আজ শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৬%

এমপি পদের পর এবার দলও ছাড়তে হচ্ছে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:58:57 pm, Friday, 2 October 2026
  • 10

এমপি পদের পর এবার দলও ছাড়তে হচ্ছে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

এক সপ্তাহ আগেও ক্ষমতাসীন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসন-২৩-এর সংসদ সদস্য ছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। দলীয় রাজনীতিতেও তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কিন্তু মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসার পর দ্রুত বদলে যেতে থাকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। প্রথমে ওঠে অভিযোগ, এরপর শুরু হয় তদন্ত। এরই মধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করেন মিষ্টি। এবার দলের হাইকমান্ড থেকে তাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে মিষ্টি নিজে এবং বিএনপির ঊর্ধ্বতন মহল থেকে কেউ কোনো মন্তব্য করেননি। এদিকে রাড্ডার ঘটনায় চলছে তদন্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিপূর্বেই বলেছেন, তদন্তে প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ অপরাধের প্রমাণ সামনে এলে গ্রেপ্তারও হতে পারেন মিষ্টি। জানা গেছে, রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির অবস্থান মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বদলে গেছে।

এর পেছনে মূলত প্রভাব ফেলেছে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখল ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। কেউ কেউ বলছেন, রাড্ডাকাণ্ডের ‘পাপে’ পতন হয়েছে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির। তাসের ঘরের মতো একে একে ভেঙে চুরমার হচ্ছে তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দাপট। এখন শুধু কৃতকর্মের পরবর্তী ফলভোগের অপেক্ষা। বিএনপির মিরপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির দীর্ঘ ভূমিকা ছিল।

২০০২ সালে স্বামী সাইদুর রহমান নিউটন নিহত হওয়ার পর তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তার স্বামীও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। মিষ্টি প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন। মিষ্টির সংসদীয় যাত্রাও খুব সংক্ষিপ্ত।

চলতি বছরের মে মাসে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এর প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় গত ১ অক্টোবর পদত্যাগের মাধ্যমে তার সংসদীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের পর মিষ্টির সামনে দলীয় রাজনীতিতে থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু গতকাল শুক্রবার নতুন করে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগের নির্দেশের খবর এসেছে।

এর আগে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। মিষ্টি ওই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সংসদ সদস্য পদ, মহানগর উত্তর কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ হারানোর পর এখন দলীয় প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে। সূত্র জানায়, সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর সামনে আরও কঠিন সংকট মোকাবিলা করতে হতে পারে মিষ্টিকে।

এমনকি তার গ্রেপ্তার হওয়ার ইঙ্গিতও মিলছে। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কয়েকটি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার বেশকিছু ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, ওই রাতে দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে ঢুকে হামলা চালায়।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। স্বাস্থ্যসেবার সরঞ্জাম, ওষুধসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায়। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সমিতির সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার নাম সামনে আসে।

এ ঘটনায় হওয়া মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ১২ জন। তদন্ত চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। রাড্ডা ঘটনার তদন্তে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নাম সামনে আসাতেই মিষ্টির সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তাদের কয়েকজন মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলেও জানায় স্থানীয় সূত্র।

রাড্ডা সেন্টারের ঘটনা তদন্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জমি নিয়ে পুরোনো একটি বিরোধ। ১৯৭০-এর দশক থেকে মিরপুরের দরিদ্র মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। কেন্দ্রটির জায়গাটি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে জমিটি পেতে আগ্রহী ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’।

এ নিয়ে রাড্ডার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরোধ চলছিল। ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকার সময় মিষ্টি ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে করা একটি আবেদনে সভাপতি হিসেবে তার স্বাক্ষরও রয়েছে। মিষ্টি অবশ্য বর্তমানে ওই সমিতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

ফলে ২০০৬ সালের ওই আবেদন এবং ২০২৬ সালের হামলার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, থাকলে তার প্রকৃতি কী— সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের পর মিষ্টিকে ঘিরে যে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, তা কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে সংসদীয় ও দলীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

প্রথমে অভিযোগ, এরপর তদন্তের ঘোষণা। তারপর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তি ও একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ। আর এখন বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগের নির্দেশের খবর। রাড্ডা ঘটনার পর বিএনপির সাংগঠনিক পদক্ষেপের তালিকাও বড় হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

ওই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। একই রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতদের মধ্যে বিএনপির তিনজন, ছাত্রদলের পাঁচজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুজন এবং শ্রমিক দলের চারজন রয়েছেন।

বিএনপির তিনজন হলেন— শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কু। এর আগের দিন, ২৯ সেপ্টেম্বর পল্লবী থানার ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মোট ১৫ জনের বিরুদ্ধে বহিষ্কারমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৪ জনকে বহিষ্কারের দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনবিরোধী, অনৈতিক ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্তির ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। জানা গেছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে হামলায় কারা রাড্ডা সেন্টারে গিয়েছিল, কীভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হলো, কারা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে গেল এবং স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

মিষ্টির বিরুদ্ধে বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা দুটি আলাদা বিষয়। দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া, বহিষ্কার করা বা প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ। অন্যদিকে ফৌজদারি অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত, গ্রেপ্তার, মামলা, অভিযোগপত্র এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

