আজ রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
বজ্রসহ বৃষ্টি
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

রাজনীতির বড় আদালত জনগণের স্মৃতি

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:46:40 am, Saturday, 19 September 2026
  • 20

রাজনীতির বড় আদালত জনগণের স্মৃতি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রাজনীতিতে আশাবাদ ভালো, স্বপ্ন দেখা আরও ভালো। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে যে একটা নদী থাকে, সেই নদী সাঁতরে পার হতে হলে শুধু আবেগ দিয়ে হয় না, সাঁতারও জানতে হয়। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী এখনো এমন এক রাজনৈতিক স্বপ্নে বিভোর যে, ডিসেম্বর এলেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন, সঙ্গে ফিরবে আওয়ামী লীগ, আর বাংলাদেশের রাজনীতির ঘড়ি যেন আবার ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগের সময়ের দিকে ঘুরে যাবে।

শেখ হাসিনা নিজেও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। আগস্টেও তিনি সেই ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ফলে ডিসেম্বর ফেরার কথা যে একেবারে বানানো গল্প, তা নয়। কিন্তু রাজনীতির অঙ্কটা এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই আসল অঙ্ক শুরু। আর সেই অঙ্কের খাতায় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর দিনটি নতুন করে মোটা অক্ষরে লেখা হয়ে গেল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। দ-প্রাপ্ত অন্যরা হলেনÑ বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এই রায়কে কেবল একটি মামলার বিচারিক পরিণতি হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক গভীরতা বোঝা যাবে না।

আমাদের মানতে হবে, এমন রায় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আমূল বদলে দেয়। যে নেতারা একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত দিতেন, তাদেরই এখন আদালতের রায়, আইনি প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির কাঠামোর সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ওবায়দুল কাদেরদের মৃত্যুদ-ের আলোচনা তাই ব্যক্তিগত শাস্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের সীমা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এবং দলীয় আনুগত্যের নামে অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ক।

তবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের যে নেতৃত্ব একসময় নিজেদের রাষ্ট্রের সমার্থক ভাবতে অভ্যস্ত ছিল, তাদের একটি অংশ এখন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার সামনে অভিযুক্ত বা দ-িত। ক্ষমতার সময় তারা হয়তো মনে করেছিলেন, দলীয় পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু আদালতের রায় দেখিয়ে দিলÑ ক্ষমতার ছায়া সরে গেলে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দায়ের প্রশ্ন সামনে আসতেই পারে।

এখানে প্রশ্ন উঠবে, ওবায়দুল কাদেরদের মৃত্যুদ-ের রায় কি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করল কি। উত্তর সহজ নয়, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। দলের সাধারণ সম্পাদকসহ একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এমন রায় এলে দলকে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, নিজেদের অতীত ভূমিকা নিয়েও ব্যাখ্যা দিতে হয়। এর আগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদ-ের রায় হয়েছেÑ এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ডিসেম্বরের ‘ফেরার’ সময় কতটা সহজ হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ডিসেম্বরের কোন ট্রেনটি আসছে? ট্রেনের নাম ‘ফেরা’। কিন্তু স্টেশনে পৌঁছে দেখা গেলÑ টিকিট আছে কি না, প্ল্যাটফর্ম খোলা আছে কি না, ট্রেনের ইঞ্জিনে জ্বালানি আছে কি না, আর যাত্রী নিজে উঠতে পারবেন কি নাÑ এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছে না। শুধু ঘোষণা হচ্ছে, ‘ট্রেন আসবেই। ’ প্রবাদে আছে, ‘আকাশ কুসুম ভাবনা।

’ আবার গ্রাম-বাংলায় বলা হয়, ‘ধান ভানতে শিবের গীত। ’ রাজনীতির বাস্তবতা ছেড়ে কেবল প্রত্যাবর্তনের কল্পনায় বসে থাকলে সেটিও এক ধরনের রাজনৈতিক আকাশ কুসুম। শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেনÑ এটি রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব বলা যায় না। কিন্তু দেশে ফেরা আর ক্ষমতায় ফেরা এক কথা নয়। আদালতে আত্মসমর্পণ করা আর জনসমুদ্রে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসা এক কথা নয়।

