সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের সঙ্গে খসড়া কনসেশন চুক্তির অনুমোদন দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছেন আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বন্দর রক্ষা পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহীম খোকন এবং বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রামের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু পৃথক বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানান।
এর আগে রাজধানীর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং এর আওতাধীন ওভারফ্লো ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের খসড়া কনসেশন চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে।
এতে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দাখিল করা প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) প্রকল্পের আওতায় ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো ইয়ার্ড (ওসিওয়াই)-এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) এ চুক্তি সম্পাদন করবে।
বন্দর রক্ষা পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা মনে করি বহুজাতিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি করা হলে দেশ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এনসিটি থেকে অর্জিত টাকা বিদেশে চলে যাবে, দেশ অর্থনৈতিক মুদ্রার সংকটের মুখে পড়বে। চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মচারীরা কর্ম হারাবে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।
দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে দেশের একমাত্র সমুদ্রবন্দর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটির মাধ্যমে অর্জিত আয় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং নিট আয় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই আয় থেকে সরকার ২৫ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স বাবদ পেয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা এবং ভ্যাট পেয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা প্রায়।
বহুজাতিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দিলে সরকার উক্ত আয় থেকে বঞ্চিত হবে, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাবে এবং কনসেশন চুক্তির কারণে এনসিটিতে বিপজ্জনক পণ্য খালাসেরও আশঙ্কা রয়েছে। তাঁরা আশা করি দেশ ও জাতির স্বার্থে সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।
বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রামের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় মূল এজেন্ডায় না থাকা সত্ত্বেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি বিষয় ‘বিবিধ’ এজেন্ডার মাধ্যমে উত্থাপন করে ওভারফ্লো ইয়ার্ডসহ কনসেশন চুক্তির আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। এই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত শুধু একটি বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান, বন্দর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, জনস্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থাকা প্রয়োজন। অথচ মূল এজেন্ডার বাইরে ‘বিবিধ’ এজেন্ডার মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সম্পদ ও কৌশলগত বন্দর অবকাঠামোর মতো বিষয়ে কেন বিষয়টি মূল এজেন্ডায় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন ও আলোচনা করা হলো না—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা সরকারের কাছ থেকে দেশবাসী প্রত্যাশা করে।
ইজারা পদ্ধতির মধ্যে কনসেশন চুক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা কাঠামো। এর মাধ্যমে শুধু একটি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় না; চুক্তির শর্তের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিচালনা, রাজস্ব, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ওপর একটি বেসরকারি বা বিদেশি অপারেটরের প্রভাব তৈরি হতে পারে। ফলে চুক্তির প্রতিটি ধারা, আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব ভাগাভাগি, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, ঝুঁকি বণ্টন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার শর্ত জনসম্মুখে প্রকাশ ও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এনসিটি এমন একটি স্থাপনা, যা ইতোমধ্যে দেশের বন্দর অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছে। ফলে রাষ্ট্রের বিনিয়োগে নির্মিত ও পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠিত টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি কনসেশনের আওতায় দেওয়ার আগে রাষ্ট্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এর সক্ষমতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা যাচাই করেছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য কনসেশন থেকে রাষ্ট্র কী পরিমাণ আর্থিক সুবিধা পাবে এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করলে সম্ভাব্য আয় কত হতে পারে—তার তুলনামূলক হিসাবও জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।
কনসেশন চুক্তির মাধ্যমে এনসিটি ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জনগণের স্বার্থ ও দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বন্দর রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু চট্টগ্রামের সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। দেশের প্রায় সমগ্র বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান সমুদ্রপথ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমের সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতি সরাসরি সম্পৃক্ত।
তাই এই বন্দরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দীর্ঘমেয়াদি কনসেশনের আওতায় দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু বর্তমান সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব আগামী একাধিক সরকারের সময়েও বহাল থাকবে। সে কারণে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাড়াহুড়ার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ এনসিটি কনসেশন চুক্তির বিষয়ে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরে বলেন, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া ও আর্থিক কাঠামো জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে, স্বাধীনভাবে অর্থনৈতিক ও কারিগরি মূল্যায়ন করতে হবে, শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের বিষয়ে সুস্পষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে তারা এনসিটি পরিচালনায় দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থাপনা কাঠামোও বিবেচনা করার আহ্বান জানান। এনসিটি কনসেশন চুক্তির সিদ্ধান্ত বাতিল, চুক্তির সব শর্ত প্রকাশ এবং জাতীয় স্বার্থের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় বন্দর রক্ষা কমিটি।





















