রাত ৮টা। রাজধানীর ব্যস্ত কাকলী মোড়। ওভারব্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশ। চারদিকে বাসের চাপ, রাস্তার পাশে সারি সারি ভাড়ার মোটরসাইকেল। অফিস শেষে ঘরমুখী মানুষের ভিড়ে ধীরগতির বাসে উঠতে রীতিমতো ঝুঁকি নিতে হচ্ছে যাত্রীদের।
উত্তরা থেকে গুলিস্তানগামী ‘এয়ারপোর্ট’ পরিবহনের বাসে উঠলেন রিতা নামে এক তরুণী। একই স্থান থেকে ওঠেন আরও চার-পাঁচজন যুবক। ওভারব্রিজ পার হতেই হঠাৎই এক যুবক মহিলা সিটে বসে থাকা তরুণীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে বাস থেকে লাফ দিয়ে নেমে যান। তরুণীর চিৎকারে বাসের দরজায় থাকা কয়েকজন যুবক তৎপর হয়ে ওঠেন। কিছু সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয় সংঘবদ্ধ চক্রের কারসাজি।
এর মধ্যেই বাসটির পেছনে দেখা যায় একই কোম্পানির আরেকটি বাস। শুরু হয় দুই বাসের পাড়াপাড়ি। ধাক্কায় ছিটকে যায় এক চলন্ত সিএনজি, তবু থামে না বাস দুটির দৌরাত্ম্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর সড়কে যাত্রী নিরাপত্তা প্রতিদিনই আরও বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তথ্য-উপাত্ত অনুসারে, বেপরোয়া যান চলাচলে রাজধানীসহ সারা দেশে নিয়মিত জানমালের ক্ষতি হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহে সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় সাতজন নিহত হন। সড়ক নিরাপত্তা নীতিমালা : নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনে যাত্রীরা আরও বেশি সুরক্ষা পাবেন বলে দাবি করা হচ্ছে। পাশাপাশি যানবাহন চালকদের বেপরোয়া আচরণ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রয়েছে অটো-সম্পর্কিত কঠোর নীতিমালাও। যদিও এসব আইনের সঠিক প্রয়োগ নিয়ে জনমনে রয়েছে দ্বিধা।
এদিকে রাজধানীজুড়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্কে সাধারণ মানুষ। ঢাকাজুড়ে তিন শতাধিক বিপজ্জনক স্থান চিহ্নিত হলেও ছিনতাই থামেনি। একই সঙ্গে প্রধান সড়কগুলোয় বন্ধ হচ্ছে না গণপরিবহনের বেপরোয়া চলাচল; বরং দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি ভোগান্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ বিচরণ। এসব অনুষঙ্গ জনজীবনকে করে তুলেছে অনিরাপদ।
তথ্য রয়েছে, রাজধানীর অটোচালকদের বিশাল অংশ মাদক, ছিনতাই-ডাকাতির মতো অপরাধের সঙ্গেও জড়িত। রাজধানীজুড়ে ছিনতাই : ছিনতাই এখন শুধু রাতের নির্জন সড়কে সীমাবদ্ধ নেই। দিনের আলো, ব্যস্ত সড়কে, চলন্ত রিকশায় কিংবা যানজটে আটকে থাকা বাসেও ঘটছে নিয়মিত ছিনতাই। মোবাইল বা ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া, ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টান কিংবা অস্ত্রের আঘাতে ঘটছে মৃত্যু ও অঙ্গহানির মতো ঘটনা।
গত ২৯ আগস্ট ভোরে রাজধানীতে ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দিলে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে যান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিন। গুরুতর আহত হয়ে পরে তার মৃত্যু হয়, যা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাজধানীজুড়ে ছিনতাইকালে পড়ে গিয়ে মৃত্যু বা কান ছিঁড়ে যাওয়াসহ মারাত্মক আঘাত পাওয়ার ঘটনা প্রায় নিয়মিতই ঘটছে। তবে গুরুতর আহত বা মৃত্যুর ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এলেও প্রতিদিনের ছোটখাটো অসংখ্য ছিনতাই ও অপরাধের ঘটনা থেকে যাচ্ছে আলোচনার বাইরে।
ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে মোবাইল, টাকা বা মানিব্যাগ নিয়ে যাওয়া কিংবা মুহূর্তের মধ্যে ফোন ছোঁ মেরে পালিয়ে যাওয়ার অনেক ঘটনা কেবল সিসিটিভি ফুটেজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছিনতাইয়ের অনেক ঘটনায় পুলিশ দস্যুতা বা ডাকাতির মামলা নেয়। আবার হয়রানির আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী থানায়ই যান না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোবাইল ছিনতাইয়ের অভিযোগও মামলা হিসেবে না নিয়ে ‘হারানো’ হিসেবে সাধারণ ডায়েরি করতে বলা হয়।
ফলে বাস্তবে ঘটে যাওয়া ছিনতাইয়ের একটি বড় অংশ সরকারি পরিসংখ্যানে ছিনতাই হিসেবে উঠে আসে না। তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়েছে এবং এসব মামলায় ৪০২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা দিয়ে রাজধানীতে মোট ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণের সুযোগ নেই।
কারণ মামলা হওয়ার ধরন, অপরাধের আইনি শ্রেণিবিন্যাস এবং ভুক্তভোগীর অভিযোগ করার প্রবণতা— সবকিছুতেই পার্থক্য রয়েছে; বরং এসব পরিসংখ্যানই একটি বড় সমস্যাকে সামনে আনে— রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণের জন্য এখনো একক, পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার নেই। বাসের ভেতরেও নিরাপদ নয় : শুধু রাস্তা নয়, নিরাপদ নয় গণপরিবহনও।
