আজ মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৯ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৯°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৪%

গোয়াইনঘাটের ওসির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ

  • MIT ERP
  • Update Time : 12:47:32 am, Tuesday, 22 September 2026
  • 13

গোয়াইনঘাটের ওসির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

নদীতে নোঙর করা বাল্কহেড। গন্তব্যে যাওয়ার পথে একেক ঘাটে একেক রেট। কোথাও ৫ হাজার, কোথাও ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা। লাইনের টাকা, ইউনিয়ন ট্যাক্স, রয়্যালটি কিংবা সরাসরি থানার টাকা নামে এসব অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।

টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আটকে দেওয়া হয় নৌযান। ঘাটে ঘাটে টাকা তোলার জন্য রয়েছে লাইনম্যান। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নৌপথে এমন চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে গোয়াইনঘাট থানার ওসি ওমর ফারুকের নাম উঠে এসেছে। লাইনম্যানদের ভিডিও কথোপকথন, শ্রমিকদের লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের সংবাদ সম্মেলনে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

পুলিশের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নদীপথ, বালু ও পাথরমহাল থেকে মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের দাবি রয়েছে। এ ছাড়া গোয়াইনঘাট থানায় পোস্টিং পেতে ওসি ওমর ফারুক দেড় কোটি টাকার বেশি খরচ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত জুনে বাল্কহেড শ্রমিকেরা সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের নামে বাল্কহেডপ্রতি ৫ হাজার এবং ইউনিয়ন ট্যাক্সের নামে ২ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ করেন।

গোয়াইনঘাট থেকে ছাতক পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও শ্রমিক হয়রানির অভিযোগও উঠে এসেছে। পরে ১৯ জুন গোয়াইনঘাটের সালুটিকর এলাকায় বাল্কহেড ও কার্গো জাহাজ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে মামুন মিয়া নামে একজনকে আটক করে গোয়াইনঘাট থানা ও ছাতক নৌ-পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, খাদিমনগর ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র অর্থ আদায় করছিল।

অভিযানে টাকা, রসিদ বই ও একটি নৌকা জব্দ করা হয়। এর আগে ১৬ জুন বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক সংগঠন গোয়াইনঘাট শাখা আব্দুল আলিম ওরফে আলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি চক্রের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ তোলে। পুলিশ, ইউনিয়ন ট্যাক্সসহ বিভিন্ন নামে অর্থ আদায় এবং গোয়াইনঘাট থেকে সালুটিকর ও ছাতক পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন শ্রমিকেরা।

আগস্টেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। তখন বলা হয়, আলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে নৌযানপ্রতি ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হচ্ছে। আলিম উদ্দিন গোয়াইনঘাটের লেংগুড়া গ্রামের ওসমান আলীর ছেলে। লিখিত অভিযোগে তাকে ‘ওসির লাইনম্যান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের হাতে আসা দুটি ভিডিও কথোপকথনে আলিম উদ্দিন ও বাল্কহেড-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির কথাবার্তা রয়েছে।

সেখানে ‘লাইনের টাকা’ হিসেবে ৫ হাজার টাকা এবং নৌযানের সংখ্যা কম হলেও ‘থানার টাকা’ প্রতিদিন সমান থাকার কথা বলা হয়। বিভিন্ন ঘাটে টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গের পাশাপাশি সপ্তাহে আড়াই লাখ টাকা দেওয়ার কথাও উঠে আসে। এ হিসাবে এক লাইনম্যানের মাধ্যমে মাসে ১০ লাখ টাকা আদায়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কথোপকথনে ভোলাগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ ও ছাতকসহ বিভিন্ন ঘাটের নাম রয়েছে।

