শিল্পাঞ্চল-অধ্যুষিত এলাকাগুলোর সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস অভিনব কায়দায় সিলিন্ডারে ভরে শিল্পকারখানা ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরবরাহের অভিযোগ দীর্ঘদিনের; বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন শিল্প এলাকায় এ ধরনের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত সিএনজি এভাবে অন্য কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি উচ্চচাপের গ্যাসভর্তি বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার পরিবহন করায় বাড়ছে বিস্ফোরণের ঝুঁকি। সিএনজি নিতে ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করছেন অনেক চালক। অথচ একই স্টেশন থেকে বের হয় সিলিন্ডারভর্তি ভ্যান ও কাভার্ডভ্যান।
গন্তব্য শিল্পকারখানা। সেখানে এসব গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে বয়লার ও উৎপাদন কাজে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খোলা বা অননুমোদিত পদ্ধতিতে সিলিন্ডারে উচ্চচাপের সিএনজি ভরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিবহন করা হচ্ছে। কোথাও দিনের আলোতেই চলছে এ কার্যক্রম। আবার কোনো কোনো স্থানে সন্ধ্যার পর বাড়ে তৎপরতা। গত রোববার আশুলিয়ার জামগড়ায় সিলিন্ডারবাহী গাড়িতে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে আটজনের মৃত্যুর ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
ওই দিন সন্ধ্যায় প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইলের কারখানা চত্বরে ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আরও অন্তত ১৬ জন আহত হন। সাভার-আশুলিয়া দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ডাইং, ওয়াশিংসহ বিভিন্ন কারখানায় বয়লার ও উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে নিয়মিত জ্বালানি প্রয়োজন। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ অবস্থায় কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে সিলিন্ডারে সিএনজি সরবরাহের একটি অননুমোদিত ব্যবস্থা। শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখার তাগিদে কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। তবে বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, উচ্চচাপের গ্যাসভর্তি বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার ভ্যান বা কাভার্ডভ্যানে পরিবহন করে কারখানায় ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিল্পকারখানায় গ্যাস নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে সাজানো কাভার্ডভ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব গাড়ির ভেতরে সারি করে রাখা হয় গ্যাস সিলিন্ডার। এর সঙ্গে বিশেষ ধরনের নজেল বা সংযোগব্যবস্থা যুক্ত থাকে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার ওপায় নেই, কাভার্ডভ্যানে করে কারখানার জন্য গ্যাস সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সিলিন্ডারভর্তি গাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন কারখানায়।
সেখানে গ্যাস নেওয়া হয় নির্দিষ্ট চেম্বারে। এরপর তা বয়লার বা উৎপাদনকাজে ব্যবহার করা হয়। জামগড়া এলাকার দুর্ঘটনায় এই ব্যবস্থার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই কারখানায় গ্যাস পরিবহনের জন্য ১২টি কাভার্ডভ্যান ছিল। প্রতিটি গাড়িতে প্রায় ৯০টি করে সিলিন্ডার রাখা হতো। একটি গাড়িতে কয়েক ডজন উচ্চচাপের সিলিন্ডার একসঙ্গে থাকলে দুর্ঘটনার সময় ক্ষয়ক্ষতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, জামগড়ার ঘটনা তারই উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক (ঢাকা) মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, এভাবে গ্যাস ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের কোনো আইন বা বিধানে এ পদ্ধতি অনুমোদিত নয়। তিনি জানান, এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে সিএনজি স্টেশনগুলোয় নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এসব অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে কাভার্ডভ্যান জব্দ করা হয়েছে।
ঢাকায়ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কোনো কোনো এলাকায় সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহের তৎপরতা বেড়ে যায়। যানবাহনের জন্য নির্ধারিত মূল্যে সিএনজি বিক্রির পরিবর্তে খোলা সিলিন্ডারে ভরে বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। বর্তমানে যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির পাম্পমূল্য প্রতি ঘনমিটার ৪৩ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অননুমোদিতভাবে সিলিন্ডারে ভরা গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রাইভেট কারের চালক আকরাম খান বলেন, তিনি প্রায়ই গেন্ডা এলাকার একটি পাম্প এবং রেডিও কলোনি এলাকার একটি পাম্পে গ্যাস নিতে যান। প্রায় রাতেই কাভার্ডভ্যানে করে অভিনব কায়দায় গ্যাস নিতে দেখা যায়, এমন দাবি তার। একসময় গভীর রাতে গোপনে ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানে করে সিলিন্ডার পরিবহনের অভিযোগ ছিল।
এখন শিল্পাঞ্চলের কোথাও কোথাও দিন-রাতই এ কার্যক্রম চলছে বলে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুলসংখ্যক উচ্চচাপের সিলিন্ডার একসঙ্গে পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হলে সামান্য ত্রুটি থেকেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে; বিশেষ করে কারখানার ভেতরে শ্রমিক ও আশপাশে বসতি থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। গত রোববার সন্ধ্যায় আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের একটি কারখানা চত্বরে সিলিন্ডারবাহী গাড়িতে বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এই ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আটজন নিহত ও ১৬ জন আহত হওয়ার খবর মিলেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপসহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান জানান, কারখানাটিতে ১২ কাভার্ডভ্যানে ৯০টি করে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন করা হতো। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গাড়িতে পরিবহন করা গ্যাস কারখানার গ্যাস চেম্বারে নেওয়া হতো।
পরে তা বয়লার পরিচালনায় ব্যবহার করা হতো। এভাবে কাভার্ডভ্যানে বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার পরিবহন ও ব্যবহার নিরাপদ কি না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। এ ধরনের গ্যাস ব্যবস্থাপনার অনুমোদন, কারখানার নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং পরিবহনের বৈধতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে। আশুলিয়া থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল করে ওই কারখানায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নই।
তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।





















