আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। সংসদে ২০৯ আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় থাকা বিএনপি এককভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক সুযোগ বজায় রেখে নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করার পথে হাঁটছে।
তবে সরকারি দলের এই ‘একক নীতি’ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রীয় আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে পাল্টা চাল দিয়েছে বিরোধীশিবির। গতকাল রোববার দুপুরে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট তাদের প্রার্থী হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এই প্রতিরোধমূলক অবস্থান রাজনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তা ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও বিরোধী জোট জামায়াত-এনসিপির এই মুখোমুখি অবস্থান ক্ষমতার লড়াইকে রাজপথ থেকে সংসদের টেবিলে এবং মনস্তাত্ত্বিক স্নায়ুযুদ্ধে রূপ দিয়েছে, যা আগামী দিনের রাজনীতিকে এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে বিরোধী দলগুলোর ক্ষোভ, ক্ষমতাগ্রহণের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে জাতীয় গুরুত্বের সর্বোচ্চ জায়গায় সর্বসম্মত বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি না মেনে ‘বিএনপি ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নে মগ্ন ক্ষমতাসীন দল।
সংসদে শক্তিশালী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি তাদের নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রের খবর, নতুন রাষ্ট্রপতির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে সরকার ও দলের মধ্যে সুদৃঢ় সমন্বয় বজায় রাখার সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব একক মনোনয়ন নিশ্চিত করেই নির্বাচনের মাঠে নামছেন।
গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে দুই নেতা দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহও করেছেন। তবে এগুলো কার বা কাদের জন্য, সেটা নিশ্চিত করা হয়নি। তবে একজন প্রার্থী ইচ্ছা করলে দুটি মনোনয়নপত্রও ফেলতে পারেন বলে নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো একটি মনোনয়নপত্রে ভুল থাকলে পরেরটি দিয়ে যেন ওই সমস্যা মোকাবিলা করা যায়, সে জন্যই এমন আইন রাখা হয়েছে।
গতকাল মিন্টো রোডে ১১-দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বিএনপির ওপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং ‘জুলাই সনদে’র আলোকে রাষ্ট্রসংস্কারে বিএনপি অনীহা দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আশা করা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
বিএনপি সেই সংস্কারের পথে হাঁটলে সরকারি ও বিরোধী দল মিলে যৌথভাবে একজন প্রার্থী দেওয়া যেত। কিন্তু বিএনপি তা না করে পূর্বতন সরকারগুলোর মতোই একলা চলার নীতি গ্রহণ করেছে। তাই বাধ্য হয়ে এই রাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই ১১-দলীয় জোটের পক্ষে অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে। এটি কোনো হার-জিতের সমীকরণ নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর একক কর্তৃত্ব স্থাপন ও সংস্কারবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে এটি আমাদের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
’ সংসদে ৬৮ আসন থাকা জামায়াত এবং গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমন্বয়ে গঠিত ১১-দলীয় জোট কেবল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নয়; বরং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখেও শক্তির জানান দিচ্ছে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে দলগুলো। এত দিন রাজপথে ‘সফট অপজিশন’ বা মৃদু বিরোধী ভূমিকা পালন করলেও এবার তারা দৃশ্যমান আগ্রাসী কৌশল বেছে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে ঘরে ঘরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা নিয়েছে দলগুলো। এনসিপি তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি ঝালাই করতে বিভিন্ন ধাপে প্রার্থী ঘোষণা শুরু করেছে। কেন্দ্রীয়ভাবে জোটবদ্ধ কোনো সমঝোতা না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার দরজা খোলা রাখছে তারা। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন জামায়াত-এনসিপি জোটের সমালোচনা করে বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর নয়, এটি এ দেশের সাধারণ মানুষের আন্দোলনের ফসল।
অথচ আজ জামায়াত ও এনসিপি জুলাই সনদের কথা বলে নন-ইস্যুকে ইস্যু বানিয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। এদিকে ফরিদপুর-৪ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল জামায়াত-এনসিপিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পর্দার আড়ালে তীব্র রাজনৈতিক অবিশ্বাস তৈরি করা হচ্ছে। জামায়াত ও এনসিপির মনে রাখা উচিত, বিএনপি না থাকলে আওয়ামী লীগ তাদের গিলে খাবে।
আবার বিএনপিকে দুর্বল করার চেষ্টা করলেও পরিণামে এই দুটি দলই বড় বিপদে পড়বে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে দলীয় এক শীর্ষ নেতা জানান, সংসদে সরকারি দলের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা চলছে, তাতে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা এমন এক সর্বজনগ্রাহ্য প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদকে বেছে নিয়েছেন, যিনি অভিজ্ঞ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর একক কর্তৃত্ব ও সংস্কারবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে এটি আমাদের সুস্পষ্ট বার্তা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, এটি রাষ্ট্র সংস্কারের সদিচ্ছা প্রমাণের পরীক্ষাও ছিল। ’ সংবিধান অনুযায়ী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন।
যদিও গাণিতিক হিসাবে বিএনপির প্রার্থীর বিজয়ী হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার, তবুও জামায়াত-এনসিপি জোটের এই পাল্টা চাল ক্ষমতাসীনদের ওপর বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করেছে। ক্ষমতাসীনের একক কর্তৃত্ববাদ রুখতে বিরোধীশিবিরের এই প্রতিরোধ রাজনীতিকে এক জটিল ত্রিভুজ সমীকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়বে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোয়ও।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে ৬৮ আসন থাকা জামায়াত এবং গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত এনসিপির সমন্বয়ে গঠিত ১১-দলীয় জোট কেবল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নয়; বরং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখেও রাজনৈতিক মাঠ নিজেদের দখলে নিতে চাইছে। এরই মধ্যে তারা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। সাবেক উপদেষ্টা এবং রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল বলেন, বিএনপি সংসদে ২০৯ আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জায়গায় রয়েছে, ফলে সাংবিধানিকভাবে তাদের প্রার্থী বিজয়ী হওয়া প্রায় নিশ্চিত।
কিন্তু ক্ষমতার প্রথম পাঁচ মাসের মাথায় রাষ্ট্রপতির মতো একটি জাতীয় ঐক্যের পদ নিয়ে বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপির পৃথক প্রার্থী দেওয়া প্রমাণ করে যে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধীশিবিরের রাজনৈতিক দূরত্ব এখন আকাশচুম্বী। বিএনপি যদি জুলাই সনদের চেতনা অনুযায়ী বিরোধী জোটের সঙ্গে টেবিলে বসে একটি সমঝোতামূলক নাম ঠিক করত, তবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হতো।
১১-দলীয় জোটের কর্নেল অলি আহমদকে প্রার্থী করা গাণিতিক জয়ের জন্য নয়, এটি মূলত বিএনপির ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং ‘বিএনপি ফার্স্ট’ নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদ। রাজনীতি ও রাজনৈতিক ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এখানে কেবল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মুখ্য নয়; আসল খেলাটি হচ্ছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় রাজনীতির চালিকাশক্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
জামায়াত ও এনসিপি জোট নিজেদের ‘সফট অপজিশন’ থেকে বের করে জাতীয় রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। অলি আহমদের মতো একজন সাবেক বিএনপি নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রার্থী করে তারা একদিকে যেমন বিএনপির তৃণমূলের সহানুভূতি কাড়তে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের অবস্থানকে একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে।
বিএনপি যদি এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ সামলাতে নমনীয় না হয়, তবে এই ত্রিভুজ দ্বন্দ্ব খুব দ্রুত রাজপথের অস্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারে।



















