কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর পোশাকে পাওয়া স্বতন্ত্র তিন পুরুষের ডিএনএর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনায়।
অর্থাৎ, তনুর শরীর ও পোশাকে পাওয়া পুরুষের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে গ্রেপ্তার হাফিজুরের নমুনার কোনো মিল পাওয়া যায়নি ফরেনসিক পরীক্ষায়। যদিও এ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জামিন পেলেও দ্বিতীয় দফায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর। এদিকে পলাতক সাবেক দুই সেনাসদস্যকে ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ।
তাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, হাফিজুর রহমানকে গত শনিবার ঢাকার কেরাণীগঞ্জের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে হাফিজুর রহমানের কুমিল্লার আদালতে আত্মসমর্পণ করার কথা ছিল।
কিন্তু তিনি তা করেননি। আমরা আদালতের নির্দেশনার কপি হাতে পেয়েছি। তারপর শনিবার সকালে কেরাণীগঞ্জের বাসা থেকে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত ও পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, গত ২ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান হাফিজুর রহমান। পরে ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। গত ৬ আগস্ট হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করে।
ওই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে চেম্বার আদালতের বিশেষ অনুমতি নিয়ে আবেদনটি মুভ (পরিচালনা) করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। পরে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের শুনানি নিয়ে চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক জামিন স্থগিত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। এর আগে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরাণীগঞ্জের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।
পরদিন তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর আদালতে হাজির করা হলে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২৫ এপ্রিল তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ৪ আগস্ট জামিনে মুক্তির আগ পর্যন্ত তিনি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। গত জুনে এই ডিএনএ প্রতিবেদন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সেই পরীক্ষায় দেখা গেছে, হাফিজুরের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে অজ্ঞাত তিন পুরুষের নমুনা ম্যাচ করেনি। সূত্র জানিয়েছে, সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে তনুর পোশাক ও শরীরে তিনজন স্বতন্ত্র পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ নমুনা পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্বতন্ত্র ব্যক্তিরাই তনু হত্যার সঙ্গে জড়িত। এরপর পিবিআই সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করে চলতি বছরের মে মাস থেকে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার আবেদন শুরু করে।
তবে সন্দেহভাজনদের মধ্যে চারজনই পলাতক। হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হলেও তনুর শরীর ও জামা-কাপড়ে থাকা পুরুষের ডিএনএর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। হাফিজুর রহমানের আইনজীবী মুসলিম উদ্দিন ভূইয়া বলেন, হাফিজুরের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তনুর শরীরে থাকা পুরুষের ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। আদালতে সেটি পুলিশ জমাও দিয়েছি। গত ১৭ জুন সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, তনুর আলামত থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ’র মিল নেই।
এই প্রতিবেদন গত ১৮ জুন আদালতে জমা দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম। আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, জাহিদ ও শাহীনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তবে এখনো ইন্টারপোল থেকে রেড নোটিশ জারি হয়নি। একটু সময় লাগবে। তারা দেশে নেই, বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি সোহাগী জাহান তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়া যায়। পরদিন তার বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, মামলাটি সঠিক তদন্ত হলে এত দিনে সবকিছু বের হয়ে আসত। সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করতে পারলে সবই জানা যাবে।



