বনানী, কাকলী, মহাখালী, নিউমার্কেট থেকে গাবতলী, টঙ্গী থেকে আব্দুল্লাহপুর কিংবা যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন রুটের লোকাল বাসে যাত্রীদের মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী আবার পুলিশে অভিযোগই করেন না। ফলে নথিভুক্ত না হওয়া এসব ঘটনা থেকে যায় হিসাবের বাইরে। আর ছিনতাইয়ের সময় বাধা দিলে ঘটছে হামলার ঘটনাও; অর্থাৎ কয়েক হাজার টাকার একটি মোবাইল ফোন কিংবা মানিব্যাগের জন্য ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষের জীবন।
একই সঙ্গে যেসব সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই, সেসব জায়গায় ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের ধরতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, অভিযানের খবর অনেক সময় আগে থেকেই ফাঁস হয়ে যায়। ফলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সরে পড়ে অপরাধীরা। যানজটে অভিনব ছিনতাই : যানজটে আটকে থাকা বাসের জানালা থেকে মোবাইল ছোঁ মেরে নেওয়া নিয়মিত ঘটনা।
বাস থেমে গেলে বা ধীরে চলার সময় জানালার পাশে বসে ফোন ব্যবহারকারী যাত্রীকে লক্ষ করে ছিনতাইকারীরা। কাকলী, মহাখালী, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, আসাদ গেট, নিউমার্কেট, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী ও এর আশপাশের এলাকায় এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বেশি। তবে কোন এলাকায় বাসের জানালা দিয়ে সবচেয়ে বেশি মোবাইল ছিনতাই হয়— এমন কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে অভিযোগ নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়াও। বনানীর কাকলী এলাকায় বিভিন্ন সময়ে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন অন্তত দুই সংবাদকর্মী। একই এলাকায় আরও একাধিক ব্যক্তি একই ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, থানায় গিয়ে ছিনতাইয়ের মামলা করতে চাইলেও তাদের ক্ষেত্রে মামলা না নিয়ে করা হয়েছে সাধারণ ডায়েরি।
সেখানে ছিনতাইয়ের কথা উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, ফোন ‘হারিয়ে গেছে’। গ্রেপ্তারের পরও ফিরে আসে অপরাধীরা : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, আগের তুলনায় ছিনতাই কমেছে। তালিকা ধরে অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তারের অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধীরা।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বেকারত্ব ছিনতাই বাড়ার অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা। তাই ঢাকায় ছিনতাই ঠেকাতে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অপরাধপ্রবণ এলাকাভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা, পর্যাপ্ত সড়কবাতির ব্যবস্থা, গণপরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুলিশের অভিযানের তথ্যের সুরক্ষা এবং গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, একটি মেগাসিটির নিরাপত্তা শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান কমছে কি না, তা দিয়ে মাপা যায় না। দিনের আলো কিংবা রাতের অন্ধকারে ঢাকার মানুষ ভয় ছাড়াই ঘরে ফিরতে পারছেন কি না— নিরাপত্তার আসল পরীক্ষা সেখানেই। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের তথ্যে রাজধানীর তিন শতাধিক স্থান ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যার মধ্যে অর্ধশতাধিক এলাকায় তুলনামূলক বেশি ছিনতাইয়ের তথ্যও তাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে; অর্থাৎ কোথায় ঝুঁকি রয়েছে, সে সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা রয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. ছালেহউদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অপরাধীদের অনেকেই ছদ্মবেশে অটো চালায়। অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে শহর-নগর ও বন্দরে গিয়ে পরিচয় গোপন করে অটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।
তারা নতুন এলাকায় গিয়ে আবারও অপরাধে জড়ায়। এমন ঘটনায় গ্রেপ্তারের উদাহরণও আছে। ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক সর্দার মোহাম্মদ তারিকুল বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালনে কষ্ট হলেও অনবরত কাজ করে যাচ্ছে। ঢাকায় ২ কোটির অধিক মানুষের বসবাস। সেখানে ৩-৪ হাজার ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। পাশাপাশি মানুষ এখনো শতভাগ সচেতন নয়।
তবুও আমরা দায়িত্ব পালন করে চলছি। সবচেয়ে বেশি জরুরি সবার সচেতনতা। যখন চালক-পথচারী উভয়ই আইন মানবেন এবং সিগন্যাল মানবেন, তখনই সম্ভব হবে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।























