চট্টগ্রাম বন্দরে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ও তথ্য ব্যবহার করে পণ্য আমদানির অভিযোগে একটি সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। একটি কনটেইনারে থাকা দুটি বিল অব লেডিং (বি/এল) কায়িক পরীক্ষা করে প্রায় ৮.২৫ মেট্রিক টন তামাক বা তামাকসদৃশ সামগ্রী, বিভিন্ন রঙের সন্দেহজনক পাউডারজাত পদার্থ এবং ঘোষণার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রায় ৯.২৬ মেট্রিক টন স্ক্র্যাপ পেপার পাওয়া গেছে।
চালানটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কাগজপত্রে আমদানিকারক বা কনসাইনি হিসেবে ‘Authoy Enterprise’-এর নাম থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তিনি বা তার প্রতিষ্ঠান এ আমদানির বিষয়ে সম্পূর্ণ অনবহিত। তাঁর দাবি, কোনো অসাধু চক্র তার প্রতিষ্ঠানের নাম ও আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে চালানটি এনেছে।
কাস্টমস নথি অনুযায়ী, ম্যানিফেস্ট নম্বর ৪৫২৪/২০২৬ এবং ভয়েজ নম্বর ০১১-এর আওতায় ‘এমভি উদ্দীপন এক্সপ্রেস’ জাহাজে কলকাতা থেকে চালানটি আসে। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাহাজটি যাত্রা করে এবং ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। একই মাস্টার বি/এল ৩০১১৭৪৩৪৭-এর অধীনে দুটি হাউস বি/এলের মাধ্যমে পণ্যগুলো আমদানি দেখানো হয়। প্রথম হাউস বি/এল নম্বর ISLCCU2627CGP095-এ পণ্যের ঘোষণা ছিল ‘PAN MASALA AND ZARDA (CHEWING TOBACCO PRODUCT)’।
নথিতে ৪৭৩ প্যাকেজের মোট ওজন ৮ হাজার ৯৭৪ কেজি উল্লেখ করা হয়। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর কায়িক পরীক্ষায় ৪৭০ প্যাকেজে মোট ৮ হাজার ২৫০ দশমিক ৪ কেজি বা প্রায় ৮.২৫ মেট্রিক টন তামাক বা তামাকসদৃশ সামগ্রী পাওয়া যায়। এর মধ্যে ডার্ক ব্রাউন রঙের ৪২১ প্যাকেজে ৭ হাজার ৩২৫ দশমিক ৪ কেজি, ব্রাউন রঙের ৩১ প্যাকেজে ৫২৭ কেজি, গ্রে রঙের ১৩ প্যাকেজে ২৭৩ কেজি এবং সাদা রঙের পাঁচ প্যাকেজে ১২৫ কেজি পণ্য পাওয়া গেছে।
পরীক্ষার সময় উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন রঙের পাউডারজাত পদার্থ বাহ্যিকভাবে মাদকদ্রব্যের মতো সন্দেহজনক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে এসব পদার্থে কোনো মাদকদ্রব্য কিংবা নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত উপাদান রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। রাসায়নিক ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পরই পদার্থগুলোর প্রকৃত পরিচয় ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় হাউস বি/এল নম্বর ISLCCU2627CGP096-এ পণ্যের ঘোষণা ছিল ‘PRINTED PAPER CATALOGUE’।
নথিতে ১ হাজার ৫৭০ প্যাকেজের মোট ওজন ৯ হাজার ৮৫৯ দশমিক ৬০ কেজি উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় একই সংখ্যক প্যাকেজে পাওয়া যায় সন্দেহজনক স্ক্র্যাপ পেপার, যার ওজন ৯ হাজার ২৬৩ কেজি বা প্রায় ৯.২৬ মেট্রিক টন। ফলে ঘোষিত ‘Printed Paper Catalogue’-এর পরিবর্তে বাস্তবে স্ক্র্যাপ পেপার পাওয়ায় পণ্যের প্রকৃতি, শ্রেণিবিন্যাস ও ঘোষণার যথার্থতা নিয়ে গুরুতর অসামঞ্জস্যের বিষয়টি তদন্তের আওতায় এসেছে।
দুটি বি/এল মিলিয়ে কায়িক পরীক্ষায় মোট ২ হাজার ৪০টি প্যাকেজে ১৭ হাজার ৫১৩ দশমিক ৪ কেজি বা প্রায় ১৭.৫১ মেট্রিক টন পণ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮.২৫ মেট্রিক টন তামাক বা তামাকসদৃশ সামগ্রী এবং সন্দেহজনক পাউডারজাত পদার্থ রয়েছে। পাশাপাশি পাওয়া গেছে প্রায় ৯.২৬ মেট্রিক টন স্ক্র্যাপ পেপার।
চালানটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, কাগজপত্রে ‘Authoy Enterprise’-কে আমদানিকারক বা কনসাইনি হিসেবে দেখানো হলেও প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তিনি এ আমদানির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে অপরিচিত এবং চালানটির সঙ্গে তাঁর বা তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা নেই।
তিনি আশঙ্কা করেছেন, কোনো অসাধু চক্র তার প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও ব্যবসায়িক নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে এ চালান আমদানি করেছে। একই সঙ্গে প্রকৃত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। এ ঘটনায় চালানে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের অসামঞ্জস্য, আমদানিকারকের পরিচয় ব্যবহার, তামাকসদৃশ সামগ্রীর প্রকৃতি এবং সন্দেহজনক পাউডারজাত পদার্থের রাসায়নিক পরিচয়—সবকিছুই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল এবং পরবর্তী তদন্তের ভিত্তিতেই এসব পণ্যের প্রকৃত পরিচয় ও চালানটির সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।



