গন্তব্যে যেতে একটি নৌযানকে একাধিক পয়েন্টে অর্থ দিতে হয় বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আলিম উদ্দিন ও এক বাল্কহেড মাস্টারের আরেক কথোপকথনেও ‘লাইনের টাকা’ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়েও উপজেলার অন্তত সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের নামে নদীপথে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। বালু ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দাবি ছিল, বিভিন্ন ইউনিয়নের নামে নৌযানপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ইজারা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও অন্য কয়েকটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বা প্রশাসক নদীপথে ট্যাক্স আদায়ের জন্য ইজারা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। এতে বৈধ রাজস্ব আদায় ও অবৈধ চাঁদাবাজির সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, গোয়াইনঘাটের আমবাড়ি এলাকায় নৌকা আটকে প্রতি ঘনফুটে এক টাকা এবং বিআইডব্লিউটিএর নামে পৃথক রসিদে অর্থ আদায় করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ একে বৈধ ইজারা দাবি করলেও প্রশাসনের ভাষ্য, বর্তমানে চাঁদা আদায়ের জন্য বৈধ কোনো ইজারা নেই। পুরোনো কাগজ দেখিয়ে কেউ অর্থ আদায় করলে তা অবৈধ। শ্রমিকদের দাবি, নদীপথে চাঁদা আদায়ের চক্রে ৪০ থেকে ৫০ জন সদস্য রয়েছে। তারা দলবদ্ধভাবে নৌযানে উঠে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে। এর প্রতিবাদে নৌযান শ্রমিকেরা কর্মবিরতিও পালন করেন।

১৩ জুন অর্থ আদায়ের চেষ্টা এবং পরদিন আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। নৌপথে চাঁদাবাজির অভিযোগে বাংলাদেশ জাহাজি শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। এতে সালুটিকর, ছাতক এবং তাহিরপুরের পাটলাই ও রক্তি নদীতে বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত টোল আদায় এবং গোয়াইনঘাট এলাকায় পুলিশের নাম ব্যবহার করে নৌযানপ্রতি ৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নৌযান আটকে দেওয়া, ভয়ভীতি, হামলা ও হয়রানির কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নৌ-পুলিশ, গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, গোয়াইনঘাট থানার ওসি ও ছাতক নৌ-পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও প্রতিকার মেলেনি বলে দাবি শ্রমিকদের। এ কারণে মানববন্ধন ও কর্মবিরতি পালন করেন তারা।

বাংলাদেশ জাহাজি শ্রমিক ফেডারেশনের গোয়াইনঘাট, সিলেট ও ছাতক নদীবন্দর শাখার সভাপতি মো. আজমল হোসেন বলেন, নৌযান মালিক-শ্রমিকেরা সরকারের নির্ধারিত টোল, ট্যাক্স ও রাজস্ব দিতে প্রস্তুত। তবে এর বাইরে বেআইনি অর্থ দিতে তারা রাজি নন। চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়ায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং মালিক-শ্রমিকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। নদীপথের বাল্কহেড ছাড়াও সীমান্তঘেঁষা পর্যটনকেন্দ্র বিছানাকান্দি ও হাদারপাড় এলাকায় অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে ওসি ওমর ফারুকের নাম জড়িয়েছে।

বিএনপি ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক স্থানীয় নেতার সঙ্গে মিলে সেখান থেকেও তার নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওসির কারণে প্রশাসনের অভিযানেও সুফল মিলছে না বলে দাবি স্থানীয়দের। পুলিশের নাম করে বালু ও পাথর উত্তোলনকারী চক্রের কাছ থেকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ইজারার শর্ত, পরিবেশ আইন এবং নদী ও সীমান্ত রক্ষার নির্ধারিত সীমানা উপেক্ষা করে নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন চলছে।

ইজারায় শুধু বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে মূল্যবান পাথর তোলা হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক চরিত্র ও পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় থানা পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের মদদে অবৈধ উত্তোলন চলছে। গোয়াইনঘাট থানার ওসি এবং সংশ্লিষ্ট বিট ও ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সাব-ইন্সপেক্টরকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ওসি ওমর ফারুক কয়েক মাস আগে গোয়াইনঘাট থানায় যোগ দেন। এর আগে আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে তিনি একই থানায় ওসি-তদন্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে জৈন্তাপুর, বিয়ানীবাজার ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থানায় দায়িত্ব পালন করেন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। অভিযোগ রয়েছে, গোয়াইনঘাটে ওসি-তদন্ত থাকাকালে তিনি আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ এবং ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তার সহায়তায় একসময় বিছানাকান্দি ও হাদারপাড়ে আওয়ামী লীগ নেতারা লুটপাট চালান বলে দাবি করা হয়। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অংশগ্রহণে একই কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের বালু ও পাথর উত্তোলনকারী চক্রের সদস্যরা পর্দার আড়ালে থেকে এখনো এই ব্যবসায় যুক্ত। এই চক্রই আর্থিক বিনিয়োগ ও তদবিরের মাধ্যমে ওসি ওমর ফারুককে গোয়াইনঘাটে পোস্টিং করিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওসি ওমর ফারুক তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং ভিডিওতে তার নামও বলা হয়নি। কয়েক মাস আগে গোয়াইনঘাট থানায় যোগ দেওয়ার পর এই এলাকায় অপরাধ কমেছে দাবি করে তিনি বলেন, বালু ও পাথর লুটপাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে পারে।

ওসির ভাষ্য, ‘আমি অন্যায়ে নেই। সংশ্লিষ্টতা নেই। ভিডিওতে আমার নাম বলেনি। আমি কয়েক মাস হলো এসেছি। লুটপাটকারীরা হয়তো আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি এ থানায় আসার পর অপরাধ কমেছে। বালু ও পাথর লুটপাটের টুঁটি চেপে ধরেছি। ’ বিছানাকান্দি ও হাদারপাড় থেকে তার থানা পুলিশের সহায়তায় বালু-পাথর লুটের অভিযোগও অস্বীকার করেন ওসি ওমর ফারুক।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক লেনদেন বা পুলিশি সহায়তায় অবৈধ উত্তোলন চলছে— এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। পুলিশ অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ পুলিশি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩০৫

গোয়াইনঘাটের ওসির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ

Update Time : 12:47:32 am, Tuesday, 22 September 2026

নদীতে নোঙর করা বাল্কহেড। গন্তব্যে যাওয়ার পথে একেক ঘাটে একেক রেট। কোথাও ৫ হাজার, কোথাও ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা। লাইনের টাকা, ইউনিয়ন ট্যাক্স, রয়্যালটি কিংবা সরাসরি থানার টাকা নামে এসব অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।

টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আটকে দেওয়া হয় নৌযান। ঘাটে ঘাটে টাকা তোলার জন্য রয়েছে লাইনম্যান। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নৌপথে এমন চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে গোয়াইনঘাট থানার ওসি ওমর ফারুকের নাম উঠে এসেছে। লাইনম্যানদের ভিডিও কথোপকথন, শ্রমিকদের লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের সংবাদ সম্মেলনে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

পুলিশের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নদীপথ, বালু ও পাথরমহাল থেকে মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের দাবি রয়েছে। এ ছাড়া গোয়াইনঘাট থানায় পোস্টিং পেতে ওসি ওমর ফারুক দেড় কোটি টাকার বেশি খরচ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত জুনে বাল্কহেড শ্রমিকেরা সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের নামে বাল্কহেডপ্রতি ৫ হাজার এবং ইউনিয়ন ট্যাক্সের নামে ২ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ করেন।

গোয়াইনঘাট থেকে ছাতক পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও শ্রমিক হয়রানির অভিযোগও উঠে এসেছে। পরে ১৯ জুন গোয়াইনঘাটের সালুটিকর এলাকায় বাল্কহেড ও কার্গো জাহাজ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে মামুন মিয়া নামে একজনকে আটক করে গোয়াইনঘাট থানা ও ছাতক নৌ-পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, খাদিমনগর ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র অর্থ আদায় করছিল।

অভিযানে টাকা, রসিদ বই ও একটি নৌকা জব্দ করা হয়। এর আগে ১৬ জুন বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক সংগঠন গোয়াইনঘাট শাখা আব্দুল আলিম ওরফে আলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি চক্রের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ তোলে। পুলিশ, ইউনিয়ন ট্যাক্সসহ বিভিন্ন নামে অর্থ আদায় এবং গোয়াইনঘাট থেকে সালুটিকর ও ছাতক পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন শ্রমিকেরা।

আগস্টেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। তখন বলা হয়, আলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে নৌযানপ্রতি ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হচ্ছে। আলিম উদ্দিন গোয়াইনঘাটের লেংগুড়া গ্রামের ওসমান আলীর ছেলে। লিখিত অভিযোগে তাকে ‘ওসির লাইনম্যান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের হাতে আসা দুটি ভিডিও কথোপকথনে আলিম উদ্দিন ও বাল্কহেড-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির কথাবার্তা রয়েছে।

সেখানে ‘লাইনের টাকা’ হিসেবে ৫ হাজার টাকা এবং নৌযানের সংখ্যা কম হলেও ‘থানার টাকা’ প্রতিদিন সমান থাকার কথা বলা হয়। বিভিন্ন ঘাটে টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গের পাশাপাশি সপ্তাহে আড়াই লাখ টাকা দেওয়ার কথাও উঠে আসে। এ হিসাবে এক লাইনম্যানের মাধ্যমে মাসে ১০ লাখ টাকা আদায়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কথোপকথনে ভোলাগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ ও ছাতকসহ বিভিন্ন ঘাটের নাম রয়েছে।

গন্তব্যে যেতে একটি নৌযানকে একাধিক পয়েন্টে অর্থ দিতে হয় বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আলিম উদ্দিন ও এক বাল্কহেড মাস্টারের আরেক কথোপকথনেও ‘লাইনের টাকা’ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়েও উপজেলার অন্তত সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের নামে নদীপথে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। বালু ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দাবি ছিল, বিভিন্ন ইউনিয়নের নামে নৌযানপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ইজারা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও অন্য কয়েকটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বা প্রশাসক নদীপথে ট্যাক্স আদায়ের জন্য ইজারা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। এতে বৈধ রাজস্ব আদায় ও অবৈধ চাঁদাবাজির সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, গোয়াইনঘাটের আমবাড়ি এলাকায় নৌকা আটকে প্রতি ঘনফুটে এক টাকা এবং বিআইডব্লিউটিএর নামে পৃথক রসিদে অর্থ আদায় করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ একে বৈধ ইজারা দাবি করলেও প্রশাসনের ভাষ্য, বর্তমানে চাঁদা আদায়ের জন্য বৈধ কোনো ইজারা নেই। পুরোনো কাগজ দেখিয়ে কেউ অর্থ আদায় করলে তা অবৈধ। শ্রমিকদের দাবি, নদীপথে চাঁদা আদায়ের চক্রে ৪০ থেকে ৫০ জন সদস্য রয়েছে। তারা দলবদ্ধভাবে নৌযানে উঠে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে। এর প্রতিবাদে নৌযান শ্রমিকেরা কর্মবিরতিও পালন করেন।

১৩ জুন অর্থ আদায়ের চেষ্টা এবং পরদিন আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। নৌপথে চাঁদাবাজির অভিযোগে বাংলাদেশ জাহাজি শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। এতে সালুটিকর, ছাতক এবং তাহিরপুরের পাটলাই ও রক্তি নদীতে বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত টোল আদায় এবং গোয়াইনঘাট এলাকায় পুলিশের নাম ব্যবহার করে নৌযানপ্রতি ৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নৌযান আটকে দেওয়া, ভয়ভীতি, হামলা ও হয়রানির কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নৌ-পুলিশ, গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, গোয়াইনঘাট থানার ওসি ও ছাতক নৌ-পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও প্রতিকার মেলেনি বলে দাবি শ্রমিকদের। এ কারণে মানববন্ধন ও কর্মবিরতি পালন করেন তারা।

