গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুর এলাকার গোবিন্দবাড়ি ও বড় ভবানীপুর মৌজায় বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জমি আত্মসাতের লক্ষ্যে একটি অসাধু চক্র নানা তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের সম্পত্তি রক্ষায় রেকর্ড সংশোধনের মামলা না করে প্রায় দেড় যুগ ধরে নিশ্চুপ রয়েছেন।
আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই অসাধু চক্রটি জমি গ্রাসের জন্য দীর্ঘদিন ধরে নানা তৎপরতা চালিয়ে আসছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বড় ভবানীপুর মৌজায় সিএস ও এসএ ৪৬, ২২১, ২৩৫ ও ২৪৯, যা আরএস ৪১ খতিয়ানের ৬৫, ২১, ৬৪৪ ও ২৫০ দাগের ১১৯০ শতাংশ ও গোবিন্দবাড়ি মৌজায় সিএস ও এসএ ৩৯৯, যা আরএস ১০০১ খতিয়ানের ৬০৫ দাগের ৬৪৮.৭৫ শতাংশসহ মোট ১৮৩৮.৭৫ শতাংশ জমি নামজারি আবেদন করেন বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার পূর্ব চর সরিকল গ্রামের মো. আলমগীর হাওলাদার, বুলবুল হাওলাদার, সেলিম হাওলাদার ও জাহাঙ্গীর হাওলাদার।
ওই দাগগুলো তঞ্চকতা খতিয়ানের (ভুয়া খতিয়ান) ও বনের গেজেটভুক্ত। এই জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় শতকোটি টাকা। খতিয়ান দুটির এই জমি সিএস ও এসএ দাগ বনের গেজেটভুক্ত। বর্তমানেও জমিতে গজারি বন রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সিএস ও এসএ রেকর্ডে বনের গেজেটভুক্ত জমি তৎকালীন আরএস জরিপের সময় জরিপের লোকজন জালজালিয়াতির মাধ্যমে তাদের আত্মীয়স্বজন ও নিজ নামে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড করে নেয়।
গাজীপুরে ১৯৬৬-৬৭ সালে আরএস রেকর্ড শুরু হয় ও ১৯৯০ সালে চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশ হয় এবং ওই মৌজার রেকর্ড বই হস্তান্তর করা হয় ২০০৮-০৯ সালে। পরবর্তীকালে জালজালিয়াতির বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে ২০১০ সালের জুন মাসে খতিয়ান দুটোসহ এ রকম অর্ধশতাধিক খতিয়ান তঞ্চকতা খতিয়ান হিসেবে ঘোষণা করে খতিয়ানগুলোর কার্যক্রম স্থগিত করে তদন্ত কমিটি গঠন করে ভূমি মন্ত্রণালয়।
সরকারি স্বার্থ থাকায় এরপর থেকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তঞ্চকতা খতিয়ানগুলোর ভূমি উন্নয়ন কর আদায়সহ ওই খতিয়ানগুলো থেকে নামজারি প্রদান বন্ধ রাখা হয়। এদিকে সংরক্ষিত বনের জমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করে গ্রাস করার লক্ষ্যে চক্রটি গত ৬ জুলাই অনলাইনে আবেদন করেন। আবেদন নং-১৫৬৮৫২৫২ ও ১৫৬৮৬৪৮৮। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গোবিন্দবাড়ি মৌজার কয়েকটি দাগ ও খতিয়ান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি স্বার্থ জড়িত; বিশেষ করে সিএস ও এসএ রেকর্ডে জমির শ্রেণি ও মালিকানা এবং পরবর্তী আরএস রেকর্ডে তার অবস্থানের মধ্যে মালিকানার অসামঞ্জস্য রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো জমি যদি পুরোনো সরকারি রেকর্ড ও গেজেটে বন বিভাগের সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে সেটি ব্যক্তির নামে নামজারি করার আগে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড, গেজেট, দখল ও মালিকানা এবং সীমানা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু গোবিন্দবাড়ি মৌজার জমি নিয়ে এমন যাচাই যথাযথভাবে হয়েছে কি না, সেটিই এখন তাদের প্রশ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দলিল লেখক মন্তুষ বর্মন বলেন, যদি সিএস ও এসএ রেকর্ডে বন বিভাগের স্বার্থ প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং পরবর্তী আরএস রেকর্ডে তা পরিবর্তিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনের ভিত্তি কী ছিল, তা বের করা জরুরি। বন বিভাগ রেকর্ড সংশোধনের মামলা না করার কারণেই অসাধুরা বনের জমি আত্মসাৎ করার লক্ষ্যে জালজালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
এ বিষয়ে গাজীপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী জাবেদ সারোয়ার বলেন, শুধু সর্বশেষ খতিয়ানে কার নাম রয়েছে, এটি দেখেই কোনো জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করা যায় না। মালিকানার ধারাবাহিকতা, মূল রেকর্ড, গেজেট ও সংশ্লিষ্ট আদালত বা প্রশাসনিক আদেশও যাচাই করা প্রয়োজন। বন বিভাগের জমি ব্যক্তির নামে নামজারি হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে সেটিকে বৈধ মালিকানার জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রি বা হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যেহেতু ভূমি মন্ত্রণালয় খতিয়ান দুটি তঞ্চকতা ঘোষণা করেছে, তাই আরএস রেকর্ডে ব্যক্তিমালিকানায় থাকলেও সেই জমি নামজারি দেওয়া আইনসংগত নয়। এ বিষয়ে কাশিমপুর ভূমি অফিসের ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হাজেরা বেগমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, খতিয়ান দুটির সিএস ও এসএ দাগ বনের গেজেটভুক্ত। বর্তমানে খতিয়ান দুটির পুরো জমিতেই গজারি বন রয়েছে।
এ ছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয় খতিয়ান দুটি তঞ্চকতা হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই এই জমি নামজারি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশিরুল আল মামুনের বক্তব্যের জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠালে তিনি জানান, বনের স্বার্থ থাকলে বন বিভাগ থেকে অনাপত্তি দেবে না, সে ক্ষেত্রে নামজারির সুযোগ নেই।




















