলে জীবন থেমে যায় না। বৈলতলার এই বটগাছ শুধু মানুষের নয়, পশুপাখিরও আশ্রয়।

তার ডালে অসংখ্য পাখির বাসা; ফল নানা প্রাণীর খাদ্য। বিস্তৃত ছায়ায় তৈরি হয় তুলনামূলক শীতল পরিবেশ। কার্যত একটি বড় বটগাছ অনেকটা ছোট্ট একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থার মতো। গ্রামবাংলার বটতলা তাই কেবল একটি স্থান নয়— এটি স্মৃতি ও সামাজিকতারও নাম। কোথাও সেখানে বসে মেলা, কোথাও আড্ডা, কোথাও পথিকের বিশ্রাম। পুরোনো বটগাছ হয়ে ওঠে একটি এলাকার নীরব ইতিহাসের সাক্ষী।

দ্রুত নগরায়ণ ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধনে যখন পুরোনো গাছ কমছে, তখন বটগাছ সংরক্ষণ শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ রেখে যাওয়ার দায়িত্ব। প্রাচীন এই বটগাছটির শিকড় মাটির গভীরে, ডালপালা আকাশজুড়ে। আর তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে যেন জীবনের এক সহজ সত্য ধরা দেয়— ‘নিজের জন্য বেড়ে ওঠা বড় হওয়ার শুরু; অন্যের জন্য ছায়া হয়ে ওঠাই বড় হওয়ার পূর্ণতা।

ফলে শিকড় যত গভীরে যায়, ছায়া তত বিস্তৃত হয়।