রাজনৈতিক দলকে পুনরায় স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকা-ে ফিরিয়ে আনা আর বিদেশে বসে দলীয় কর্মীদের আশাবাদী রাখা এক কথা নয়। এই পার্থক্যটিই আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী বুঝতে চাইছেন না, অথবা বুঝেও নিজেদের মনোবল ধরে রাখতে চাইছেন না। ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নেই। ক্ষমতা হারানোর পর অনেক শাসক ভেবেছেন, ‘সময় বদলাবে, জনগণ ভুলে যাবে। ’ কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম শিক্ষক।

সে কারো জন্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নাৎসি নেতৃত্বের কী হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে আছে। ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি জার্মানির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছিল। ২২ জন প্রধান আসামির বিচার হয় এবং পরবর্তী আরও বিচারেও বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিলÑ রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দেয় না। ন্যুরেমবার্গের নীতিতে আরও একটি ঐতিহাসিক বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়Ñ ‘উপরের নির্দেশ পালন করেছি’ বললেই অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার এই ধারণা পরবর্তী আন্তর্জাতিক অপরাধবিচারের ভিত্তি শক্ত করে।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহও সেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হতে পারেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হন। এই রক্তাক্ত বাস্তবতার পর কেউ যদি ভাবেন, শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে পুরোনো অবস্থানে ফিরে যাওয়া যাবে, তাহলে সেটি জনগণের স্মৃতিশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট সম্ভবত এখানেই। দলটির একাংশ এখনো ৫ আগস্ট ২০২৪-কে একটি সাময়িক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে চাইছে। যেন ইতিহাসের পাতায় একটি কমা পড়েছে, দাঁড়ি নয়। যেন একটু সময় গেলে সব আগের মতো হয়ে যাবে। বাস্তবতা অবশ্য এত দয়ালু নয় আজকের বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগের বাংলাদেশ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তির ভারসাম্য বদলেছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। আদালতের রায় এসেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেই মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি হিসেবে অবস্থান করছেন। এই পরিস্থিতিতে ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন যদি হয়ও, সেটি হবে রাজনৈতিক রোমাঞ্চের চেয়ে বেশি আইনি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা। ধরা যাক, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই দেশে ফিরলেন।

বিমানবন্দরে নামলেন। এরপর কী হবে? আদালত আছে। মামলা আছে। সাজা আছে। রাজনৈতিক দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ। জনমনে ২০২৪ সালের রক্তাক্ত স্মৃতি আছে। নিহতদের পরিবার আছে। আহতদের ক্ষত আছে। জুলাইয়ের দেয়ালে লেখা স্লোগান আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোটি কোটি পোস্ট আছে। ইতিহাসের নথি আছে। অর্থাৎ দেশে ফেরা মানেই রাজনীতিতে ফেরা নয়। একটি নতুন রাজনৈতিক আত্মসমালোচনাÑ নাকি পুরোনো বয়ান?

একটি নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমা চাওয়াÑনাকি আবারও পুরোনো শত্রু-বন্ধুর ভাষা? জুলাইয়ের তরুণেরা কি ভুলে যাবে? নিহতদের পরিবার কি ভুলে যাবে? আহতরা কি ভুলে যাবে? যে মা সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েছেন, তার কাছে রাজনৈতিক স্লোগানের মূল্য কতটুকু? রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন নিয়ে। ক্ষমতার চেয়ার কাঠের হতে পারে, কিন্তু সেই চেয়ারে বসার মূল্য কখনো কখনো মানুষের রক্তে লেখা হয়।

তাই ক্ষমতা হারানোর পর সবচেয়ে জরুরি কাজ হলোÑ আয়নায় নিজের মুখ দেখা। ডিসেম্বর আসবে, শীত নামবে, কুয়াশা পড়বে, বিজয়ের মাসে জাতীয় পতাকা উড়বেÑ কিন্তু যে রাজনৈতিক ট্রেনের হুইসেল শোনার জন্য কেউ কেউ কান পেতে বসে আছেন, সেটি হয়তো প্ল্যাটফর্মে আসবে না। আর এলেও যাত্রীরা আগের আসনে বসতে পারবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেবে টিকিট পরীক্ষক নয়Ñবাংলাদেশের জনগণ, আইন এবং ইতিহাস।

কারণ রাজনীতির সবচেয়ে বড় আদালত শেষ পর্যন্ত জনগণের স্মৃতি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