রাড্ডাকাণ্ডের তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষেই জানা যাবে কার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে আসামি হিসেবেই দেশে ফিরতে হবে: ডা. শাহাদাত

এমপি পদের পর এবার দলও ছাড়তে হচ্ছে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে

Update Time : 10:58:57 pm, Friday, 2 October 2026

এক সপ্তাহ আগেও ক্ষমতাসীন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসন-২৩-এর সংসদ সদস্য ছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। দলীয় রাজনীতিতেও তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কিন্তু মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসার পর দ্রুত বদলে যেতে থাকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। প্রথমে ওঠে অভিযোগ, এরপর শুরু হয় তদন্ত। এরই মধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করেন মিষ্টি। এবার দলের হাইকমান্ড থেকে তাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে মিষ্টি নিজে এবং বিএনপির ঊর্ধ্বতন মহল থেকে কেউ কোনো মন্তব্য করেননি। এদিকে রাড্ডার ঘটনায় চলছে তদন্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিপূর্বেই বলেছেন, তদন্তে প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ অপরাধের প্রমাণ সামনে এলে গ্রেপ্তারও হতে পারেন মিষ্টি। জানা গেছে, রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির অবস্থান মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বদলে গেছে।

এর পেছনে মূলত প্রভাব ফেলেছে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখল ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। কেউ কেউ বলছেন, রাড্ডাকাণ্ডের ‘পাপে’ পতন হয়েছে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির। তাসের ঘরের মতো একে একে ভেঙে চুরমার হচ্ছে তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দাপট। এখন শুধু কৃতকর্মের পরবর্তী ফলভোগের অপেক্ষা। বিএনপির মিরপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির দীর্ঘ ভূমিকা ছিল।

২০০২ সালে স্বামী সাইদুর রহমান নিউটন নিহত হওয়ার পর তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তার স্বামীও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। মিষ্টি প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন। মিষ্টির সংসদীয় যাত্রাও খুব সংক্ষিপ্ত।

চলতি বছরের মে মাসে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এর প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় গত ১ অক্টোবর পদত্যাগের মাধ্যমে তার সংসদীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের পর মিষ্টির সামনে দলীয় রাজনীতিতে থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু গতকাল শুক্রবার নতুন করে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগের নির্দেশের খবর এসেছে।

এর আগে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। মিষ্টি ওই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সংসদ সদস্য পদ, মহানগর উত্তর কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ হারানোর পর এখন দলীয় প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে। সূত্র জানায়, সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর সামনে আরও কঠিন সংকট মোকাবিলা করতে হতে পারে মিষ্টিকে।

এমনকি তার গ্রেপ্তার হওয়ার ইঙ্গিতও মিলছে। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কয়েকটি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার বেশকিছু ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, ওই রাতে দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে ঢুকে হামলা চালায়।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। স্বাস্থ্যসেবার সরঞ্জাম, ওষুধসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায়। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সমিতির সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার নাম সামনে আসে।

এ ঘটনায় হওয়া মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ১২ জন। তদন্ত চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। রাড্ডা ঘটনার তদন্তে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নাম সামনে আসাতেই মিষ্টির সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তাদের কয়েকজন মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলেও জানায় স্থানীয় সূত্র।

রাড্ডা সেন্টারের ঘটনা তদন্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জমি নিয়ে পুরোনো একটি বিরোধ। ১৯৭০-এর দশক থেকে মিরপুরের দরিদ্র মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। কেন্দ্রটির জায়গাটি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে জমিটি পেতে আগ্রহী ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’।

এ নিয়ে রাড্ডার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরোধ চলছিল। ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকার সময় মিষ্টি ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে করা একটি আবেদনে সভাপতি হিসেবে তার স্বাক্ষরও রয়েছে। মিষ্টি অবশ্য বর্তমানে ওই সমিতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

ফলে ২০০৬ সালের ওই আবেদন এবং ২০২৬ সালের হামলার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, থাকলে তার প্রকৃতি কী— সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের পর মিষ্টিকে ঘিরে যে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, তা কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে সংসদীয় ও দলীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

প্রথমে অভিযোগ, এরপর তদন্তের ঘোষণা। তারপর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তি ও একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ। আর এখন বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগের নির্দেশের খবর। রাড্ডা ঘটনার পর বিএনপির সাংগঠনিক পদক্ষেপের তালিকাও বড় হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

ওই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। একই রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতদের মধ্যে বিএনপির তিনজন, ছাত্রদলের পাঁচজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুজন এবং শ্রমিক দলের চারজন রয়েছেন।

বিএনপির তিনজন হলেন— শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কু। এর আগের দিন, ২৯ সেপ্টেম্বর পল্লবী থানার ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মোট ১৫ জনের বিরুদ্ধে বহিষ্কারমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৪ জনকে বহিষ্কারের দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনবিরোধী, অনৈতিক ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্তির ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। জানা গেছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে হামলায় কারা রাড্ডা সেন্টারে গিয়েছিল, কীভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হলো, কারা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে গেল এবং স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

মিষ্টির বিরুদ্ধে বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা দুটি আলাদা বিষয়। দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া, বহিষ্কার করা বা প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ। অন্যদিকে ফৌজদারি অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত, গ্রেপ্তার, মামলা, অভিযোগপত্র এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

রাড্ডাকাণ্ডের তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষেই জানা যাবে কার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে।