আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে দেশের বাজারে আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম। গত রোববার মাঝরাতে একলাফে প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয় ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের মূল্যবৃদ্ধি শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নির্মাণ, খাদ্য সরবরাহ থেকে শুরু করে প্রায় পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে; বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহন ও কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে উল্লেখযোগ্য হারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।
নিত্যপণ্যের বাজারে লাগামহীন দামে জনগণের নাভিশ্বাস ওঠার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের হাতে দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল না বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে বিমার প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। এ অবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের পক্ষে এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। ’ শুধু তা-ই নয়, পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম কম হওয়ায় পাচার ঠেকাতেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
একলাফে ২০ টাকা : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। শতকরা হিসাবে ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ, অকটেনের ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ, পেট্রোলের ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কেরোসিনের ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
এটি চলতি বছরের তৃতীয় দফা বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি। এর আগে এপ্রিল মাসে ডিজেলের দাম ১৫, অকটেন ২০, পেট্রোল ১৯ ও কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। জুনেও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। ফলে বছরের শুরু থেকে কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধির পর এবার ভোক্তাদের ওপর জ্বালানি ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ল। মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ : অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর দ্বিতীয় দফার প্রভাব।
জ্বালানি তেলের দাম সরাসরি বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়তে পারে; বিশেষ করে ডিজেল দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহৃত জ্বালানি। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, বাস, কৃষিযন্ত্র, নৌযান, নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করলে শেষ পর্যন্ত চাপ পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, তাতে নতুন করে ধাক্কা আসবে সরকারের এ সিদ্ধান্তে। এটা সত্যি যে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের হাতে বিকল্প কোনো উপায় ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে দাম বৃদ্ধি যৌক্তিক হলেও নিত্যপণ্যের বাজার অসহনীয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে সমন্বয় করলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বিস্তৃত হতে পারে। আবার দাম না বাড়ালে উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমে যেতে পারে। ’ অপর জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই দাম বাড়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে।
বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লঞ্চসহ ডিজেলনির্ভর যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। এর আগে এপ্রিলের মূল্যবৃদ্ধির পরই ঢাকায় রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া বেড়ে যাওয়ার ঘটনা দেখা গিয়েছিল। তখন বিভিন্ন যাত্রীর অভিজ্ঞতায় স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির কথা উঠে আসে। এবারের বৃদ্ধির মাত্রা আরও বেশি হওয়ায় পরিবহন খাতে নতুন করে ভাড়া সমন্বয়ের দাবি উঠতে পারে।
ভাড়া বাড়লে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয়ও বাড়বে। শুধু তা-ই নয়, দেশের কৃষি উৎপাদনে সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে ডিজেলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সেচপাম্প, পাওয়ার টিলার, ধান কাটার মেশিনসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে; বিশেষ করে সেচনির্ভর বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তীব্র।
উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষক পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু শহরের পরিবহন ব্যয় নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্যবাজারেও প্রভাব ফেলবে। সব মিলিয়ে আমি বলব, সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে বাজারে আগুন লেগে গেল। ’ শিল্প খাতে আরও বাড়বে চাপ : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় শিল্প খাতেও উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে; বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব পরিবহন, ডিজেলচালিত জেনারেটর বা অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে, তাদের খরচ বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে দেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে দাবি করে পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে এমনিতেই গ্যাস সংকটে ধুঁকছে শিল্প কারখানাগুলো। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ালেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। তবুও আমরা চালিয়ে নিচ্ছিলাম।
কিন্তু এখন তেলের রেকর্ড দাম বৃদ্ধিতে আমাদের পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে। অনেক কারখানা আছে ডিজেলচালিত মেশিন দিয়ে চলে, তাদের পথে বসতে হবে। এমন পরিস্থিতি কত দিন চলবে, আমরা কেউ জানি না। শিল্প খাত না টিকলে তো দেশ টিকবে না, সরকারকে এটা বুঝতে হবে। ’ সাধারণ মানুষের কাঁধে বাড়তি বোঝা : জ্বালানির এই বাড়তি দামের ধাক্কায় পরিবহন, কৃষি, খাদ্য ও শিল্প খাত থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তার সংসার— সর্বত্রই পড়েছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ।
অর্থনীতির ভাষায় জ্বালানি তেলের এ মূল্যবৃদ্ধি মূলত ‘কস্ট পুশ’ বা ব্যয়-চালিত মূল্যস্ফীতির প্রধান উৎস। ফলে বাজারের এক প্রান্তে যে আগুন জ্বলে, উত্তাপ নিমেষেই ছড়িয়ে পড়ে সব প্রান্তে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। জ্বালানি তেলের দাম একলাফে বাড়ার পর গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায় দামের পরিবর্তন। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম পরিবহন খরচে পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।
রাজধানীর নবাবগঞ্জ, নিউমার্কেট, হাতিরপুলসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব ধরনের শাক-সবজি ও কাঁচা বাজারের দাম কেজিতে বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। তবে ডিম, মাংস, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, তেলের দামে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নতুন জ্বালানি দরে পরিবহন খরচের হিসাব পুরোপুরি যুক্ত হয়নি।
হাতিরপুলে বাজার করতে আসা তন্ময় কুমার বলেন, ‘রাতে তেলের নতুন দাম ঘোষণা করার পর সকালেই সবজির দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকার বেশি। একশো টাকার নিচে কোনো সবজিই বাজারে পাওয়া দায়। অবস্থা এমন চলতে থাকলে জীবন ধারণ কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। ’ বিক্রেতাদের দাবি, আলাদা করে দাম বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি হয়নি। তবে পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে খুচরা দাম বাড়বে।
তারা বলছেন, পরিবহন খরচ বাড়লে শুধু পণ্য আনার খরচ বাড়বে না। পাইকার থেকে খুচরা— প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়বে। এদিকে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘শুধু রমজান মাস নয়, সারা বছর নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
’ কেউ বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে বা অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করলে, সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধির পরই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
কারণ জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রায় সব বিষয়ই আন্তঃসম্পর্কিত। শিল্প-কলকারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বাসাবাড়িসহ সব জায়গাতেই খরচ বাড়বে। এসব খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত বাড়তি টাকাটা ভোক্তার পকেট থেকেই যাবে। এতে মানুষের খরচের পাল্লা ভারী হবে। ’ তিনি আরও বলেন, ইতোপূর্বে ব্যবসায়ীরা ইরান-সংকটসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন।
এবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে তারা আরেক দফা দাম বাড়াবেন। এরই মধ্যে চিনি, সয়াবিন তেল, ময়দা, আটা, গরুর দুধসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এখন এসব পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিরূপায় সরকার : জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত নিতান্তই নিরূপায় হয়ে নিতে হয়েছে জানিয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমরা বারবারই বলেছিলাম যে উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না কিংবা নেবে না।
এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। জনগণের জীবনমানের কষ্ট লাঘবের অভিপ্রায়ে রাজনীতিতে এসেছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনগণের যে কষ্ট হবে, এটি আমি উপলব্ধি করি। সেই কারণে জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।



