দেশের ব্যাংকিং খাত নাজুক অবস্থায়, খেলাপি ঋণ আরও বাড়ার আশঙ্কা সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের

রাজনীতির বড় আদালত জনগণের স্মৃতি

Update Time : 02:46:40 am, Saturday, 19 September 2026

রাজনীতিতে আশাবাদ ভালো, স্বপ্ন দেখা আরও ভালো। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে যে একটা নদী থাকে, সেই নদী সাঁতরে পার হতে হলে শুধু আবেগ দিয়ে হয় না, সাঁতারও জানতে হয়। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী এখনো এমন এক রাজনৈতিক স্বপ্নে বিভোর যে, ডিসেম্বর এলেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন, সঙ্গে ফিরবে আওয়ামী লীগ, আর বাংলাদেশের রাজনীতির ঘড়ি যেন আবার ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগের সময়ের দিকে ঘুরে যাবে।

শেখ হাসিনা নিজেও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। আগস্টেও তিনি সেই ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ফলে ডিসেম্বর ফেরার কথা যে একেবারে বানানো গল্প, তা নয়। কিন্তু রাজনীতির অঙ্কটা এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই আসল অঙ্ক শুরু। আর সেই অঙ্কের খাতায় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর দিনটি নতুন করে মোটা অক্ষরে লেখা হয়ে গেল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। দ-প্রাপ্ত অন্যরা হলেনÑ বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এই রায়কে কেবল একটি মামলার বিচারিক পরিণতি হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক গভীরতা বোঝা যাবে না।

আমাদের মানতে হবে, এমন রায় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আমূল বদলে দেয়। যে নেতারা একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত দিতেন, তাদেরই এখন আদালতের রায়, আইনি প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির কাঠামোর সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ওবায়দুল কাদেরদের মৃত্যুদ-ের আলোচনা তাই ব্যক্তিগত শাস্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের সীমা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এবং দলীয় আনুগত্যের নামে অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ক।

তবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের যে নেতৃত্ব একসময় নিজেদের রাষ্ট্রের সমার্থক ভাবতে অভ্যস্ত ছিল, তাদের একটি অংশ এখন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার সামনে অভিযুক্ত বা দ-িত। ক্ষমতার সময় তারা হয়তো মনে করেছিলেন, দলীয় পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু আদালতের রায় দেখিয়ে দিলÑ ক্ষমতার ছায়া সরে গেলে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দায়ের প্রশ্ন সামনে আসতেই পারে।

এখানে প্রশ্ন উঠবে, ওবায়দুল কাদেরদের মৃত্যুদ-ের রায় কি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করল কি। উত্তর সহজ নয়, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। দলের সাধারণ সম্পাদকসহ একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এমন রায় এলে দলকে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, নিজেদের অতীত ভূমিকা নিয়েও ব্যাখ্যা দিতে হয়। এর আগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদ-ের রায় হয়েছেÑ এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ডিসেম্বরের ‘ফেরার’ সময় কতটা সহজ হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ডিসেম্বরের কোন ট্রেনটি আসছে? ট্রেনের নাম ‘ফেরা’। কিন্তু স্টেশনে পৌঁছে দেখা গেলÑ টিকিট আছে কি না, প্ল্যাটফর্ম খোলা আছে কি না, ট্রেনের ইঞ্জিনে জ্বালানি আছে কি না, আর যাত্রী নিজে উঠতে পারবেন কি নাÑ এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছে না। শুধু ঘোষণা হচ্ছে, ‘ট্রেন আসবেই। ’ প্রবাদে আছে, ‘আকাশ কুসুম ভাবনা।

’ আবার গ্রাম-বাংলায় বলা হয়, ‘ধান ভানতে শিবের গীত। ’ রাজনীতির বাস্তবতা ছেড়ে কেবল প্রত্যাবর্তনের কল্পনায় বসে থাকলে সেটিও এক ধরনের রাজনৈতিক আকাশ কুসুম। শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেনÑ এটি রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব বলা যায় না। কিন্তু দেশে ফেরা আর ক্ষমতায় ফেরা এক কথা নয়। আদালতে আত্মসমর্পণ করা আর জনসমুদ্রে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসা এক কথা নয়।

রাজনৈতিক দলকে পুনরায় স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকা-ে ফিরিয়ে আনা আর বিদেশে বসে দলীয় কর্মীদের আশাবাদী রাখা এক কথা নয়। এই পার্থক্যটিই আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী বুঝতে চাইছেন না, অথবা বুঝেও নিজেদের মনোবল ধরে রাখতে চাইছেন না। ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নেই। ক্ষমতা হারানোর পর অনেক শাসক ভেবেছেন, ‘সময় বদলাবে, জনগণ ভুলে যাবে। ’ কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম শিক্ষক।

সে কারো জন্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নাৎসি নেতৃত্বের কী হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে আছে। ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি জার্মানির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছিল। ২২ জন প্রধান আসামির বিচার হয় এবং পরবর্তী আরও বিচারেও বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিলÑ রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দেয় না। ন্যুরেমবার্গের নীতিতে আরও একটি ঐতিহাসিক বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়Ñ ‘উপরের নির্দেশ পালন করেছি’ বললেই অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার এই ধারণা পরবর্তী আন্তর্জাতিক অপরাধবিচারের ভিত্তি শক্ত করে।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহও সেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হতে পারেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হন। এই রক্তাক্ত বাস্তবতার পর কেউ যদি ভাবেন, শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে পুরোনো অবস্থানে ফিরে যাওয়া যাবে, তাহলে সেটি জনগণের স্মৃতিশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট সম্ভবত এখানেই। দলটির একাংশ এখনো ৫ আগস্ট ২০২৪-কে একটি সাময়িক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে চাইছে। যেন ইতিহাসের পাতায় একটি কমা পড়েছে, দাঁড়ি নয়। যেন একটু সময় গেলে সব আগের মতো হয়ে যাবে। বাস্তবতা অবশ্য এত দয়ালু নয় আজকের বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগের বাংলাদেশ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তির ভারসাম্য বদলেছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। আদালতের রায় এসেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেই মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি হিসেবে অবস্থান করছেন। এই পরিস্থিতিতে ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন যদি হয়ও, সেটি হবে রাজনৈতিক রোমাঞ্চের চেয়ে বেশি আইনি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা। ধরা যাক, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই দেশে ফিরলেন।

বিমানবন্দরে নামলেন। এরপর কী হবে? আদালত আছে। মামলা আছে। সাজা আছে। রাজনৈতিক দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ। জনমনে ২০২৪ সালের রক্তাক্ত স্মৃতি আছে। নিহতদের পরিবার আছে। আহতদের ক্ষত আছে। জুলাইয়ের দেয়ালে লেখা স্লোগান আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোটি কোটি পোস্ট আছে। ইতিহাসের নথি আছে। অর্থাৎ দেশে ফেরা মানেই রাজনীতিতে ফেরা নয়। একটি নতুন রাজনৈতিক আত্মসমালোচনাÑ নাকি পুরোনো বয়ান?

একটি নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমা চাওয়াÑনাকি আবারও পুরোনো শত্রু-বন্ধুর ভাষা? জুলাইয়ের তরুণেরা কি ভুলে যাবে? নিহতদের পরিবার কি ভুলে যাবে? আহতরা কি ভুলে যাবে? যে মা সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েছেন, তার কাছে রাজনৈতিক স্লোগানের মূল্য কতটুকু? রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন নিয়ে। ক্ষমতার চেয়ার কাঠের হতে পারে, কিন্তু সেই চেয়ারে বসার মূল্য কখনো কখনো মানুষের রক্তে লেখা হয়।

তাই ক্ষমতা হারানোর পর সবচেয়ে জরুরি কাজ হলোÑ আয়নায় নিজের মুখ দেখা। ডিসেম্বর আসবে, শীত নামবে, কুয়াশা পড়বে, বিজয়ের মাসে জাতীয় পতাকা উড়বেÑ কিন্তু যে রাজনৈতিক ট্রেনের হুইসেল শোনার জন্য কেউ কেউ কান পেতে বসে আছেন, সেটি হয়তো প্ল্যাটফর্মে আসবে না। আর এলেও যাত্রীরা আগের আসনে বসতে পারবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেবে টিকিট পরীক্ষক নয়Ñবাংলাদেশের জনগণ, আইন এবং ইতিহাস।

কারণ রাজনীতির সবচেয়ে বড় আদালত শেষ পর্যন্ত জনগণের স্মৃতি।