বাংলাদেশ জাহাজি শ্রমিক ফেডারেশনের গোয়াইনঘাট, সিলেট ও ছাতক নদীবন্দর শাখার সভাপতি মো. আজমল হোসেন বলেন, নৌযান মালিক-শ্রমিকেরা সরকারের নির্ধারিত টোল, ট্যাক্স ও রাজস্ব দিতে প্রস্তুত। তবে এর বাইরে বেআইনি অর্থ দিতে তারা রাজি নন। চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়ায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং মালিক-শ্রমিকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। নদীপথের বাল্কহেড ছাড়াও সীমান্তঘেঁষা পর্যটনকেন্দ্র বিছানাকান্দি ও হাদারপাড় এলাকায় অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে ওসি ওমর ফারুকের নাম জড়িয়েছে।

বিএনপি ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক স্থানীয় নেতার সঙ্গে মিলে সেখান থেকেও তার নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওসির কারণে প্রশাসনের অভিযানেও সুফল মিলছে না বলে দাবি স্থানীয়দের। পুলিশের নাম করে বালু ও পাথর উত্তোলনকারী চক্রের কাছ থেকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ইজারার শর্ত, পরিবেশ আইন এবং নদী ও সীমান্ত রক্ষার নির্ধারিত সীমানা উপেক্ষা করে নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন চলছে।

ইজারায় শুধু বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে মূল্যবান পাথর তোলা হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক চরিত্র ও পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় থানা পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের মদদে অবৈধ উত্তোলন চলছে। গোয়াইনঘাট থানার ওসি এবং সংশ্লিষ্ট বিট ও ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সাব-ইন্সপেক্টরকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ওসি ওমর ফারুক কয়েক মাস আগে গোয়াইনঘাট থানায় যোগ দেন। এর আগে আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে তিনি একই থানায় ওসি-তদন্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে জৈন্তাপুর, বিয়ানীবাজার ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থানায় দায়িত্ব পালন করেন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। অভিযোগ রয়েছে, গোয়াইনঘাটে ওসি-তদন্ত থাকাকালে তিনি আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ এবং ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তার সহায়তায় একসময় বিছানাকান্দি ও হাদারপাড়ে আওয়ামী লীগ নেতারা লুটপাট চালান বলে দাবি করা হয়। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অংশগ্রহণে একই কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের বালু ও পাথর উত্তোলনকারী চক্রের সদস্যরা পর্দার আড়ালে থেকে এখনো এই ব্যবসায় যুক্ত। এই চক্রই আর্থিক বিনিয়োগ ও তদবিরের মাধ্যমে ওসি ওমর ফারুককে গোয়াইনঘাটে পোস্টিং করিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওসি ওমর ফারুক তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং ভিডিওতে তার নামও বলা হয়নি। কয়েক মাস আগে গোয়াইনঘাট থানায় যোগ দেওয়ার পর এই এলাকায় অপরাধ কমেছে দাবি করে তিনি বলেন, বালু ও পাথর লুটপাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে পারে।

ওসির ভাষ্য, ‘আমি অন্যায়ে নেই। সংশ্লিষ্টতা নেই। ভিডিওতে আমার নাম বলেনি। আমি কয়েক মাস হলো এসেছি। লুটপাটকারীরা হয়তো আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি এ থানায় আসার পর অপরাধ কমেছে। বালু ও পাথর লুটপাটের টুঁটি চেপে ধরেছি। ’ বিছানাকান্দি ও হাদারপাড় থেকে তার থানা পুলিশের সহায়তায় বালু-পাথর লুটের অভিযোগও অস্বীকার করেন ওসি ওমর ফারুক।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক লেনদেন বা পুলিশি সহায়তায় অবৈধ উত্তোলন চলছে— এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। পুলিশ অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ পুলিশি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে।