আজ সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৮ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২৯%

বিদেশে নির্যাতিতা প্রবাসফেরত নারী সেলিনা আক্তারের দেশেও নেই কোনো আশ্রয়

  • MIT ERP
  • Update Time : 01:14:57 am, Sunday, 20 September 2026
  • 16

বিদেশে নির্যাতিতা প্রবাসফেরত নারী সেলিনা আক্তারের দেশেও নেই কোনো আশ্রয়

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বিদেশে যাওয়ার সময় চোখে ছিল অভাব দূর করার স্বপ্ন, আর আজ দেশে ফিরে কপালে জুটেছে শুধু কলঙ্ক আর উপহাস। ঘরের মানুষগুলোও পর হয়ে গেছে, আর সমাজের চোখে আমি এক ব্যর্থ নারী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের প্রবাসফেরত নারী সেলিনা আক্তার (ছদ্মনাম)।

ঋণের বোঝা মিটিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সেলিনা। কিন্তু সৌদি আরবে গৃহকর্তার অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং দিনের পর দিন অনাহারে থাকার পর জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আশ্রয় নেন বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফ হোমে। ভিসা জটিলতা ও জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে শূন্য হাতে ফিরতে হয় নিজ দেশে।

প্রবাসের বঞ্চনা থেকে বেঁচে ফিরলেও দেশের মাটিতে শুরু হয় তার জীবনে আরও এক নির্মম ও দীর্ঘতম লড়াই। ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইনভলান্টারি রিটার্ন অব বাংলাদেশি উইমেন মাইগ্রেন্টস ফ্রম সৌদি আরাবিয়া : এ কোয়ালিটেটিভ স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের প্রান্তিক নারী অভিবাসীদের এমন করুণ ও নির্মম চিত্র উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক জেন্ডার ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা সাময়িকী ‘উইমেন্স স্টাডিজ ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম’-এর ভলিউমে ২০২৫ সালে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেনে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক ড. আজমিরা বিলকিস। সহ-গবেষক ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মিলি সাহা। গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হলো—সৌদি আরব থেকে জোরপূর্বক বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি নারী অভিবাসীদের আর্থ-সামাজিক, মানসিক এবং সাংস্কৃতিক সংকটগুলো উন্মোচন করা।

প্রবাসে চরম নির্যাতন থেকে শুরু করে দেশের মাটিতে পা রাখার পর পরিবার ও সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক বিচারহীনতা এবং পুনর্বাসনে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকার কারণে কীভাবে একজন নারীর জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তার সুসংহত বিশ্লেষণ রয়েছে এই গবেষণায়। গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, এই নারীদের প্রত্যাবর্তন শুধু ভৌগোলিক সীমানায় ফিরে আসা নয়; এটি তাদের পরিচিতি, মর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাসের এক চরম বিপর্যয়।

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের দুটি গ্রাম—আলীনগর এবং মানিকদীতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষকরা ২৫ জন প্রত্যাবর্তনকারী নারীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। এর পাশাপাশি আরও তথ্যের জন্য ১২ জন প্রত্যাবর্তনকারী নারী এবং তাদের পরিবারের ১২ জন সদস্যকে নিয়ে একাধিক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা পরিচালিত হয়।

পরবর্তীতে সংগৃহীত এসব তথ্যকে জেন্ডার ও অভিবাসন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে থিমেটিক অ্যানালিসিস (বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ) করা হয়েছে। গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে মর্মান্তিক কিছু বিষয় উন্মোচিত হয়েছে। সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী নারী অভিবাসীদের বেশির ভাগই অত্যন্ত নিম্ন আয়ের গ্রামীণ পরিবার থেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী নিরক্ষর এবং ৩৬ শতাংশ শুধু প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন।

চরম দারিদ্র্য, পরিবারের পুরুষ সদস্যের বেকারত্ব, ঋণের বোঝা, স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়া কিংবা পারিবারিক অশান্তির মতো সামাজিক তাড়না (পুশ ফ্যাক্টর) থেকেই মূলত তারা বিদেশে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর রঙিন স্বপ্ন এবং দ্রুত সচ্ছলতা পাওয়ার ‘পুল ফ্যাক্টর’ তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়।

ফলাফলে উঠে এসেছে যে, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর অধিকাংশ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে চরম অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। চুক্তির বাইরে দৈনিক ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করানো, নিয়মিত বেতন না দেওয়া, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়া, চলাফেরার স্বাধীনতায় নিষেধাজ্ঞা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং অনেক ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

নিয়োগকর্তার অত্যাচার সইতে না পেরে যারা পালিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যান বা ভিসা জটিলতায় পড়েন, তাদের জোরপূর্বক বা আকস্মিক উপায়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফেরার পর তাদের এই প্রত্যাবর্তন কোনো স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে না; বরং এটি তাদের জন্য এক নতুন ও দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের সূচনা করে। গবেষণার পার্শ্ববিশ্লেষণে দেখা গেছে, জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের পর নারীদেরই ব্যর্থতার জন্য দোষারোপ করা হয়।

স্বামী বা পরিবারের নিকটাত্মীয়দের দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়া ও সামাজিকভাবে তাদের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি (সোশ্যাল স্টিগমা) তৈরি হয়, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে চিরতরে বিপর্যস্ত করে তোলে। গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা যেমন— হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং বিভিন্ন অভিবাসী কল্যাণ সংগঠনের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনেরও মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে আসছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের (গালফ) দেশগুলোতে নারী শ্রমবাজারের নিরাপত্তাহীনতা রাষ্ট্রীয় নীতি, দুর্বল কূটনীতি এবং রিক্রুটিং এজেন্সির কাঠামোগত ত্রুটির ফল। গবেষক আজমিরা বিলকিস এবং মিলি সাহা তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নারী অভিবাসীদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শুধু রেমিট্যান্স অর্জনের বাহবা নেওয়া হয়, কিন্তু পর্দার আড়ালে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তব চিত্রটি বরাবরই উপেক্ষিত হয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, ‘প্রত্যাবর্তন মানে শুধু ভৌগোলিক সীমানায় ফিরে আসা নয়, এটি একজন নারীর জন্য এক গভীর মানসিক ট্রমা এবং নতুন পরিচয়ের সংকট। অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দেশের মাটিতে ফিরে আসার পর সামাজিক সুরক্ষার অভাব এই নারীদের জীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলছে। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি তাদের পাশে না দাঁড়ায়, তবে এই নারীরা চিরতরে প্রান্তিক হয়ে পড়বে।

’ বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বামসা) নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের নারী শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে যে অমানবিক শ্রম ও নিপীড়নের শিকার হন, তার নেপথ্যে রয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর চরম অনিয়ম ও জবাবদিহির অভাব। জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের পর সমাজ ও পরিবারের পক্ষ থেকে এই নারীদের যে সামাজিক কলঙ্কের মুখোমুখি হতে হয়, তা তাদের জীবনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

’ ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে নির্যাতন ও নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে যেসব নারী শূন্য হাতে দেশে ফিরছেন, তাদের মানসিক ট্রমা এবং সামাজিক পুনরেকত্রীকরণ আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ’ গবেষণায় এ বিষয়ে উত্তরণে কিছু নীতিগত সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে— লিঙ্গ সংবেদনশীল নীতি প্রণয়ন; আইনি সহায়তা ও বিচার নিশ্চিতকরণ; মনস্তাত্ত্বিক ও পুনর্বাসন প্রোগ্রাম; অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে ইউক্রেনের বড় ড্রোন হামলা, নিহত অন্তত ২

বিদেশে নির্যাতিতা প্রবাসফেরত নারী সেলিনা আক্তারের দেশেও নেই কোনো আশ্রয়

Update Time : 01:14:57 am, Sunday, 20 September 2026

বিদেশে যাওয়ার সময় চোখে ছিল অভাব দূর করার স্বপ্ন, আর আজ দেশে ফিরে কপালে জুটেছে শুধু কলঙ্ক আর উপহাস। ঘরের মানুষগুলোও পর হয়ে গেছে, আর সমাজের চোখে আমি এক ব্যর্থ নারী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের প্রবাসফেরত নারী সেলিনা আক্তার (ছদ্মনাম)।

ঋণের বোঝা মিটিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সেলিনা। কিন্তু সৌদি আরবে গৃহকর্তার অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং দিনের পর দিন অনাহারে থাকার পর জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আশ্রয় নেন বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফ হোমে। ভিসা জটিলতা ও জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে শূন্য হাতে ফিরতে হয় নিজ দেশে।

প্রবাসের বঞ্চনা থেকে বেঁচে ফিরলেও দেশের মাটিতে শুরু হয় তার জীবনে আরও এক নির্মম ও দীর্ঘতম লড়াই। ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইনভলান্টারি রিটার্ন অব বাংলাদেশি উইমেন মাইগ্রেন্টস ফ্রম সৌদি আরাবিয়া : এ কোয়ালিটেটিভ স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের প্রান্তিক নারী অভিবাসীদের এমন করুণ ও নির্মম চিত্র উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক জেন্ডার ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা সাময়িকী ‘উইমেন্স স্টাডিজ ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম’-এর ভলিউমে ২০২৫ সালে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেনে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক ড. আজমিরা বিলকিস। সহ-গবেষক ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মিলি সাহা। গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হলো—সৌদি আরব থেকে জোরপূর্বক বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি নারী অভিবাসীদের আর্থ-সামাজিক, মানসিক এবং সাংস্কৃতিক সংকটগুলো উন্মোচন করা।

প্রবাসে চরম নির্যাতন থেকে শুরু করে দেশের মাটিতে পা রাখার পর পরিবার ও সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক বিচারহীনতা এবং পুনর্বাসনে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকার কারণে কীভাবে একজন নারীর জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তার সুসংহত বিশ্লেষণ রয়েছে এই গবেষণায়। গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, এই নারীদের প্রত্যাবর্তন শুধু ভৌগোলিক সীমানায় ফিরে আসা নয়; এটি তাদের পরিচিতি, মর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাসের এক চরম বিপর্যয়।

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের দুটি গ্রাম—আলীনগর এবং মানিকদীতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষকরা ২৫ জন প্রত্যাবর্তনকারী নারীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। এর পাশাপাশি আরও তথ্যের জন্য ১২ জন প্রত্যাবর্তনকারী নারী এবং তাদের পরিবারের ১২ জন সদস্যকে নিয়ে একাধিক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা পরিচালিত হয়।

পরবর্তীতে সংগৃহীত এসব তথ্যকে জেন্ডার ও অভিবাসন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে থিমেটিক অ্যানালিসিস (বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ) করা হয়েছে। গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে মর্মান্তিক কিছু বিষয় উন্মোচিত হয়েছে। সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী নারী অভিবাসীদের বেশির ভাগই অত্যন্ত নিম্ন আয়ের গ্রামীণ পরিবার থেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী নিরক্ষর এবং ৩৬ শতাংশ শুধু প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন।

চরম দারিদ্র্য, পরিবারের পুরুষ সদস্যের বেকারত্ব, ঋণের বোঝা, স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়া কিংবা পারিবারিক অশান্তির মতো সামাজিক তাড়না (পুশ ফ্যাক্টর) থেকেই মূলত তারা বিদেশে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর রঙিন স্বপ্ন এবং দ্রুত সচ্ছলতা পাওয়ার ‘পুল ফ্যাক্টর’ তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়।

ফলাফলে উঠে এসেছে যে, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর অধিকাংশ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে চরম অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। চুক্তির বাইরে দৈনিক ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করানো, নিয়মিত বেতন না দেওয়া, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়া, চলাফেরার স্বাধীনতায় নিষেধাজ্ঞা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং অনেক ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

নিয়োগকর্তার অত্যাচার সইতে না পেরে যারা পালিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যান বা ভিসা জটিলতায় পড়েন, তাদের জোরপূর্বক বা আকস্মিক উপায়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফেরার পর তাদের এই প্রত্যাবর্তন কোনো স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে না; বরং এটি তাদের জন্য এক নতুন ও দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের সূচনা করে। গবেষণার পার্শ্ববিশ্লেষণে দেখা গেছে, জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের পর নারীদেরই ব্যর্থতার জন্য দোষারোপ করা হয়।

স্বামী বা পরিবারের নিকটাত্মীয়দের দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়া ও সামাজিকভাবে তাদের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি (সোশ্যাল স্টিগমা) তৈরি হয়, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে চিরতরে বিপর্যস্ত করে তোলে। গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা যেমন— হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং বিভিন্ন অভিবাসী কল্যাণ সংগঠনের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনেরও মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে আসছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের (গালফ) দেশগুলোতে নারী শ্রমবাজারের নিরাপত্তাহীনতা রাষ্ট্রীয় নীতি, দুর্বল কূটনীতি এবং রিক্রুটিং এজেন্সির কাঠামোগত ত্রুটির ফল। গবেষক আজমিরা বিলকিস এবং মিলি সাহা তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নারী অভিবাসীদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শুধু রেমিট্যান্স অর্জনের বাহবা নেওয়া হয়, কিন্তু পর্দার আড়ালে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তব চিত্রটি বরাবরই উপেক্ষিত হয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, ‘প্রত্যাবর্তন মানে শুধু ভৌগোলিক সীমানায় ফিরে আসা নয়, এটি একজন নারীর জন্য এক গভীর মানসিক ট্রমা এবং নতুন পরিচয়ের সংকট। অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দেশের মাটিতে ফিরে আসার পর সামাজিক সুরক্ষার অভাব এই নারীদের জীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলছে। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি তাদের পাশে না দাঁড়ায়, তবে এই নারীরা চিরতরে প্রান্তিক হয়ে পড়বে।

’ বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বামসা) নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের নারী শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে যে অমানবিক শ্রম ও নিপীড়নের শিকার হন, তার নেপথ্যে রয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর চরম অনিয়ম ও জবাবদিহির অভাব। জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের পর সমাজ ও পরিবারের পক্ষ থেকে এই নারীদের যে সামাজিক কলঙ্কের মুখোমুখি হতে হয়, তা তাদের জীবনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

’ ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে নির্যাতন ও নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে যেসব নারী শূন্য হাতে দেশে ফিরছেন, তাদের মানসিক ট্রমা এবং সামাজিক পুনরেকত্রীকরণ আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ’ গবেষণায় এ বিষয়ে উত্তরণে কিছু নীতিগত সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে— লিঙ্গ সংবেদনশীল নীতি প্রণয়ন; আইনি সহায়তা ও বিচার নিশ্চিতকরণ; মনস্তাত্ত্বিক ও পুনর্বাসন প্রোগ্রাম; অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি।